ক্লদিও ক্যানিজিয়া। নামটি আসলে সবার আগে চোখে ভাসে ১৯৯০ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ডিয়েগো ম্যারাডোনার চারজনকে বোকা বানানো পাসে গোল করা হাল্কা-পাতলা এক যুবকের কথা।
আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলেছেন ১৯৯০, ১৯৯৪ ও ২০০২ বিশ্বকাপ। ’৯০ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন দারুণ এক জুটি। খেলেছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই ক্লাব বোকা জুনিয়র্স ও রিভারপ্লেটের হয়েই।
আর্জেন্টিনার ৫১ বছর বয়সী তারকা এ ফুটবলার ফিফা ডটকমকে দেয়া সাক্ষাতকারে তুলে ধরেছেন তার বিশ্বকাপ ভাবনা। উত্তরসূরিদের দিয়েছেন কিছু পরামর্শও-
কদিন পরেই শুরু হচ্ছে আরেকটি বিশ্বকাপ। দুই সপ্তাহের মতো সময় বাকি থাকা এমন আসরের আগে আপনার অনুভূতি কেমন?
ক্যানিজিয়া: এই অনুভূতি অসাধারণ। এক আসরের সঙ্গে আরেক আসরের কোনো তুলনা হয় না। আমি একদিকে উত্তেজিত, আবার আরেকদিক থেকে শান্তও। আমি অযথা চাপ নিতে পছন্দ করি না। কিছু মানুষ আছে যারা বিশ্বকাপ এলেই রাতের ঘুম হারাম করে ফেলে। আমি কিন্তু ওই তালিকায় নেই(হাসি)।
আপনাদের মতো অনেকেই আছেন, যাদের দেখে মনে হয় তাদের ক্ষুধা কখনোই কমবে না। তাদের শুধু জায়গা মত বসিয়ে দিলেই হয়।
ক্যানিজিয়া: আপনি যদি একটু পেছন ফিরে দেখেন, দেখবেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা সবসময়ই বুনো আর কাজকর্মে স্পষ্ট। আমি মনে করি খেলোয়াড়রা এখন সবার কাছেই খুব পরিচিত। কেবল আর্জেন্টিনার কথা বলছি না। এটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবর্তিত হয়ে আসছে। একটা সময় ফুটবল ছিল খুব অগোছানো একটা খেলা। আমরা সেই সময়টা দূরে ফেলে এসেছি। সবাই এখন তার দেশের হয়ে সর্বোচ্চটা দিতে চায়। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ বুকে ধারণ করে খেলে।
আপনি ১৯৯০ বিশ্বকাপের রানার্সআপ দলের সদস্য। অথচ অনেকেই বলতো, আপনাদের আর্জেন্টিনা দলটা নাকি নেহাত ভাগ্যের জোরেই অতোটা পথ যেতে পেরেছিল। আপনি কী বলেন?
ক্যানিজিয়া: সেবার তো কেউ আমাদের হারাতেই পারেনি। শুধু দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল আমাদের ৪৫ মিনিট পর্যন্ত আটকে রাখতে পেরেছিল। সেসময় অনেককিছুই আমাদের বিপক্ষে ছিল। ম্যারাডোনা, রুজ্ঞেরি আর বুররুচাগা চোট নিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল। পুম্পিডো তার পা ভেঙ্গে ফেললো। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েও আমাদের তখন নানা সমস্যা। অনেকে ঠিকমত অনুশীলন করতে পারতো না, আবার কাউকে সময় সময় ইনজেকশন নেয়া লাগতো খেলার জন্য। ১১ জন খেলোয়াড় মাঠে নামানোই দায়। কী ভয়ঙ্কর! একটা বিশ্বকাপে এমন দল নিয়ে খেলতে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেও গা শিউরে ওঠে। কিন্তু এরপরও আমরা যেভাবে খেলেছি সেটা ছিল বিস্ময়কর। আমরা তো বিশ্বকাপ জিতেই যাচ্ছিলাম প্রায়। দেহের শেষবিন্দু নিংড়ে দিয়ে, আর সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে একটা দল হয়ে খেলার সেটা ছিল এক অসাধারণ নিদর্শন।

ব্রাজিলের বিপক্ষে করা আপনার গোলটি আজও আর্জেন্টিনা ভক্তদের হৃদয়ে জায়গা করে আছে। কীভাবে কী হল?
ক্যানিজিয়া: ওই গোলটা ছিল অসাধারণ! আমার জন্য সেই গোলটা জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সুখ আর গর্বের উৎস। সেমি-ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে করা গোলটিও আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করাটা সবসময় বিশেষকিছু। একেতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী তার উপর পাঁচ জন ব্রাজিলিয়ানের বিপক্ষে মাত্র দুজন আর্জেন্টাইনের প্রচেষ্টায় দারুণ এক গোল। ফুটবলের এ দারুণ এক নিদর্শন। দেখে মনে হবে যেন আমরা ভিডিও গেমস খেলছিলাম।
কেমন বিশ্বকাপ দেখতে চাচ্ছেন এবার?
ক্যানিজিয়া: আক্রমণাত্মক, দারুণ এক বিশ্বকাপ। এবার বেশকিছু দল আছে যাদের ধরণটাই হবে আক্রমণাত্মক খেলা। তাদের এমনকিছু খেলোয়াড়ও আছে, যারা ধরনটার সঙ্গে দারুণভাবেই মিশে যায়। কিছু খেলোয়াড় আছে যাদের শুধু বলবেন সামনে উঠে খেলো, বাকিটা তারা ঠিকই বুঝে যাবে যে কী করতে হবে। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে একটু সাবধানে খেলতে হবে। দুর্বল দলরা ঝরে পড়বে। আর এটাই তো স্বাভাবিক।
আপনার দল তো বরাবরের মতো এবারও ফেভারিট। অথচ কিছু না কিছু ঘাটতি আছে এবারও। কেউ তা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছে না। আপনি কী কোনো দুর্বলতা দেখতে পাচ্ছেন?
ক্যানিজিয়া: আমার কাছে প্রত্যেকটা দলই সমান শক্তিশালী, ভালো। আমাদেরও একাধিক সমস্যা আছে । কিন্তু কোনো দলই অজেয় নয়। আমি জানি না এটাকে দুর্বলতা বলা উচিত কিনা। কিন্তু সমস্যা সব দলেরই আছে। মানুষ ভুল করেই। ১৯৯০ সালে কেউ ইতালিকে হারাতে পারছিল না। কিন্তু আমাদের সঙ্গে খেলতে এসেই ওরা হেরে গেল। সবচেয়ে বড় শক্তি হল মানসিকতা।
আর্জেন্টিনার শক্তি আর দুর্বলতা কোথায়?
ক্যানিজিয়া: আমাদের যেটা শক্তি সেটা হল আমরা আমাদের আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়দের দিয়ে যে কাউকেই ভয়ে রাখতে পারি। আমাদের খেলোয়াড়দের নামই প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে দিতে পারে। কেউ তো এই কথা ধরে খেলতে আসবে না যে, ‘আরে হিগুয়েন তো আর্জেন্টিনাতে সমালোচনার শিকার!’ সবাই এই কথাই চিন্তা করবে, ‘সে তো জুভেন্টাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।’
তবে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আমাদের রক্ষণ। এছাড়া আমাদের আরও কিছু দুর্বলতা আছে যেগুলো দ্রুত ঘষা-মাজা করা দরকার।

এখন দুটি প্রবাদ তো সবার মুখে মুখে। ‘মেসি ম্যারাডোনার মতো বীর নন’ আর ‘মেসি ম্যারাডোনার মতো দলকে সাহায্য করতে পারেন না’ -কোনটি ঠিক?
ক্যানিজিয়া: আমার কাছে যেটা সত্য তা হল, ম্যারাডোনা তার সতীর্থদের কাছ থেকে যতটুকু সাহায্য পেতেন মেসি তার অর্ধেকও সমর্থন পায় না।
ম্যারাডোনার মতো একজন ‘জিনিয়াসে’র সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমর্থন দেয়া ছাড়া আপনারা আর কী করতেন?
ক্যানিজিয়া: দেখুন ম্যারাডোনা ছিলেন একজন পরিপূর্ণ ফুটবল জিনিয়াস। কিন্তু আমরা কখনোই তার মতো করে ভাবতে চাইনি। কখনোই না। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নিজস্ব দায়িত্ব আছে। এমনকি যে নিয়মিত দলে জায়গা পায় না তারও। আপনি চাইলেই তো সব দায়িত্ব মেসির ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারেন না। কারণ, তাহলে তো আপনার খেলারই প্রয়োজন পড়ে না। একবার ভাবুন, আমি চিন্তা করছি যে ১৯৯০ বিশ্বকাপে আমি একাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছি। কেউ বিশ্বাস করবে এটা? সেটা করেছিলাম আমরা সবাই মিলে। আমি ছিলাম আর্জেন্টিনার মূল স্ট্রাইকার। আমার কাজ ছিল বাড়িয়ে দেয়া বল গোলে রূপান্তর করা। আপনাকে এজন্য কঠিন চরিত্রের অধিকারী, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে।
২০০৯ সালে কার্লোস বিলার্দো (তৎকালীন আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি) আপনাকে ২০১০ বিশ্বকাপে ফিরে আসতে বলেছিলেন। কেমন হতো যদি আপনি বিশ্বকাপ খেলতেন?
ক্যানিজিয়া: আমার বয়স ছিল তখন ৪২ বছরের বেশি। সাড়ে চার বছর আগে ফুটবল ছেড়ে দেয়া এক ফুটবলার। যদিও আমি খেলার মতো উপযুক্ত ছিলাম! কিন্তু ৩০ মিনিটের বেশি খেলতে পারতাম কিনা সেটা নিয়ে আমারই সন্দেহ ছিল। তবে পরে সুযোগটা না নেয়ায় খুব আফসোস করেছি। ইস! আরেকটা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ কয়জন পায়!









