চলতি বছরের জানুয়ারির এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালের কলকাতা! রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়ে মহামূল্যবান পাসপোর্ট হারিয়ে আমার দিশেহারা ভাব কিছুটা কমেছে সবে। অনেক দৌঁড়ঝাপ করে টিটাগড় থানায় জিডি করার সুযোগ পাই। এরপর বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে কর্মরত সাফিনুল ভাইয়ের কল্যাণে ট্রাভেল পারমিট হাতে পাই। দু’দিনের ভেতর ভারত সরকারের কাছ থেকে হাতে পাই এক্সিট পারমিট। ভাগ্য ভালো, দ্রুতই সবকিছু সমাধান হয়ে যায়! সাধারণত দেশের বাইরে পাসপোর্ট হারালে বহু জট ঝামেলা পোহাতে হয়। সৌভাগ্যবশত আমাকে তেমন সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে অস্বস্তি তো থাকেই। এই অস্বস্তির মধ্যেই দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুত হই।
১৪ জানুয়ারি দেশে ফেরার দিন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সারা হয়নি তখনো। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাত, যা করতেই হয়। ফলে ট্রেন ধরার পূর্ব মুহূর্তে সাক্ষাত করতে গেলাম অধ্যাপক ড. বিশ্বনাথ চক্রবর্তী স্যার (রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক) এর বাড়িতে।
সিঁথির মোড়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে লাগোয়া স্যারের বাড়ি। দারুণ আতিথিয়েতায় বরণ করে নিলেন তিনি। এর আগে দুবার সময় দিয়েও স্যারের বাসায় যেতে পারিনি। কারণ ওই একটাই, হঠাৎ পাসপোর্ট হারিয়ে অকাজের কাজ বেড়ে যাওয়া! শেষমেশ দেশের ট্রেন ধরার পূর্বমুহূর্তে স্যারের সঙ্গে সাক্ষাত করতে পেরে শান্তি পেয়েছি।
স্যারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময় কথা হলো বিভিন্ন বিষয়ে। লেখালেখি, শিক্ষকতা, গবেষণা, টিভি টকশো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের কার্যক্রম নিয়েও কিছু আলোচনা হয়। গবেষণা সংসদ সম্পর্কে স্যার আগে থেকেই জানেন। ২০১৮ সালে একটি সেমিনারে অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। তরুণ গবেষকদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখেছিলেন। সেসময় স্যার গবেষণা সংসদকে পশ্চিবঙ্গে আমন্ত্রণ জানান।

সেই কথারই পুনরাবৃত্তি হলো স্যারের বাড়িতে। বললেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করবেন তারা। আয়োজক সহযোগি হিসেবে থাকবে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। স্যার গবেষণা সংসদকে কনফারেন্সে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বললেন। আমিও নিশ্চিত করলাম, গবেষণা সংসদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ট্যুর হবে কলকাতায়। এটুকুই ছিলো কথা।
সেই থেকে শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ট্যুর আয়োজনের কর্মযজ্ঞ। তারও আগে ২০১৮ সালের আগস্টে আমরা আয়োজন করেছিলাম প্রথম আন্তর্জাতিক ট্যুর। সেটিও ভারতের সুন্দরতম পর্বতবিশিষ্ট মেঘের প্রদেশ-মেঘালয়ে। মেঘালয়ের নর্থ ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটিতে ৯ দিনের কর্মশালা ও কনফারেন্সে ১৮ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেছিলাম। পুরনো অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আমরা আরেকটি আন্তর্জাতিক ট্যুর আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করি।
দেশে ফিরে ফোনে অনেকবার কথা হয় বিশ্বনাথ স্যারের সঙ্গে। কথা হয় অনিল বিশ্বাস স্যারের সঙ্গে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক তিনি। স্যারের সঙ্গে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নানা বিষয়ে কথা হয়। হোয়াটসআপ কিংবা মোবাইলে স্যার নিজেই প্রায়ই ফোন করেন এবং গবেষণা সংসদের খবরাখবর নেন। বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেন। তিনিও বারবার সেপ্টেম্বরের কনফারেন্সের জন্য কাজ শুরু করার পরামর্শ দিয়ে গেলেন আমাকে।
সময় ঘনিয়ে আসে। নানা পরিকল্পনা খেলা করে মাথায়। একটি কনফারেন্সে গিয়ে বহু কাজ করে আসার চিন্তা আসে। একের ভেতর অনেক কিছু। একটি সুন্দর প্যাকেজের ভাবনা আসে। তার মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিট করার কথা ভাবলাম।
তখনো অবশ্য কনফারেন্সে অংশগ্রহণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। চূড়ান্ত হয় মূলত চলতি বছরের জুলাইয়ের কোনো একদিন। এই সময় বাংলাদেশের একটি কনফারেন্সে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে আসেন অধ্যাপক ড. রাজুকুমার কুঠারী স্যার। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী স্যারই আমাকে সে তথ্য দেন। তিনি রাজকুমার কুঠারী স্যারের সঙ্গে সাক্ষাত করে সেপ্টেম্বরের কনফারেন্সে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আলোচনা করার পরামর্শ দিলেন।
অধ্যাপক ড. রাজকুমার কুঠারী বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজের সভাপতি। পশ্চিবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিমান একজন গবেষক।

এমন একজন বিশ্বমানের গবেষকের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ লুফে নিয়েছি। বিশ্বনাথ স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী রাজকুমার কুঠারী স্যারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যাই। তিনি উঠেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন সায়েন্সেস (কার্স) এর অতিথিশালায়। এক সন্ধ্যায় গবেষণা সংসদের কয়েকজন সদস্য দলবেঁধে রাজ কুমার স্যারের সঙ্গে সাক্ষাত করি।
একেবারে সরল-সুন্দর মানুষ তিনি। স্যারের সঙ্গে সাক্ষাত করে এবং কথা বলে মনে অগাধ শ্রদ্ধা জন্ম নিলো। এমন সরল, আন্তরিক, বন্ধুত্বসুলভ শিক্ষক আমার ক্ষুদ্র জীবনে দেখিনি। আমরা পরিচিত হলাম স্যারের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের কথা বললাম এবং আমার লেখা ‘আর্মেনিয়ার বাংলাদেশ‘ বইটিও তাঁর হাতে তুলে দেই। সবকিছু জেনে শুনে অত্যন্ত আশান্বিত হলেন তিনি। আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করলেন নানা কথা বলে। সেই সঙ্গে সেপ্টেম্বরে কলকাতার কনফারেন্সের ব্যাপারে জানালেন। আমরা যেন অ্যাবস্ট্রাক্ট জমা দেই এবং টিম তৈরি করি। স্যার নিশ্চিত করলেন যে, গবেষণা সংসদ সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আমিও সেই বিষয়টি নিশ্চিত করি স্যারকে, আমরাও প্রস্তুত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ট্যুরের জন্য।
বেঙ্গল ইনস্টটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজ (বিপস) এর সভাপতির কনসার্ন নিয়ে আমরা কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য টিম গঠন শুরু করি। এই টিমের অংশীদার হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত প্রযোজ্য ছিল। যেমন-
১। গবেষণা সংসদের সক্রিয় সদস্য হওয়া, ২। গবেষণা কাজে অংশগ্রহণ, ৩। সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধ ও অনুগত, ৪। সদাচারণ, টিমে কাজ করার আগ্রহ ও অভ্যাস, ৫। ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগ করতে সক্ষম ৬। নিজস্ব পাসপোর্ট সঙ্গে থাকা এবং অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়া ইত্যাদি।
প্রথমে আমরা গবেষণা সংসদের মূল টিম, যারা বিভিন্ন গবেষণাকর্মে নেতৃত্ব দেয় তাদের থেকেই টিম গঠনের চেষ্টা করি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখি তাদের অনেকেরই পরীক্ষা হবে সেপ্টেম্বর মাসে। ফলে অন্য সদস্যদেরও আমরা সেপ্টেম্বরের কনফারেন্সে অংশগ্রহণের সুযোগের ব্যাপারটি অবহিত করি। ব্যাপক সাড়া এলো। অনেকে যাওয়ার জন্য প্রবল আগ্রহ দেখায়। কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতা ছিলো ২৪ জনের টিম হতে হবে। সেভাবেই টিম প্রস্তুত করি আমরা।
শুরু হলো কর্মযজ্ঞ।। গবেষণা সংসদের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি নাসরিন জেবিন এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক তানজিন আহসান এর নেতৃত্বে শুরু হলো প্যানেলভিত্তিক অ্যাবস্ট্রাক্ট তৈরির কাজ। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দ্রুততার সঙ্গে আমরা ৭টি অ্যাবস্ট্রাক্ট পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হই, সঙ্গে ২৪ জন গবেষকের তালিকাও। এক্ষেত্রে গবেষণা সংসদের গবেষণা পরিচালক সুন্দর ও উদার মানুষ কাজী সামিও শীশ ভাইয়ার সার্বিক সহযোগিতার কথা বলতেই হয়। তার সুপারভাইজিংয়েই মূলত আমাদের টিমগুলো নিজেদের গবেষণাকর্মগুলো সম্পন্ন করতে পেরেছে এবং আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণের সাহস পেয়েছে।
প্রত্যেকের সার্বিক উদ্যোগে অ্যাবস্ট্রাক্ট এবং সদস্যদের তালিকা পাঠানোর পর ফোনে কথা বলি রাজকুমার কুঠারী স্যার এবং তাঁর টিমের সঙ্গে। স্যার জানালেন আমাদের সদস্যদের অ্যাবস্ট্রাক্ট এবং অংশগ্রহণকারীদের তালিকা গ্রহণ করেছেন আয়োজক কমিটি। কয়েকদিনের মধ্যে কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হলো। রাজকুমার স্যার আরেকটি সুসংবাদ দিলেন। তাঁর নিজের ক্যাম্পাস বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করার কথা জানালেন। একই সঙ্গে আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ড. দেবাশিস নন্দী স্যারও দিলেন আরেকটি সুন্দর সংবাদ। তাঁরাও একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদকে আমন্ত্রণ জানালেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ও আমাদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত সেমিনার আয়োজনের কথা জানায়। কিন্তু সময়ের স্বল্পতায় তা আর হয়ে উঠেনি।
যাহোক, বিশ্বনাথ স্যার, রাজকুমার স্যার, দেবাশিস স্যারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় কয়েকদিনের মধ্যে আমরা যাদবপুরের কনফারেন্স, বিদ্যাসাগরের এবং কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্সে অংশহণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করি এবং সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করি। এরই মধ্যে কলকাতায় আমাদের থাকার সুব্যবস্থাও হয়ে গেছে। পশ্চিবঙ্গ সরকারের সল্ট লেক স্টেডিয়ামের ভেতরে সরকারি ইয়ুথ হোস্টেলে বুকিং করেছেন বিশ্বনাথ স্যার। ভারতের যুব মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে তিনি আমাদের থাকার সুব্যবস্থা করেছেন। একই সঙ্গে ২৪ জনের থাকার ব্যবস্থা করা আসলেই কঠিন ব্যাপার!
মোটামুটি সবকিছু প্রস্তুত। এবার ভারতীয় ভিসা নিশ্চিত করার পালা। এটাই হলো আমাদের জন্য বড় বাঁধা। ভারত আমাদের পরম বন্ধু। অথচ বন্ধুর কাছে যেতে কত শর্ত পূরণ করার প্রয়োজন পড়ে! এমন বন্ধুত্ব কেন? বারবার প্রশ্ন জাগে মনে! বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কি আমরা পারি না, দু’দেশের যাতায়াতে ভিসা ফ্রি করে দিতে? আমরা কি পারি না এই কাঁটাতার গুড়িয়ে দিতে? বন্ধুত্বের উদারতা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলে তা সম্ভব। ভিসা ফ্রি থাকলে আজ আমাদের নিজেদের শিক্ষা-সংস্কৃতির আদান-প্রদান করতে যেতে ভিসা করতে হতো না। নেই বলেই কনফারেন্সে যেতে করতে হচ্ছে কনফারেন্স ভিসা। সাধারণত আমন্ত্রণপত্র থাকলে তার জন্য কনফারেন্স ভিসাই প্রদান করে ভারতীয় হাইকমিশন। মেয়াদ এক মাস। এই ভিসা নিয়ে এক মাস কোনো প্রকারে বন্ধুর বাড়ি বসবাস করা যাবে!
ভিসা করার জন্য জরুরি কাগজ সংগ্রহ শুরু করি আমরা। এর মধ্যে দেখা গেলো ২৪ জনের টিমে দুয়েকজনের পাসপোর্ট নেই। দ্রুত তাদের পাসপোর্ট করার ব্যবস্থা করা হলো। তারপর জরুরি কাগজপত্র সংগ্রহ শুরু হলো। ডলার এনডোর্স করা হলো। ভিসা করার জন্য বিদ্যুত বিল, ন্যাশনাল আইডি, স্টুডেন্ট আইডি, গবেষণা সংসদের মডারেটরের প্রত্যয়নপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট/ ডলার এনডোর্সমেন্টের কাগজ সঙ্গে পাসপোর্ট এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণপত্র।
ভারতে যাওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে আমরা ভিসার জন্য আবেদন করি। যমুনা ফিউচার পার্কে বিশাল ভারতীয় ভিসা সেন্টার তৈরি হয়েছে। সেখানে দীর্ঘ লাইন। সেই লাইনে অপেক্ষা শেষ করে ভিসা আবেদন সম্পন্ন করি। আমার ভিসা করার জন্য অবশ্য অতিরিক্ত ডকুমেন্টস জমা দিতে হয়েছে। হারানো পাসপোর্টের জিডির সঙ্গে লস্ট সার্টিফিকেট! সবকিছু দিয়েও আমি অনেক শঙ্কা নিয়ে ভিসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।

সবার অপেক্ষা এখন ভিসা পাওয়ার। যতোই দিন ঘনিয়ে আসছে আমাদের তরুণ গবেষকদের মন ততোই উৎফুল্ল হয়ে উঠে। কেননা তাদের অধিকাংশই প্রথমবার দেশের বাইরে যাবে। ২৪ জনের মধ্যে অন্তত ১৮ জন স্নাতক অধ্যয়নরত। একেবারে নতুন তারা। টগবগে তরুণ। স্বাভাবিকভাবে প্রথমবার দেশের বাইরে ভ্রমণ নিয়ে বহু পরিকল্পনা থাকেই। প্রত্যেকে কনফারেন্সের পাশাপাশি কোথায় ঘুরবে, কোথায় শপিং করবে, কী শপিং করবে তার তালিকাও করে ফেলেছে ইতোমধ্যে!
ভিসার জন্য অপেক্ষার মধ্যেই জানা গেলো, পরীক্ষার কারণে কয়েকজন এই ট্যুরে আমাদের সঙ্গী হতে পারছে না। প্রবল ইচ্ছা সত্ত্বেও তারা কনফারেন্সে অংশ নিতে পারছে না। আরও দুজন পরীক্ষার পর অংশ নিতে পারবে। তারা ৪ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা শেষে কলকাতার পথ ধরবে। আর আমরা রওয়ানা দিব ২ সেপ্টেম্বর। ফলে ২৪ জনের টিম ২০ জন হয়ে গেলো। ২ জন পরীক্ষা শেষে যাবে। তার মানে আমরা একসঙ্গে যাচ্ছি ১৯ জন। অন্যজন হলেন তানজিন আহসানের বাবা, তিনি আমাদের প্রথম ট্যুরেও সঙ্গী হয়েছিলেন। প্রবীণ মানুষ, ঘুরতে পছন্দ করেন। নবীনদের সঙ্গে একজন প্রবীণ থাকলে সাহস পাওয়া যায়।
শেষ পর্যন্ত আমাদের পূর্ণাঙ্গ টিমের সদস্যরা হচ্ছে নাসরিন জেবিন, তানজিন আহসান, তাহেরা তরী, আসাদুজ্জামান, মাহবুবুল হক মেহেদী, আশিকুর রহমান, ফাহমিদা যারীন, শাহরিন ফারাহ খান, সাদিয়া আফরোজা, রাজিব দাস, আজমির রহমান, তাহমিদ উল ইসলাম, মনজুরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল নোমান, জুনাইদ জাফর, জোয়াঙ রাখাইন, জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত, অঙ্কন জয়া দাস, আবিসাত নাদভি; প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা অসাধারণ মেধাবী ও কর্মঠ।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের ভিসা হাতে পেলাম। একটা শঙ্কা দূর হয়ে গেলো! ভিসা পাওয়ার সাথে সাথে বাসের টিকেট করতে চলে এলাম কলাবাগান বাস কাউন্টারে। সাধারণত শ্যামলী-বিআরটিসি বাস ঢাকা থেকে সরাসরি কলকাতায় যায়। আমরা শ্যামলী বাসের টিকেটের চেষ্টা করিনি। গ্রিনলাইনে নজর দিলাম। এই পথে গ্রিনলাইন ছাড়াও টিআর ট্রাভেলস, সৌদিয়া, লন্ডন এক্সপ্রেস, সোহাগ ইত্যাদি বাসও যায়। সবগুলো বাসই বেনাপোল গিয়ে থামে। সীমান্তের ওপারে গিয়ে তাদের অন্য বাস থাকে। আমরা নিলাম গ্রিনলাইনের বিজনেস ক্লাস টিকেট। ভাড়া ১৭শ টাকা করে জনপ্রতি।। আগেরদিন সবাই ৫০০ টাকা করে ট্রাভেল ট্যাক্স আদায় করেছি। এছাড়া প্রত্যেকের মার্কিন ডলার ক্রয় করা হয়ে গেছে।
সমস্ত প্রস্তুতি শেষ! কলকাতার পথ ধরার আগেরদিন আমরা সৌজন্য সাক্ষাত করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক, উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান স্যারের সঙ্গে। তিনি শুভকামনা জানালেন। বললেন, কনফারেন্স আয়োজক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে যেন তার শুভেচ্ছা এবং ধন্যবাদ পৌঁছে দেই। স্যারের দোয়া নেওয়া হলো। এবার কাঙ্ক্ষিত সেই সময় শুভযাত্রার সময়।
২ সেপ্টেম্বর রাত ১০টায় কলাবাগান গ্রিনলাইন কাউন্টার থেকে শুরু হলো যাত্রা। লক্ষ্য আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারত। আমরা যাচ্ছি বঙ্গ প্রদেশে, যার অংশিদার একটা সময় আমরাও ছিলাম, পশ্চিবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শহর, ব্রিটিশদের হাত ধরে তিনটি গ্রাম সুতানুটি, ডিহি কলিকাতা ও গোবিন্দপুর নিয়ে তৈরি সিটি অব জয় নামে খ্যাত, প্রাচীন শহর এবং ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতায়…।








