করোনা ভাইরাসের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দুই বছর পর নতুন উদ্যোমে রাজধানীর রমনা বটমূলে নানান আয়োজনে বাংলা নববর্ষ ১৪২৯-কে বরণ করে নিয়েছে ছায়ানট। সূর্যোদয়ের পর পরই বংশীবাদন, গান, কবিতায় বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে।
বরাবরের মতো এবারেও রমনার বটমূলে বাঁশিতে ভোরের রাগালাপের পর সম্মিলিত কণ্ঠে ‘মন জাগ মঙ্গললোকে অমল অমৃতময় নব আলোকে…’ রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে বৃহস্পতিবার ভোর সোয়া ছয়টায় শুরু হয় বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা।
ছায়ানটের পক্ষ থেকে বলা হয়, যে জরা, ব্যাধি এবং শঙ্কাগুলো ছিল সে সকল বিষয় কাটিয়ে আজ থেকে নতুন একটি বছর শুরু হলো। নতুন বছরটি স্বপ্নে উচ্ছ্বসিত হবার মতো একটি বছর হবে এমনটিই প্রত্যাশা ছায়ানটের।
বর্ষবরণের পাশাপাশি মঙ্গল ও সম্মৃদ্ধি কামনায় দেশের মানুষকেও নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানায় ছায়ানট।
করোনার দু বছর পর এ আয়োজন স্বল্প পরিসরের হলেও ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
ভোর থেকে অনুষ্ঠান ঘিরে দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। তারা প্রত্যাশা করেছেন এ আয়োজন যেন আর থমকে না যায়।
এর আগে গত ২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে ছায়ানটের সভাপতি বরেণ্য সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘আগ্রাসী করোনাকে দমাতে প্রায় দুবছর আমরা গৃহবন্দি ছিলাম। এক বাস্তবিক মানবিক-সামাজিক-মানসিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়কাল। সব শেকল ভেঙে বিশ্বজুড়েই আজ নব আনন্দে জেগে উঠবার আহ্বান।’
বাঙালির অস্তিত্ব নিয়ে পাকিস্তানের চোখ রাঙানির মধ্যে ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজন শুরু হবার পর এর আগে কেবল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়েই তাতে ছেদ পড়েছিল।
যেভাবে এলো পহেলা বৈশাখ
এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। পরে কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলা সন গণনার শুরু হয়। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন।
অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।
মূলত ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের।
ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। এসময় ঢাকায় নাগরিক পর্যায়ে ছায়ানটের উদ্যোগে সীমিত আকারে বর্ষবরণ শুরু হয়। আমাদের মহান স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এই উৎসব নাগরিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে।
কালক্রমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।








