‘এই আমার বাংলাদেশ! এজন্যই আমার পরিবারের এতো মানুষ শহীদ হয়েছে! আমার আর কেউ রইলো না।’ ডিবি কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের স্ত্রী অনিতা শিকদার ঠিক এই কথা বলে কাঁদছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হারানো অসুস্থ সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে ডিবি কার্যালযে বসিয়ে রাখার পর রাতে ফরিদপুর নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিক প্রবীরকে নিয়ে নানা শঙ্কায় থাকা পরিবারের অভিযোগ, ফরিদপুরের স্থানীয় সাংসদের কারণে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা হওয়ায় তাকে ফরিদপুরে নেওয়া হয়েছে।
তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলাটি করেছেন ফরিদপুরের এপিপি স্বপন কুমার পাল।
কেনো মামলায় জড়ানো হল এমন প্রশ্নের জবাবে প্রবীর শিকদারের বড় ছেলে সুপ্রিয় শিকদার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনই বাবার বিরুদ্ধে এই মামলা দিয়েছেন। মন্ত্রীর সাথে বাবার কোন শত্রুতা নেই। কয়েকদিন আগে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করে। সেই সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ফরিদপুরের কয়েকটি হিন্দু পরিবারের জমি অল্প দামে কিনে তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মন্ত্রীর ধারণা, আমার বাবাই ঢাকায় বসে সংবাদ সম্মেলনটি করিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, আমার বাবা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং সাংবাদিক হিসেবে সুবিচার পাবেন বলে অাশা করি।
প্রবীর শিকদারের ভাই পীযুষ শিকদার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পরিবারের ১৪ জনকে হত্যা করা হয়। ২০০১ সালে দৈনিক জনকন্ঠে ‘সেই রাজাকার’ শিরোনামে লেখালেখির কারণে আমার ভাই ডান পা হারান। সেসময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতায় প্রাণে রক্ষা পান। কিন্ত এখন আবার দেশদ্রোহী রাজাকারের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে কি এই পরিণতি বরণ করতে হবে!’
প্রবীর শিকদারের স্ত্রী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ফরিদপুরের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হলো, কোথায় যে নিয়ে যাওয়া হলো, আর তাকে দেখতে পাব কিনা জানি না।
অষ্টম শ্রেনী পড়ুয়া ছোট ছেলে পুলক শিকদার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমার বাবা জগতের একজন শ্রেষ্ঠ বাবা। আমি সাড়ে ৭টায় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মায়ের মুখে বাবাকে ডিবিতে নিয়ে আসার কথা শুনেছি।
রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে শেরে বাংলা নগর থানার এসআই জলিলের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। তখন তিনি তার ‘দৈনিক বাংলা ৭১’ ও অনলাইন পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ’ এর অফিসে কাজ করছিলেন। এরপর তাকে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, রোরবার সন্ধ্যা ৭টায় শেরে বাংলা নগর থানার এসআই জলিলসহ কয়েকজন পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং সাধারণ ডায়েরি করার নামে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তার পত্রিকা অফিস থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে থানায় না নিয়ে পুলিশ গাড়ি পরিবর্তন করে অন্য একটি গাড়িতে করে নিয়ে যায় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে (যার নম্বর ঢাকা মেট্রো- গ ১১৩৬৩৮)। এখান থেকে রাত ১২টার পর ঢাকা মেট্রো- চ ৫১৫৫১৮ নম্বরের একটি গাড়িতে করে ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
প্রবীর শিকদারের বড় ছেলে সুপ্রিয় শিকদার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বাবাকে এসআই জলিলের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাকের পুলিশ সাধারণ ডায়েরির বিষয়ে জানতে নিচে নিয়ে আসেন এরপর পুলিশের গাড়ি পরিবর্তন করে ডিবি কার্যালয়ে নেয়। তবে শেরে বাংলা নগর থানার এসআই জলিল সাধারণ ডায়েরির বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি তার খোঁজ নেওয়ার জন্য অফিসে গিয়েছিলাম। এর বেশি আমি কিছুই জানি না।
এর আগে ১০ আগষ্ট প্রবীর শিকদার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি তার প্রাণনাশের হুমকি আছে এবং দায়ি ব্যাক্তিদের নাম তুলে ধরেন। সেই স্ট্যাটাসটি ছিল; আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন; আমি আমার জীবন শংকার কথা পুলিশকে জানিয়েছি। কোনও লাভ হয়নি। তখনও ফেসবুকের মাধ্যমে আমার জীবন শংকার কথা জনতার আদালতে পেশ করেছিলাম। আর কোনও অভিযোগ করবার সময় ও সুযোগ আমি নাও পেতে পারি। আমি আজ ফেসবুকের মাধ্যমে জনতার আদালতে জানিয়ে রাখছি আবার সেই জীবন শংকার কথা। ফেসবুকের মাধ্যমে আমি সকল দেশবাসীর কাছে দোয়া চাইছি।
২০০১ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুর প্রতিনিধি থাকাকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় মারাত্মক আহত হন তিনি। সেসময় একটি পা হারান তিনি। এরপর দেশে বিদেশে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে তিনি দৈনিক সমকালে যোগ দেন। পরে কালেরকন্ঠে যোগ দেন তিনি। বর্তমানে তিনি একটি দৈনিক ও একটি অনলাইন পত্রিকা চালান।
জনকণ্ঠে থাকাকালীন তিনি ‘সেই রাজাকার’ শিরোনামে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেই প্রতিবেদেন তিনি বিশেষ কিছু ব্যক্তির মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়ে লেখার কারণে তার উপর হামলা হয়।






