দেশে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকে হারানো; ভারতের মাটিতে পাঁচ দিন লড়াই জমিয়ে রাখা, গত দেড়-দু’বছরে মনে রাখার মতো এমন কিছু টেস্ট পারফরম্যান্স আছে বাংলাদেশ দলের। কেবল ঘরেই নয়, শ্রীলঙ্কার মাঠেও একটা মনে রাখার মত জয় ছিল নিজেদের শততম টেস্টে। তাতেই প্রত্যাশার পারদটা চড়েছিল। বহুগুণেই। তবে বিদেশে টেস্ট বলতে তো আর কেবল লঙ্কা-জয় বোঝায় না। সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা ছিল। যার শুরুর ধাপে পুরোপুরি ফেল বাংলাদেশের ক্রিকেট লড়িয়েরা!বাস্তবতাটা জেনেও ৯ বছর পর সাউথ আফ্রিকায় সিরিজ খেলতে গিয়ে অন্যরকম কিছুর প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। সেটা গত বছর দুয়েকের পারফরম্যান্সের জন্যই। যার পুরোটা বিসর্জন দেয়া সারা পচেফস্ট্রম ও ব্লুমফন্টেইনে। অথচ চিরায়ত সবুজ-বাউন্সি উইকেটের বাইরে ম্যাড়ম্যাড়ে পিচেই বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়েছে প্রোটিয়ারা। অনেকটা দেশের মাটির মতো ব্যাটিং উইকেট পেয়েও পুরোপুরি ব্যর্থ বাংলাদেশ দল। সঙ্গে যোগ হয়েছে মুশফিকের অধিনায়কত্ব নিয়ে অব্যাহত সমালোচনার স্রোত। সেটির কিছুটা আবার উসকে দিয়েছেন অধিনায়ক নিজেই। কিন্তু, প্রোটিয়া হতাশার ডায়েরি লিখতে গেলে প্রথম দফাতেই সামনে চলে আসবে সাকিব আল হাসানের কথা। টেস্ট সিরিজে তার বিশ্রাম অনুমোদন পাওয়ার ধাক্কাতে মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ার শুরুটা হয়েছিল। সেটার প্রভাব পড়েছে গোটা সিরিজেই। দলের যে দু’তিনজনের উপর ভরসা রাখা যায় তাদের অন্যতম সাকিব। এই অলরাউন্ডারকে না পাওয়ার সঙ্গে সিরিজে তামিমের হঠাৎ চোট পুরোপুরি পেছনে ঠেলে দেয় মুশফিকদের। মুশফিক নিজে হয়ে পড়েন দিশেহারা। ব্যাটিং, কিপিং, অধিনায়কত্বের ত্রিমুখী চাপ যাকে আক্রান্ত করতে পারেনি কখনো, সেই মুশফিক গ্লাভস ছেড়ে না ব্যাটিংয়ে না অধিনায়কত্বে নির্ভারতার প্রতিদান দিতে পারলেন। টস জিতে আগে বোলিং নেয়ার টানা দুই ভুলের সঙ্গে মাঠে মুশফিকের নানামুখী ভুল পদক্ষেপের মাশুল গুণতে হয়েছে বাংলাদেশকে। অধিনায়কের দায় তাতে থাকছে নিশ্চিতভাবেই। সেটা মিটিয়ে দিতে পারত সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল ঘরে তোলার মধ্য দিয়ে। তেমন তো হয়নি, উল্টো ভাঙা নায়ের পাল ছিড়ে নাবিককে একা ফেলে সটকে পড়েছেন ব্যাটসম্যান-বোলার নামের সব জাহাজীরা। ফলাফল, ডুবতে সময় লাগেনি। যে ডোবার দায় মাথা পেতে নিতে হবে অধিনায়ক মুশফিককে। আবার দায় এড়াতে পারবেন না দলের অন্যরাও। অধিনায়ক কখনো কারও হয়ে বোলিং করে দিতে পারেন না, সুযোগ নেই বাকিদের ব্যাটিংটাও করে দেয়ার। হারের দায় তাই পুরো দলের। তবে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ভুলতে বসা পুরনো বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেয়া সিরিজের পর কাউকে না কাউকে হয়তো বলির পাঠা বানানো হবে। চড়া মূল্য দিতে হতে পারে মুশফিককেও। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের খেলা শেষে সংবাদ মাধ্যমের সামনে এসে অধিনায়ক অকপটেই বলে গেছেন, টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে সীমানার কাছে ফিল্ডিংয়ের কথা। তাতে অধিনায়ক হিসেবে স্বাধীন ভূমিকা রাখতে না পারার অসহায়ত্বটা বেরিয়ে এসেছে। সেজন্য আবার বিরাগভাজনও হতে হয়েছে তাকে। আলোচনায় চলে এসেছে মুশফিকের অধিনায়কত্ব হারানোর কথা। এই মুশফিকের অধিনায়কত্বেই নিজেদের ১০ টেস্ট জয়ের ৭টি এসেছে বাংলাদেশের। দলনেতা হিসেবে তাকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। আবার সেটা এমন বলে না যে সাউথ আফ্রিকার দুই টেস্ট দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার প্লট গড়ে ফেলেছেন মুশফিক। একজন অধিনায়ক ততোটাই ভালো, তার দল যতটা ভালো। সেই দল যখন খারাপ করছে, তখন তার দায় কোনোভাবে কেবল অধিনায়কের একার হতে পারে না। তার অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে ঠিকই, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না ওই মুশফিকই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা টেস্ট অধিনায়ক, সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যানও। মাত্র একটা সিরিজের জন্য তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।









