সাল ২০১৮। ১১ মে বিকালবেলা। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন। সংগঠনটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সম্মেলন উদ্বোধন করে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অতীত এবং আজকের রাজনীতির অনেক দৃশ্যপট বর্ণনা করলেন। স্মরণ করিয়ে দিলেন তার পিতা, বাংলাদেশের সত্যিকারের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনকথা। ছাত্রদের আবারো বললেন, শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠ করার জন্য। অনেক কথার ফাঁকে তিনি ছাত্রনেতা এবং সাধারণ ছাত্রদের জন্য একটি একটি মূল্যবান কথা বললেন। ‘আদর্শহীন রাজনীতি দেশ এবং দেশের মানুষকে কিছুই দিতে পারে না।’
সাল ১৯৭১। ৭ই মার্চ। স্থান এই উদ্যান। তখন নাম ছিলো রেসকোর্স ময়দান। এই ময়দানে দাঁড়িয়ে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি আদর্শের লড়াইয়ের জন্য, একটি জাতির মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য ডাক দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘মরতে যখন শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ না বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি। ঠিকঠাক বাঙালিকে ডাক দিতে পারলে তারা ঘর ছাড়বেই। বঙ্গবন্ধু এ জাতিকে ভালোবেসে, বুকে ধারণ করে ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র জয় করে এনেছে বাঙালি। তাহলে রাজনীতি আর রাজনৈতিক নেতার শক্তিটা কোথায়? অবশ্যই তার আদর্শে।
দুই.
বঙ্গবন্ধু বলছেন, মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও পারে।’ মানুষের এই ভালোবাসার প্রমাণ তিনি পেয়েছেন। যদি কেউ স্মরণ করে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানের সেই দৃশ্য। সেখানে জনতাই একজন মানুষকে মহানায়ক বানিয়ে দিলো। এ ভালোবাসার এক অমোঘ টান। এই ভালোবাসা বঙ্গবন্ধু অর্জন করেছিলেন মানুষের পথে হেঁটে হেঁটে। তিনি মানুষের জন্য, বাঙালির জন্য নিজেকে কীভাবে তৈরি করেছিলেন তার একটি জীবন্ত দলিল ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। আগামীতে যারা রাজনীতি করতে আসবেন, যারা দেশ চালাবেন, যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হবেন তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ওই গ্রন্থটি। কেন না, বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন; বলতেন ‘প্রধানমন্ত্রী হবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। প্রধানমন্ত্রী আসে এবং যায়। কিন্তু, যে ভালোবাসা ও সম্মান দেশবাসী আমাকে দিয়েছেন, তা আমি সারাজীবন মনে রাখবো।’

এদেশ, এদেশের মানুষ, মাটির প্রতি তার দরদ ছিল আকাশস্পর্শী। তিনি এটা বলতেন এবং গভীরভাবে অনুধাবন করতেন। ‘সাত কোটি বাঙালির ভালোবাসার কাঙাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না।’ এক্ষণে উদ্ধৃত করা যেতে পারে বঙ্গবন্ধুর আরো কিছু চিন্তা, উপলব্ধি।
ক. এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেট ভরে খেতে পাবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন; তখনই শুধু এই লাখো শহীদের আত্মা তৃপ্তি পাবে।
খ. দেশ থেকে সর্বপ্রকার অন্যায়, অবিচার ও শোষণ উচ্ছেদ করার জন্য দরকার হলে আমি আমার জীবন উৎসর্গ করব।
গ. আমি যদি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারি, আমি যদি দেখি বাংলার মানুষ দুঃখী, আর যদি দেখি বাংলার মানুষ পেট ভরে খায় নাই, তাহলে আমি শান্তিতে মরতে পারব না।
ঘ. এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে, তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।
ঙ. আমাদের চাষীরা হল সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণি এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্যে আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে।
চ. জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এই কথা মনে রাখতে হবে। আমি বা আপনারা সবাই মৃত্যুর পর সামান্য কয়েক গজ কাপড় ছাড়া সাথে আর কিছুই নিয়ে যাবো না। তবে কোনো আপনারা মানুষকে শোষণ করবেন, মানুষের উপর অত্যাচার করবেন?
ছ. দেশের সাধারণ মানুষ, যারা আজও দুঃখী, যারা আজও নিরন্তর সংগ্রাম করে বেঁচে আছে, তাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখকে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উপজীব্য করার জন্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।
জ. জনগণকে ছাড়া, জনগণকে সংঘবদ্ধ না করে, জনগণকে আন্দোলনমুখী না করে এবং পরিষ্কার আদর্শ সামনে না রেখে কোনোরকম গণআন্দোলন হতে পারে না।
ঝ. গণআন্দোলন ছাড়া, গণবিপ্লব ছাড়া বিপ্লব হয় না।
ঞ. আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনের জন্য আদর্শ থাকতে হয়। আন্দোলনের জন্য নিঃস্বার্থ কর্মী হতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার। আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার।
ট. অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোন দিন একসাথে হয়ে দেশের কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।
ঠ. আর সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না।
ড. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে।
ঢ. বাঙালি জাতীয়তাবাদ না থাকলে আমাদের স্বাধীনতার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।
এই হলেন বঙ্গবন্ধু। এই হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই হলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। এই হলেন বিশ্ব নেতা যিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। নিজের ভেতর দেখতে পেতেন একটি জাতির স্বপ্নকে। তিনি নিজে স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্ন জাতিকে দেখিয়েছেন। এবং সেই স্বপ্নের পথ ধরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করে দেখিয়েছেন। তার এই স্বপ্নে, সংগ্রামে মূল শক্তিটাই ছিল বাংলার জনগণ।

তিন.
আজ এখন এই বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা কি বঙ্গবন্ধুর জীবন আর আদর্শের রাজনীতির কথা বলবো বারবার; নাকি কর্পোরেট হাওয়ায় গা ভাসানো দুনিয়ায় রাজনীতি হবে আদর্শহীন? বাংলাদেশে এখন ‘ভাতের কষ্ট’ নেই, এটাতো ঠিক! উত্তর বঙ্গে যে ‘মঙ্গা’ ছিলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে তা তোর দূর হয়েছে! উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যাওয়ার সব শর্তও পূরণ করেছে বাংলাদেশ। শহরজুড়ে দালানের সারি কী জানান দেয় না দেশ অর্থনৈতিকভাবেও শক্ত হচ্ছে? আর এইতো একদিন আগে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট দিয়ে বাংলাদেশে যে আকাশযাত্রা শুরু করলো এতোসব কাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে? দেশ আর মানুষের জন্য রাজনীতি না হলে এতোসব হয়ে যেতো! তাহলে বিচার-বিশ্লেষণ করে বলা যেতে পারে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা পিতার পথ ধরে আদর্শের রাজনীতিই করছেন। তাই তিনি আগামীর নেতা, রাজনীতিবিদদের আদর্শের রাজনীতির কথাই বলছেন। কেনো না তিনি এটা খুব ভালো করে জানেন দেশ আর দেশের মানুষকে দিতে জানলে প্রতিদান আসবেই।
আর এই আদর্শ বিষয়টা দেশের অন্যরাজনীতিবিদ, আমলা, পুলিশ এবং আগামীর রাজনীতিরা যদি বুঝে নিতে পারেন ঠিকঠাক, বুকে ধারণ করতে পারেন দেশটাকে তাহলে বাঙালিকে, এই দেশকে কেউ ‘দাবায়ে’ রাখতে পারবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







