ক্যালেন্ডারের পাতা কখনও কখনও বড় নির্মম হয়ে ফিরে ফিরে আসে। কিছু কিছু তারিখ আছে যা জীবনের ডায়রিতে দাগ ফেলে যায়। ভুলতে চাইলেও সে দিনগুলো ভুলে থাকা কষ্টকর।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আক্ষেপে ভরা কালো দিনগুলোর তালিকায় যোগ হলো আরও একটি তারিখ- ২৪ অক্টোবর, ২০১৬। ঠিক একই রকম না হলেও অনেকটা প্রায় একই রকম। অনেক কিছুই মিলে না, কিন্তু কত কিছুইতো আবার মিলে যায়।
আজ থেকে ১৩ বছর আগের ঘটনা। ২০০৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিলো শনিবার। আজ সোমবার। সে দিন মুলতানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিলো পাকিস্তান। আর আজ চট্টগ্রামে স্বাগতিক দলের স্বপ্ন কেড়ে নিলো ইংল্যান্ড।
১৩ বছর আগেও একই রকমভাবে শুরু হয়েছিলো স্বপ্নদেখা এক দিনের। কি যে ‘মায়ার সব স্বপ্ন’ নিয়ে পুরো বাংলাদেশ বসে ছিলো টেলিভিশনের সামনে। প্রথম টেস্ট জয়ের পরিস্কার হাতছানি। জয় থেকে ১১৩ রান দূরে পাকিস্তান। হাতে ৪ উইকেট। বাংলাদেশের পাল্লাই ছিলো ভারি।
গতকাল রাতে অবশ্য এর চেয়েও বেশি সম্ভাবনা নিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলো বাংলাদেশ। মাত্র ৩৩টা রান। সকাল হলেই সাব্বির রহমানের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে তা পেরিয়ে যাওয়ার যে সামর্থ্যরে ছিলো বাংলাদেশের সে কারণেই হয়তো মুলতানের মতো নির্ঘুম রাত কাটেনি।
কিন্তু সকালে সেই পুরনো কাব্যই রচিত হলো নতুন কবির হাতে। মাত্র ১৭ মিনিটেই স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার লাল-সবুজদের। ৩৩ রানের টার্গেটে নামা বাংলাদেশ অলআউট হয়ে গেলো ২২ রান দূরে থেকে। মূলতান ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পর টাইগার ডায়রিতে দাগ কাটলো জহুর আহমেদ চৌধুরী ক্রিকেট স্টেডিয়ামও।
ফিরে দেখা মুলতান টেস্ট:
সিরিজের তৃতীয় এবং শেষ টেস্ট ছিলো সেটি। মুলতানে টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখনকার ক্যাপ্টেন আর এখনকার টিম ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন।
প্রথমে ব্যাট করে বাংলাদেশ করে ২৮১। হাবিবুল বাশার সুমন ৭২, জাভেদ ওমর বেলিম গুল্লু ৩৮, রাজিন সালেহ ৪৯ এর সঙ্গে আর কিছু ছোট ছোট অবদান টাইগার ইনিংসটাকে হ্যান্ডসাম করে তুলে।
জবাবে মোহাম্মদ রফিকের ৫ এবং অধিনায়ক খালেদ মাহমুদের ৪ উইকেটে ১৭৫ রানে অলআউট পাকিস্তান। প্রথম ইনিংসে ১০৬ রানের লিড পাওয়া বাংলাদেশ পুরোপুরি না হলেও ড্রাইভিং সিটের আশপাশে।
তবে প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসে অতটা ভালো ব্যাট চালাতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা।
মাত্র ১৫৪ রানেই অলআউট। সর্বোচ্চ ৪২ রান রাজিন সালেহ এর। তবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস বিভিন্ন কারণে ছিলো ঘটনাবহুল। আজকের ম্যাচে যেমন বাংলাদেশ বাজে আম্পায়ারিংয়ের শিকার ওই ম্যাচেও শ্রীলঙ্কান আম্পায়ার অশোকা ডি সিলভার বাজে সব সিদ্ধান্তে কলঙ্কিত।
অলক কাপালিকে ব্যক্তিগত ২২ রানে কট বিহাইন্ড ঘোষণা করেছিলেন সিলভা। অথচ পাকিস্তানে অভিষিক্ত পেসার ইয়াসিরের বল কাপালির ব্যাট ছুয়ে উইকেটরক্ষক রশিদ লতিফের সামনে পড়ে। মাটি থেকে বল তুলে আউটের আবেদন করেছিলেন পাকিস্তানী কিপার। কিন্তু শ্রীলংকান আম্পায়ার অশোকা ডি সিলভা আঙ্গুল তুলে জানিয়ে দেন অলক আউট। পরবর্তিতে লতিফের ওই প্রতারণা বিশ্ব ক্রিকেটে ঝড় তুলে।
চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য ২৬১ রানের টার্গেট পায় পাকিস্তান। দুই ওপেনার সালমান বাট ও মোহাম্মদ হাফিজের ওপেনিং জুটিতেই উঠেছিলো ৪৫। প্রথম আঘাত হানেন বাংলাদেুশ বাহাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলাম। ঠিক ওই সময়ে ব্যাটিংয়ে নামেন ইনজামাম-উল-হক। ইনজি তখন একেবারেই অফফর্মে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট থেকে ব্যর্থতা নিয়ে ফিরে এসে দলীয় কোন্দলে কোণঠাসা পাকিস্তান টিম।
তিন নম্বরে নেমে ইনিংস মেরামত শুরু করলেন ইনজামাম-উল-হক। ৭৮ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরই মুলতানসহ গোটা বাংলাদেশ তখন এক অনন্য এক ‘অঘটন’ এর অপেক্ষায়।
ইনজির সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে শূন্য রানে রানআউট ইউনুস খান। পাকিস্তান ৮১/৪। দলীয় ৯৯ রানে ফারহান আদিলকে বাশারের ক্যাচ বানিয়ে ফিরিয়ে দিলেন মোহাম্মদ রফিক।
ব্যাট করতে নামলেন পাকিস্তানী অধিনায়ক রশিদ লতিফ। ক্যাপ্টেন ভার্সেস ক্যাপ্টেন। মাত্র ৫ রানে লতিফকে এলবিডব্লিউ করে ফিরিয়ে দিলেন সুজন। ১৩২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান তখন ভয়াবহ বিপদে। বাংলাদেশে শুরু হয়ে গেছে উৎসবের প্রস্তুতি।
টেস্ট জিতে পাকিস্তানের চাই ১২৮ রান, হাতে ৪ উইকেট। একই সঙ্গে আছে গোটা দুটি দিন। এমন একটা সমীকরণ নিয়ে চতুর্থ দিন শুরু। উইকেটে তখন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান বলতে ওই ইনজামাম-উল-হকই। কিন্তু ধীরে ধীরে রুদ্রমুর্তি ধারণ করতে লাগলেন লোকাল হিরো।
অসাধারণ কিছু শটে পাল্টাতে লাগলেন ম্যাচের গতিপথ। সাকলাইন, সাব্বির আহমেদ, ইয়াসির আলী ও উমর গুলের মতো টেল-এন্ডারদের নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চটা দিলেন ইনজি। যেনো পণ করলেন নিজের জীবনের সেরা ইনিংসটা এখানেই খেলবেন।
চতুর্থ দিনের শুরুতেই অবশ্য ব্যক্তিগত ১১ রানে আউট হয়ে ফিরেন যান সাকলাইন মুশতাক। খালেদ মাহমুদের বলে উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ পাইলটের হাতে ধরা। উইকেটে এসে সাব্বির আহমেদ কিছুক্ষণ সঙ্গ দেন ইনজামামকে। ব্যক্তিগত ১৩ করে ফিরেন সাব্বিরও।
এবার ইনজামমের সঙ্গী উমর গুল। টেলিভিশনের সামনে পুরো বাংলাদেশ। উৎসবের অপেক্ষায় ক্রিকেট পাগল জাতি। কিছু কিছু জায়গায় শুরু হয়ে গিয়েছিলো রং খেলার উৎসবও। কিন্তু ক্রিজে ইনজামাম তখনও ভাবছেন ভিন্ন কথা। পেরিয়ে গেছেন ফিফটি।
এমন সময় হলো আরেকটি নাটক। বল হাতে তখন মোহাম্মদ রফিক। একটি দ্রুত রান নিতে গিয়ে ক্রিজ ছেড়ে বেড়িয়ে গেছেন উমরগুল। রফিক বল করা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেলেন। গুল তখন ক্রিজ ছেড়ে প্রায় অর্ধেকটা উইকেটে। চাইলে আউট করতে পারতেন। কিন্তু রফিক তা করেন নি। গুলকে শুধু সাবধান করলেন বাংলাদেশি স্পিনার। ফিরে আসতে বললেন ক্রিজে। এমন মুহূর্তে আরও একটি উইকেট এর সুর্বণ সুযোগ পেয়েও মোহাম্মদ রফিকের ওই উদারতা কিংবা ‘অতি-ভদ্রতা’ এখনও আলোচিত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে। যদিও গুল পড়ে আউট হয়েছিলেন। মাত্র ৫ রান করলে ফিরলেও গুলের ওই ইনিংসটি ঠিক ওই মুহূর্তের জন্য প্রায় ৫০ রানের সমতুল্য। গুল যখন রান আউট হন, জয় থেকে পাকিস্তান তখন মাত্র ৩ রান দূরে।
শেষ মুহূর্তের নায়কও ওই ইনজামাম-উল-হক। তার পুল করা বলটি বাউন্ডারির বাইরে আছড়ে পড়লো। অশ্রুসিক্ত হলো গোটা বাংলাদেশ। টেলিভিশনের সামনে স্তব্ধ লাল-সবুজ জাতি।
২০০৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের মতো ওই বিষন্নতা অবশ্য আজ হয়নি। ইনজামাম যা পেরেছিলেন সুযোগ ছিলো সাব্বির রহমান রুমানের সামনেও। ইনজামাম নটআউট ছিলেন ১৩৮-এ। আর সাব্বির ৬৪ রানে। পার্থক্য হলো ইনজি জিতিয়ে এসেছিলেন পাকিস্তানকে। আর সাব্বির রহমান অপরাজিত থেকে দেখেছেন সহকর্মীদের এক এক করে বিদায়। তবুও ১৫ মাস পর টেস্ট খেলতে নেমেও ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে এমন লড়াই প্রমাণ করে কতটা এগিয়েছে টিম টাইগার্স। ব্রাভো মুশফিক এন্ড কোম্পানি। বেস্ট অফ লাক ইন মিরপুর।








