সকাল শেষ হয়ে আসছে। এই শীত-শীত অনুভব সকালের তুলনা নেই। এক স্নিগ্ধসৌম্য মায়া জড়িয়ে এতে। প্রকৃতিতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের প্রিয় ঋতু শীত। এই শীতে খেজুরের রস, পিঠে-পায়েশ, মিঠে রোদ- আয়েশ জমজমাট। শীতের সকাল মানেই অন্য রকম দৃশ্য। অন্য রকম আনন্দের সুখ। যদিও সকালে ঠান্ডা কামড়টা বেড়ে যায়। তবুও আরাম। চারদিকে কুয়াশার বিস্তীর্ণ চাদর। বিশেষ করে বাংলাদেশের সবুজ গাঁয়ে কুয়াশার দৃশ্য আশ্চর্যজনক দেখায়। ঘন কুয়াশায় ডুবে থাকে সারা গ্রাম। কোথাও কিছু দেখার উপায় নেই। ঘরবাড়ি, গ্রাম, জলাশয়, বাঁশঝাড় এবং বিশাল প্রান্তর জুড়ে কুয়াশা আর কুয়াশা। গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া কুয়াশার শব্দ খুব মজার।
শীতের দিনের নারকেলের নকশি পিঠা, পোস্তদানা পিঠা, সুজির দুধ বড়া, চিতই পিঠা, রস পিঠা, ডিম চিতই পিঠা, দোল পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা, পাকান, আন্দাশা, কাটা পিঠা, ছিট পিঠা, গোকুল পিঠা, চুটকি পিঠা, মুঠি পিঠা, জামদানি পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, পাতা পিঠা, ঝুড়ি পিঠা-এমনি আরও কত নাম! যা নতুন বরের ন্যায় শুভেচ্ছা জানায়। কুয়াশায় ভিজে থাকা ভোরে ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠায় কামড় দিলে কেমন লাগে এবার ভাবা যাক! আহারে সুখ! আহারে আনন্দ! হা করলে মুখ থেকে বেরোয় ধোঁয়া। আবার ভাপা পিঠার দেহ থেকেও ধোঁয়ার ওড়াউড়ি। আহ! কী এক দৃশ্যগো! মনটা চলে যায় সেই আনন্দময় ভোরের কুয়াশাময় সকালে।
কলাপাতার দীর্ঘ পিঠে যখন ঝরে কুয়াশা তখন তাকে বৃষ্টিই মনে হয়। মনে হয় গুঁড়ি বৃষ্টিরা জমে জমে ধুয়ে দেয় পাতার শরীর। ডুমুর অথবা চালতা কিংবা সেগুন পাতার পিঠও একই রকম ধুয়ে যায়। এসব দৃশ্য নিয়েই সমৃদ্ধ আমাদের এ বাংলাদেশ। খোলা মাঠে কুয়াশার খেলা আরো আনন্দময়। বিশাল মাঠকে মনে হয় কুয়াশার বিশাল দীঘি। যেন উপরে নীচে কেবলই কুয়াশা। আকাশ ও জমিন বলে কিছু নেই। সবকিছু ঢেকে রাজত্ব কায়েম করে কুয়াশা। পাখিদের ওড়াউড়ি নেই কোথাও। মানুষের চলাচল খুবই কম। কিছু কিছু রাখাল গরু অথবা মেষের পাল নিয়ে এগিয়ে যায় অতি ধীরে। কুয়াশার সাদা দেয়াল ভেঙে ভেঙে গরু মেষ ছুটে চলে চরের দিকে। এইতো আমাদের গ্রামের শীতকালের প্রাণময় সকাল।
কিন্তু আর একটা শীত রয়েছে। সত্যিকারের হিম করা ঠান্ডা, প্লাস্টিকের ছাউনি, লক্ষ লক্ষ মানুষ, সোয়েটার-কম্বল দাক্ষিণ্যনির্ভর বিলাস, উদ্ধার অসম্ভব, খেদানি অবশ্যম্ভাবী। মৃত্যু যখন তখন কাছাকাছি। এ হল রিফিউজি ক্যাম্পগুলোর শীত। দুনিয়া জুড়ে অন্তত দু’কোটি মানুষ এখন শরণার্থী শিবিরে বাস করছেন। সেই সব ছাউনিতে এখন শীত নেমেছে। কনকনে শীত! তাদের জন্য এই শীত যেন মারণাস্ত্র। তরবারির মতো বিদ্ধ করছে নারী-শিশু-বৃদ্ধদের। তিলে তিলে ধ্বংস করতে কনকনে হাওয়া বইছে।
এই ছাউনিগুলির কিছু কিছু রয়েছে একেবারে অকূলপাথারের মাঝখানে। নানান দ্বীপে। সেই সব দ্বীপভূমিতে লড়াই করছেন রিফিউজিরা। ইরাক বা সিরিয়ার অন্তত দশ হাজার শরণার্থী ঘাড়-মুখ গুঁজে রয়েছেন গ্রিসের লেসবস, সামোস চিয়োস-এর মতো দ্বীপগুলিতে। এক একটা ক্যাম্পে যত জন মানুষ থাকতে পারে, তার চেয়ে তিন গুণ মানুষ চাপাচাপি করে বাঁচতে চাইছেন। এমন ঠাসাঠাসি চলছে যে সম্পূর্ণ অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে এক তাঁবুতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন নারী, এবং উল্টোটাও সত্যি। ফলে নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলাই বোকামি। এ বার এই সব জায়গায় ‘সারভারভাইল অব দ্য ফিটেস্ট’ নিয়ম যাচাই হবে। পরিত্রাণ, নিষ্কৃতি আর বাঁচার তাগিদের মধ্যে শেষটির জোর যত বেশি হবে, ডারউইন তত সত্য প্রমাণিত হবেন।
গ্রিসের দ্বীপগুলোয় যে সব শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের সে দেশের মূল ভূখণ্ডে যাওয়া মানা। দশ হাজারের মধ্যে মাত্র দু’হাজার শরণার্থীকে আইনি ব্যবস্থায় গ্রিসের মূল ভূখণ্ডে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। বাকিদের জন্য রাস্তা বন্ধ। কিন্তু এই সব দ্বীপে বাঁচার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই। রিফিউজিদের যা হচ্ছে, তা তো হচ্ছেই, ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’-এ দ্বীপের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপন্ন। লেসবস দ্বীপের বাসিন্দারা বলছেন, তাদের বসবাসের জায়গাটিকে একটি আস্ত রিফিউজি জেল বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেই জেলে যারা বাস করছেন, তাদের তো জীবন বাঁচার অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তার ওপর ভয়ংকর শীত এসে পড়েছে। এই শীতে যে কত শরণার্থী মারা যাবেন, তাঁদের মধ্যে কত বৃদ্ধ ও শিশু থাকবে, কত জনের প্রাণসংশয় হবে, তার হিসেব কষতে হলে বুকের পাটা লোহা দিয়ে তৈরি হতে হবে।
শীত পড়ছে মানুস দ্বীপেও। পাপুয়া নিউ গিনির দ্বীপটায় আটকে পড়ে রয়েছেন প্রায় সাতশো মানুষ, সকলেই পুরুষ। এরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসে জড়ো হয়েছেন। এখানে প্রাকৃতিক জেল না তৈরি করে একেবারে বাঁধাধরা গতে আটকে রাখা হয়েছে মানুষগুলোকে। তাদের জন্য আছে ভাড়া করা নিরাপত্তা কর্মী। বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক সময় স্থানীয় লোকদের দাবড়ানি খেতে হয় এই কয়েদিদের। রাগারাগি হাতাহাতি, ভয়ংকর মারপিট অবধি পৌঁছয়। ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় দেহমন। অথচ তাঁরা বেঁচে আছেন। কেন? মরে যাননি বলে। অনেকে অবশ্য আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন। কেউ কাঁচি গিলে নিয়ে, কেউ ব্লেড চিবিয়ে।
অস্ট্রেলিয়া এই শরণার্থীদের বিষয়ে পাপুয়া নিউ গিনিকে সাহায্য করবে বলেছিল। কিন্তু এখন তা নিয়ে রীতিমত সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন অস্ট্রেলীয় সরকারের সঙ্গে আমেরিকার একটি বোঝাপড়া হয়েছিল যে, আমেরিকা এই শরণার্থীদের আশ্রয় ও দেখভালের জন্য সাহায্য করবে, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে সেই সব চুক্তি নস্যাৎ করে দিয়েছেন। সুতরাং রিফিউজিরা ভয়ে আছেন, অস্ট্রেলিয়াও মুখ ফেরাতে পারে। সম্প্রতি এই কয়েদখানায় আলো, জল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে। বন্দিদের মধ্যে এক জন কুর্দ সাংবাদিক সৌরশক্তির সাহায্যে নিজের মোবাইল ফোনে চার্জ দিয়ে টুইটারের মাধ্যমে তাদের এই প্রচণ্ড অমানবিক অবস্থা, এই বুক নিংড়ানো যন্ত্রণার কথা জানানোর চেষ্টা করে চলেছেন।
উল্লিখিত রিফিউজিদের কথা জেনেছি মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া মারফত। কিন্তু মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা, পচে-গলে-মরে যাওয়ার পর যারা টিকে আছে, সেই সব রোহিঙ্গাদের নিজ চোখে দেখেছি। প্লাস্টিকের ঘেড়া দেওয়া পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট খুপরি ঘরে তাদের বাস। আপাতত তাদের গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে। তবে তারাও দ্বীপান্তরের বাজনা শুনছেন। প্রায় দশ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ সরকার আশ্রয় দিতে অক্ষম। তাই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাঠিয়ে দেওয়ার কথা হচ্ছে জনমানবহীন এক চরে— ঠেঙার চর। যে চর কখনও জলের তলায় ডুবে যায়, কখনও জেগে ওঠে। জোয়ারভাটার মতিগতির ওপর নির্ভর করে তার অস্তিত্ব। এমন জায়গায় পাঠানোর কারণ? এত লোক থাকবে কোথায় দেশের মধ্যে? মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে তাদের ধাপে ধাপে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে একটা চুক্তি সই হয়েছে বটে, কিন্তু সেই চুক্তি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না, সে বিষয়ে রয়েছে ঘোরতোর সন্দেহ। আর এই রোহিঙ্গারাও নাগরিকত্ব, ক্ষয়ক্ষতির উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, যা ফেলে এসেছে, তার সব কিছু ফিরিয়ে দেওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে গ্যারান্টি না পেলে ফিরে যাবে না বলে অঙ্গীকারাবদ্ধ! কাজেই এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য আপাতত বাংলাদেশেই আশ্রয় চাই। ‘ঠেঙার চর’ সে বিবেচনায় একমাত্র বিকল্প।
এই যে লাখ লাখ মানবসন্তান, তাদের বাঁচার রসদ কই? আপাতত ত্রাণ দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? যখন রসদ শেষ হয়ে যাবে তখন কী হবে? সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ত্রাণ পৌঁছনোর হিড়িক কমবে, গাফিলতি আর ঔদাসীন্য তার জায়গা নিয়ে নেবে। এদিকে শীত মরণ-কামড় বসাতে শুরু করেছে। শীত এই ভাগ্যহত মানুষগুলোর ওপর ‘এক হাত’ নিয়ে এক সময় হয়তো বিদায় নেবে। আসবে বর্ষা-বন্যা। এরপর আঘাত হানবে অতিবৃষ্টি-ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস! পুঁতিগন্ধময় নোংরা পরিবেশে আধপেটা খাওয়া রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিতেই থাকবে। তখন ডারউইনের অন্য সূত্রটি প্রমাণিত হবে- প্রাকৃতিক নির্বাচন। পাঁজরের হাড় বের করা শরণার্থীদের জন্য প্রকৃতির প্রশ্নপত্র সহজ হবে না। নেচারের মার খেতে খেতে, তার সঙ্গে লড়াই করে যে ওই চরে টিকে থাকতে পারবে, সেই বেঁচে থাকার যোগ্য হবে- ন্যাচরাল সিলেকশন।
আর তার পর? তার পর দুনিয়ার নানা দ্বীপ আর চর জুড়ে আস্তে আস্তে অ্যামিবা-সময় থেকে হয়তো এই রিফিউজিরা তৈরি করতে শুরু করবে নতুন জনপদ, সেই জনপদ থেকে তৈরি হবে নতুন দেশ। প্রথমে দু’দলের বা চার দলের লড়াই হবে, তার পর মধ্যস্থতা, আর তার পর একটা করে নতুন দেশ গজিয়ে উঠবে মানচিত্রে- রিফিউজিস্তান, রিফিউজি নেশন, রিপাবলিক অব রিফিউজিস। অথবা হোস্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অসম লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে মরে-পচে নিঃশেষ হয়ে যাবে। কেউ কেউ মিশে যাবে মূলধারায়। এ ছাড়া এই রিফিউজিদের আর ভবিতব্য কী?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







