ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পাচার্য্ জয়নুল গ্যালারি। বিশাল গ্যালারির মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো নানা রঙের মুখোশ। কাগজ কেটে তার ওপর রঙ করা মুখোশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হুতুম পেচা, বাঘসহ নানা প্রাণীর অবয়ব। মেঝেতে জায়গা না হওয়ায় কিছু মুখোশ দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা। বিক্রির জন্য এসব মুখোশ বানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। মুখোশ ব্রিক্রি করে যে আয় হবে, তা দিয়েই আয়োজন করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।
শুধু মুখোশ নয়, চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের আঁকা ছবি বিক্রি হচ্ছে এখানে। বিক্রি হচ্ছে কাগজের ফুল, পাখি, ছবি আঁকা মাটির সরা। পহেলা বৈশাখের বাকি এক সপ্তাহ। বলা চলে ঘুম নেই শিল্পকলার শিক্ষার্থী আর শিক্ষকদের। বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। আজ শুক্রবার সকাল হতেই এসে দোকান খুলে বসেছেন।
চারুকলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে অস্থায়ী দোকান। হাসিমুখে ক্রেতা দর্শনার্থীদের সরা, পাখি, মাটির ব্যাংক দেখাচ্ছেন চারুকলার ১৯ ব্যাচের ছাত্রী শামস-ই-ইসলাম তাম্মি। জানালেন, ছবি আঁকার ওপর নির্ভর করে মাটির সরার দাম নির্ধারন হয়। প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। ফুল ও পাখি ১০০ থেকে আড়াইশ টাকা। মুখোশের দাম ৮০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। ছাত্রদের আঁকা ছবি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়। শিক্ষকদের আঁকা ছবি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায়।’
মালিবাগ থেকে আসা সোহেল-মিতা দম্পতি একহাজার টাকা দিয়ে একটি সরা কিনেছেন। সঙ্গে দুটি মুখোশ। তাদের অভিযোগ, ‘দাম বেশি রাখা হচ্ছে।’ তাম্মি বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার কোনো স্পন্সর নেই। আমরা চারুকলার শিক্ষার্থীরা নিজেদের হাতে আঁকা ছবি, পাখি, ফুল, সরা, মুখোশ বিক্রি করে প্রতি বছর এই আয়োজন করে থাকি। হাতে আঁকা বলে সময় ও খরচের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এটাকে মূল্য হিসেবে না দেখে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে। একটি ছবি বা অন্যকিছু কেনার মানে হলো তিনি আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই শোভাযাত্রায় কন্ট্রিবিউট করছেন।’

বদরুল হাসান কচি নামে সুপ্রিম কোর্টের এক তরুণ আইনজিবিকে দেখা যায় তিনটি মাটির সরা কিনতে। বদরুল হাসান বললেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এটা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে অপশক্তি। হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। সংস্কৃতি সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত শোভাযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়া। আর তাই তিনটে সরা কিনেছি। যা আমার ঘরের শোভা বৃদ্ধি করবে, আবার শোভাযাত্রাকে উৎসাহিত করবে।’
১৮ ব্যাচের ছাত্র প্রীতম মজুমদার জানান, এবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাটির সরা ও মুখোশের অর্ডার পাচ্ছেন। কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ থেকে অনেকগুলো অর্ডার এসেছে। দেশব্যাপী মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনের নির্দেশ আসায় তাদের বিক্রি বেড়েছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রার এবারের প্রতিপাদ্য ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরজ সত্যসুন্দর’। চারুকলা অনুষদের ১৮ ও ১৯ ব্যাচ এবারের আয়োজক।
১৯৮৯ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলা সনের প্রথম দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বর্ষবরণ করতে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।







