অন্যান্য

ভাষার বদলে ‘মুকাভিনয়’ শিখে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা

ভাষার বদলে ‘মুকাভিনয়’ শিখে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিবিসি হিন্দি চ্যানেলের ইন্টারভিউতে হিন্দি ভাষায় কথোপকথন ও ভারতীয় আরেকটি চ্যানেলে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর হিন্দিতে দেওয়া ইন্টারভিউ সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে ভাইরাল হয়েছে।

হিন্দি ভাষায় কথা বলার প্রসঙ্গে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন প্রবাসী সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মাসকাওয়াথ আহসান।

‘বহু ভাষাবিদ হওয়া অমার্জনীয় অপরাধ’ শীর্ষক স্যাটায়ারমূলক এক পোস্টে তিনি লিখেছেন,

‘আমাদের পন্ডিত মহাশয়দের একটি বদ-অভ্যাস ছিলো এবং আছে; সেটা হচ্ছে বহুভাষাবিদ হওয়া। আমার মতে এটা একেবারেই ঠিক নয়। মানুষ শুধু একটিই ভাষা জানবে। নইলে তা নিজ ভাষাগোত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। গভীর বেদনার সঙ্গে বলতে হয় ড মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনী পাঠ্যপুস্তকে রাখা একেবারেই ঠিক হয়নি। এরফলে অনেকে বহুভাষাবিদ হয়ে অমার্জনীয় অপরাধ করেছে।

আমাদের আইকনেরা আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আইরিশ সুরের ফিউশানের সঙ্গে বাংলা গীতিকবিতা মিশিয়ে তারুণ্যকে বেপথু করলেন। কাজী নজরুল ইসলাম রাজ্যের সব ভিনদেশী শব্দ ঢুকিয়ে দিলেন বাংলায়। সৈয়দ মুজতবা আলী আরেক অদ্ভুত মানুষ; বহুভাষাবিদ রসিক মানুষ; তিনিও তারুণ্যকে বেপথু করলেন নানা ভাষার শব্দ রসদের রসগোল্লা খাইয়ে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ উপন্যাস লিখলেন বাংলায়; অথচ উপন্যাসের আঙ্গিক-কাঠামো-বাক্য বিন্যাসে ফরাসী সুর। এগুলো অনুচিত হয়েছে।

সত্যজিত রায়ের ফেলুদা ঝরঝরে বাংলা-ইংরেজি-হিন্দী বলতে পারায় ফেলুদার অনুসারী হিসেবে অনেক তরুণ বহুভাষাবিদ হয়েছে। এটা কী করলেন সত্যজিত রায়! তাঁর কী বাংলা ভাষার প্রতি কোন মায়াদয়া নেই!

শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন; এইসব কুমিল্লার ছেলেরা তাদের গানগুলো বোম্বাই ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে হিন্দী করে দিয়েছেন। কিশোর , হেমন্ত বাংলা ভাষার গায়ক হয়েও বোম্বে তোলপাড় করে দিলেন। এমন কী লাহিড়ী মোহনপুরের স্বর্ণালংকার প্রিয় শিল্পী বাপ্পী লাহিড়ী “যে জন প্রেমের ভাব জানে না” গানের ফিউশান হিন্দী ভাষায় ঢুকিয়ে দিলেন। ভারতের অ-বাংলাভাষীরা অবশ্য এইসব বাংলা গানের তারার মোহে “আপনি কেমন আছেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি” এতটুকু বলতে শিখেছে। কিন্তু কেন জানিনা এরা চরম দেশপ্রেমিক একভাষী বাংলাদেশী কারো কারো সঙ্গে দেখা হলেই হিন্দী বলে! অথচ হিন্দীভাষীরা মনে করে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কন্ঠে সুর আছে; যা তাদের নেই। তাইতো বাংলাদেশের জেমস বলিউড তোলপাড় করে আসেন। আর শ্রেয়া ঘোষাল ছাড়া বলিউড ভাবতে পারেনা স্নিগ্ধ কন্ঠের সেরা গানগুলোর কথা। বাংলাদেশের রুনা লায়লা ভারতের সংগীত জগতে বিশেষ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। আজকাল বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তার কারণে বলিউডে বাংলা গানের কলি ফিউশান আকারে ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর মোঃ রফি থেকে অনুপ জালোটা; অনেক অ-বাংলাভাষী গায়ক আনন্দের সঙ্গে বাংলা গান গেয়েছেন। কিন্তু তারপরেও এইগুলা ঠিক হয় নাই।

বাংলা ভাষার শক্ত গাঁথুনির ওপর ইংরেজির জোড়ো বাংলো ঘর তোলার রবি ঠাকুরীয় উপদেশ শুনে অজ্ঞাতেই বিরাট ভ্রান্তির কবলে পড়েছে অনেকে। রবীন্দ্রনাথ ভদ্রলোককে অন্ধভাবে বিশ্বাস করাতেই যত বিভ্রাট। আমাদের উচিত ছিলো শুধু আমাদের নিজ দেশের নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষা শেখা। এবং নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল এরকম নানা আঞ্চলিক ভাষার মানুষদের যোগাযোগের সুবিধার জন্য দ্বো-ভাষী নিয়োগ করা। কথিত প্রমিত বাংলার আধিপত্যবাদের কোন দরকার ছিলোনা। এখনো সময় আছে; আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদেশী ভাষা বিভাগ বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশের নানা আঞ্চলিক ভাষার বিভাগ গড়ে তুলতে পারি। বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনে যেমন আত্মত্যাগের রক্ত রয়েছে; তেমন আত্মত্যাগের রক্তের ইতিহাস ভারতের বাংলাভাষী এলাকাগুলোতেও রয়েছে। তবুও সেখানকার তরুণ-তরুণীরা বাংলা-ইংরেজী-হিন্দী এমনকি ফরাসী/জর্মন ভাষা শেখে। কারণ তাদের আবেগের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ঐসব ভুল দৃষ্টান্তের দিকে তাকানোর কোন দরকার নাই। ভারতের তরুণেরা কেন পেশাগত ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে এতো সুনাম কুড়িয়েছে; তার উত্তর ঐ যোগাযোগ দক্ষতা; বহুভাষাবিদ হবার আগ্রহ। কিন্তু ঐসব আবেগহীন বেগ দেখার কোন দরকার নাই। জীবনে আবেগ না থাকলে আর কী থাকে! চিতকার করে হাসি-কান্না-ঝগড়া-ঘৃণা-পরচর্চা-ঈর্ষা-ছিদ্রান্বেষণ এই সমস্ত শিল্প চর্চা করতে হবে আঞ্চলিক ভাষায়। প্রমিত বাংলা বলা মহাপাপ। বিশ্বের অন্যসব ভাষা না শিখে জাতীয় পর্যায়ে মুকাভিনয় কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানীর জন্য আমরা জনশক্তিও তৈরী করতে পারি। বহুভাষাবিদদের শুভবোধের উদয় হোক।

বিষয়:মাসকাওয়াথ আহসান

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…