সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ৩৮ বছর বয়স্ক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি’র ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিল উদ্বোধন করেছেন বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া। প্রধান অতিথির বক্তব্যও রেখেছেন তিনি। ৩,১০০ কাউন্সিলর, ৮,০০০ ডেলিগেট এবং ১,০০০ অতিথি কাউন্সিলে যোগ দিয়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম।
কাউন্সিলে অতিথি হিসেবে অন্যান্যদের মধ্যে যোগ দিয়েছেন বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বি চৌধুরী) এবং কয়েকজন বিদেশী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন কাউন্সিলে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় নি। বিএনপি’র সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৯ সালে। প্রতি তিন বছর অন্তর কাউন্সিল অনুষ্ঠানের বিধান থাকলেও ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৬ষ্ঠ কাউন্সিল। এর আগে ১৯৮২, ১৯৮৯ এবং ১৯৯৩ সালে বিএনপি’র কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
দৈনিক সমকাল কাউন্সিল দিনের পত্রিকায় লিখেছে, “দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, নানা প্রতিকূলতার মুখে এবারও ঘুরে দাঁড়াবার সংকল্প ব্যক্ত হবে এই কাউন্সিলে। জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে বিএনপির এবারের স্লোগান ‘দুর্নীতি-দুঃশাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ’।” গত কয়েক দিনের জাতীয় দৈনিক এবং টেলিভিশনগুলো কাউন্সিল সম্পর্কে একই রকমের ধারণা দিয়েছে। বিএনপি নেতা-কর্মীরা এই কাউন্সিলকে উপলক্ষ করে রাজনীতির মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে চান; ২০১৩-১৫ সালের উপর্যুপরি ভুল রাজনীতির ইতি টানতে চান। এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া কার্যকর করতে নতুন নেতৃত্ব চান। টেলিভিশনে যে সকল মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বক্তব্য শোনা গিয়েছে তাঁরা সকলেই এরকম অভিমত প্রকাশ করেছেন।
কাউন্সিলে প্রধান অতিথির ভাষণে বেগম খালেদা জিয়া জনগণের হাতে দেশের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন; বিএনপি ক্ষমতায় গেলে নৈতিকতা এবং অবক্ষয় রোধ করার কথা বলেছেন; প্রশাসন এবং পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন; সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনে মেধা, দক্ষতা, ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে যোগ্যতা নিরূপণের কথা বলেছেন; সাংবিধানিক পদগুলোতে সংসদে গণশুনানীর মাধ্যমে নিয়োগের কথা বলেছেন; ন্যায়পাল নিয়োগের কথা বলেছেন; বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন। তিনি বিস্তারিত বর্ণনা না দিয়ে আওয়ামী লীগের অনুকরণে ভিশন ২০৩০ ঘোষণা দিয়েছেন; ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার কথা বলেছেন। কিন্তু কখন, কিভাবে তা অর্জন করা যাবে তা তিনি বলেননি। তিনি বলেছেন ভিশন ২০৩০ এখন খসড়া পর্যায়ে রয়েছে, আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের পর তা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হবে। অর্থাৎ তিনি আওয়ামী লীগের মুখাপেক্ষী হয়ে রয়েছেন। একটা দলের ভবিষ্যৎ কর্মসূচী প্রণয়ন যদি অন্য আরেকটি দলের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভরশীল হয় তবে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলা যায়, প্রতিক্রিয়াশীল কর্মসূচীর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা থাকে না।
বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র আধিপত্য কমিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নের কথা বলেছেন; জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কোন প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর আধিপত্য কমানো হবে বা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কার উপর, কতটুকু ন্যস্ত করা হবে তা তিনি ব্যাখ্যা করেনি। উচ্চকক্ষের উপকারিতা কি, উচ্চকক্ষ কিভাবে নিম্নকক্ষের সঙ্গে কাজ করবে, উচ্চকক্ষে কিভাবে সদস্য নিয়োগ হবে এসব বিষয়ে তিনি কোন আলোকপাত করেননি। তবে তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের, প্রান্তিক মানুষদের, মেধাবী মানুষদের এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলেছেন। এসব মানুষদের কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করা হবে তা তিনি বলেননি। তিনি যেহেতু সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কথা বলেছেন তাতে ধরে নেয়া যায় যে তিনি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে উচ্চকক্ষে সদস্য নিয়োগের ব্যবস্থার কথা বলেননি। তিনি সংসদ বা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির দ্বারা উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের কথা বলেছেন। তা যদি হয় তা হলে দেখা যাবে সংসদের উচ্চকক্ষে সুশীলদের সমাবেশ ঘটেছে। এক-এগারোর সময়ে সুশীলেরা মাইনাস-টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করে নিজেরা দল গঠন করে রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এবার উচ্চকক্ষ সৃষ্টি করে বেগম জিয়া তাদের ক্ষমতা ঘুষ দেয়ার বন্দোবস্ত করতে চাচ্ছেন। সুশীল সমাজ জামায়াত-বিএনপি সৃষ্ট অগ্নি-নৈরাজ্যের সময়ে যে পরিমাণ সমর্থন তাদের দিয়েছে তার পুরস্কার হিসেবে এবং আগামীতে রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি করা গেলে তখন সুশীল সমাজের কাছ থেকে সমর্থন লাভের আশায় বেগম জিয়া তাদের আগাম ঘুষের বন্দোবস্ত করে রাখছেন।
৬ষ্ঠ কাউন্সিলে নির্বাচন হয়নি স্থায়ী কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং উপদেষ্টা পরিষদের বিভিন্ন পদে নেতা নির্বাচনের জন্য। কয়েক দিন আগে প্রাক্তন স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরুদ্দিন সরকারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বানানো হয়। তিনি শুধু দলীয় প্রধান এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী এই দুই পদে যথাক্রমে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ছাড়া অন্য কেউ মনোনয়ন পত্র জমা না দিলে তাদের দুজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। জাতীয় নির্বাহী কমিটির বর্তমান ৩৮৬ সদস্যের মধ্যে মাত্র দুটি পদে নির্বাচন কেন? নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাহী কমিটি গঠন করা হলে সবকয়টি পদেই নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়া উচিত। বিএনপি’র সভাপতি এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলেও অন্য কেউ সে পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন না কেন? বিএনপি’র চেয়ারপার্সন এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি হওয়ার আগ্রহ বা যোগ্যতা কি আর কারো নেই? আসলে ঐ দুই পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার সাহস কারো নেই। সে কথা জেনে, বুঝে এবং নিশ্চিত করেই ঐ দুই পদে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আর যেসব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সাহসী মানুষ আছে সেসব পদে নির্বাচন করতে দেয়া হয়নি চেয়ারপার্সনের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখার স্বার্থে।
বিএনপি’র গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্থায়ী কমিটি, উপদেষ্টা পরিষদ এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতা নির্বাচনের ক্ষমতা চেয়ারপার্সনের উপর ন্যস্ত করা আছে। বিএনপি’র কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এরপরও একটা গণতান্ত্রিক ভাব আনার জন্য কাউন্সিলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে বিভিন্ন কমিটিতে নেতা নির্বাচনের ক্ষমতা চেয়ারপার্সনকে দেয়া হয়েছে। তাহলে এই নির্বাচন নির্বাচন খেলা কেন? উত্তর একটাই হতে পারে- এর মাধ্যমে একটা মিথ্যা গণতান্ত্রিক আবহ তৈরীর চেষ্টা করা হয়েছে। যে আবহের ফলে কিছু বিভ্রান্ত বিএনপি সমর্থককে আরও কিছুকাল বিভ্রান্ত করে রাখা যাবে; গণতন্ত্রের মিথ্যা বড়াই করা যাবে।
বিএনপিতে প্রতি ছয় মাসে নির্বাহী কমিটির সভা হওয়ার কথা থাকলেও গত ছয় বছরে মাত্র দুইবার এই সভা হয়েছে। স্ট্যান্ডিং কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম থাকলেও তা পালন করা হয়নি কখনো। এরকম পরিস্থিতিতে কাউন্সিলে ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে বেগম জিয়ার। সকল সহযোগী এবং অঙ্গ সংগঠনের কমিটি এখন থেকে তাঁর অনুমোদন ব্যতিত কার্যকর হবে না। একক সিদ্ধান্তে তিনি ভেঙ্গে দিতে পারবেন সকল রকমের কমিটি। কাউন্সিলে গৃহিত ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি তিনি ইচ্ছে করলে অগ্রাহ্য করতে পারবেন। কাউন্সিল বক্তৃতায় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “গণতন্ত্র মানে খালেদা জিয়া, খালেদা জিয়া মানে গণতন্ত্র”। উপরোক্ত আলোচনায় যথেষ্ট পরিষ্কার হয়েছে ‘খালেদাতন্ত্র’। এত এত গণতন্ত্র বিরোধী কার্যক্রমের মাধ্যমে সেনানিবাসে, সেনারক্তে গঠিত বিএনপি’র ‘গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য’ আন্দোলন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেল।
কাউন্সিলে গঠনতন্ত্রের অনেক সংশোধনী আনা হয়েছে। এসব সংশোধনীর উদ্দেশ্য দলকে অধিকতর গণতন্ত্রী এবং গতিশীল করা এবং সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব, কর্তব্য এবং ক্ষমতা বাড়ানো। সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে দলকে অধিকতর গণতন্ত্রী করার পরিবর্তে অধিকতর স্বৈরতন্ত্রী করা হয়েছে। গতিশীলতার বিষয়ে আলোচনা রয়েছে পরবর্তীতে। কাউন্সিলে সিনিয়র সহ-সভাপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি এখন দলীয় প্রধানের অনুপস্থিতিতে পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে এবং দ্বায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তারেক রহমানের ঘনিষ্টরা মনে করেন যে সিনিয়র সহ-সভাপতির ক্ষমতা বাড়ানো হলে তিনি দলের বিভিন্ন কর্মসূচীতে জড়িত হয়ে ভূমিকা রাখতে পারবেন, দলীয় নেতা-কর্মীরা তার সঙ্গে আরও বেশি যোগাযোগ করার সুযোগ পাবে। এই প্রক্রিয়ায় দলে তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে। বিএনপিতে তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা নিয়ে কারো কোন সংশয় কখনো চোখে পরেনি। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে তিনি তাঁর দলে জনপ্রিয়। তবে এই জনপ্রিয়তার ব্যাপারটাতে একটা ফাঁক আছে। হাওয়া ভবন থেকে শুরু করে, খাম্বা কোম্পানি, অবৈধ পথে দুর্নীতির টাকা মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ করে কয়েক হাজার কোটি টাকা খোয়ানো, যুদ্ধাপরাধী চক্রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা, ‘১৩ এবং ‘১৫ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা, অগ্নি-সন্ত্রাসে তাঁর ভূমিকা, ইত্যাদি সম্পর্কে জেনেশুনেই তারেক রহমানের ছায়া তলে অবস্থান নেন বিএনপি’র প্রায় সব নেতা-কর্মী; সামান্য ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছে। বিএনপিতে তাঁর জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ তাঁর ব্যক্তিত্ব বা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নয়। তাঁর জনপ্রিয়তার কারণ তাঁর অবস্থান।
সকলেই জানেন এবং বোঝেন যে বেগম জিয়ার অবর্তমানে তিনিই হবেন বিএনপি’র পরবর্তী কর্ণধার। এমতাবস্থায়, তাঁকে ভাল লাগুক আর না লাগুক তাঁর প্রতিকূলে কেউ অবস্থান নিতে চান না। বিএনপি’র ভেতরে তিনি গ্রহণযোগ্য হলেও বাইরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? ক্ষমতা বৃদ্ধির আগে এ বিষয়টি অবশ্যই বিএনপি’র নীতিনির্ধারকদের মাথায় রাখা দরকার ছিল। তা না করায় দূর্নীতিবাজ, জামায়াত-শিবির ও জঙ্গি ঘনিষ্ঠ হিসেবে আলোচিত তারেক রহমানের ক্ষমতা বৃদ্ধি বিএনপি’র বিলুপ্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে।
কাউন্সিলে বেগম জিয়া সন্ত্রাসী এবং জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, দেশের মাটিতে অপর কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা মেনে না নেওয়ার, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সৌহার্দ্য, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ দিয়েছেন। বিএনপি জন্ম থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এবং পাকিস্তানী ভাবধারার রাজনীতির সঙ্গে আষ্ঠেপিষ্ঠে জড়িয়ে আছে। ’৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকে এরা বাংলাদেশে ভারত বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে আসছে যা বর্তমানেও অত্যন্ত কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে সক্রিয় রয়েছে। বিএনপি নেতা-কর্মীদের বেশির ভাগের ব্যক্তিগত আচরণে ভারত বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ পায়। এদের এবং রাজনৈতিক সঙ্গী জামায়াতকে তুষ্ট করতে ২০১৩ সালে বেগম জিয়া সফররত ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে পুর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ বাতিল করেছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন জামায়াত-বিএনপি জোট সরকার বাংলাদেশকে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য অভয়ারণ্য করেছিলেন। তাদের সরবরাহ করার জন্য আমদানি করা ১০ ট্রাক অস্ত্র তখন ধরা পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। সে মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে জোট সরকারের মন্ত্রী এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীসহ জোটের কয়েকজন নেতাকে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে কোন ধারাবাহিকতা ছাড়া হঠাৎ করে ভারত তোষণ বিএনপির জন্য সমালোচনা ছাড়া আর কিছু আনতে পারবে না।
ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি, চরমপন্থা, এবং ধর্মীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের অঙ্গীকার করেছেন বিএনপি নেত্রী। তাঁর অধীনে যখন সরকার পরিচালিত হয়েছে তখন এদেশে দুর্নীতি ছিল তুঙ্গে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশ তখন দুর্নীতিতে হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়নের কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। তাঁর সরকারের শাসনামলে সংখ্যালঘু নির্যাতন, একই সময়ে দেশজুড়ে বোমা হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র আমদানি, বাংলা ভাইদের উত্থান, আওয়ামী লীগ নেতা আহসানউল্লা মাষ্টার এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যা, আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে বেগম জিয়ার মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের এবং তাঁর পুত্রের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে আদালতে, শাস্তি হয়েছে অনেকের, বিচারাধীন রয়েছে আরও অনেক মামলা। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধী রক্ষা করতে এবং ২০১৫ সালে সরকার পতন ঘটাতে দেশব্যাপী যে অগ্নি সন্ত্রাস চালানো হয় তাঁর সমস্ত দায় বর্তায় বিএনপি নেত্রীর উপরে। হেফাজতে ইসলামের মধ্যযুগীয় ৬ দফার প্রতি সমর্থন দিয়ে দেশকে তিনি ধর্মান্ধদের হাতে সোপর্দ করেছিলেন; দেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন ইরাক-আফগানিস্তান পরিস্থিতিতে। একদা প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে আমরা সবাই ভাল হয়ে গেছি, আর কোন দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদী সহ্য করব না- এরকম অঙ্গীকার অন্তঃসার শূন্য।
বেগম জিয়া তাঁর বক্তৃতায় বিদেশীদের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ দমনের কথা বলেছেন। তাঁর এই কথাটি আসলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাটের দাবীর প্রতিধ্বনি মাত্র। সন্ত্রাসীদের ও জঙ্গিদের হাতে ইতালিয়ান এবং জাপানী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বার্নিকাট সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে জঙ্গি দমনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সরকার তখন সে দাবীর প্রতি কর্ণপাত না করে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় এই দুই হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। রহস্য উদ্ঘাটনের পর জানা গেল ইতালিয়ান নাগরিক হত্যায় জড়িত রয়েছে বিএনপির লোকজন যাদের পেছনে রয়েছে সিনিয়র সহ-সভাপতির ঘণিষ্ঠ এক নেতা। জাপানি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে জেএমবি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ছলে, বলে, কৌশলে বাংলাদেশে তাদের সামরিক ঘাঁটি বানাতে চায় অনেকদিন থেকে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন নৌ-সেনাদের জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের চক্রান্ত প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল বলে লোকমুখে গল্প চালু আছে। মার্কিনিদের চাপের মুখে গ্যাস রফতানির চক্রান্ত প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা তখন হুঙ্কার দিয়ে না উঠলে দেশের গ্যাস এখন ব্যবহার করত ভিনদেশের লোকেরা। যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ দমনের কথা বলে বিএনপি নেত্রী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের খুশি করেছেন; ভবিষ্যতে তাদের কথামত দেশ চালানোর পথ খুলে রেখেছেন।
বেগম জিয়া তাঁর কাউন্সিল ভাষণে রাজনৈতিক সংঘাত এবং প্রতিশোধ পরায়ণ রাজনীতি দূর করে ধ্বনাত্বক, ক্রিয়েটিভ এবং সম্মুখ দর্শন রাজনীতির কথা বলেছেন। অন্যদিকে একই বক্তব্যে তিনি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নাম। তিনি শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে শেখ হাসিনাকে বাদ দেয়ার তিনি কে? তাঁর এই বক্তব্যে তাঁর স্বৈরতন্ত্রী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি হাসিনা পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, “অপরাধ করেছে ছেলে আর শাস্তি পেতে হলো গভর্নরকে”। কোন রকম তথ্য, উপাত্ত, প্রমাণ ছাড়া একজন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা মানহানির সামিল। বেগম জিয়ার মত একজন রাজনৈতিকের মুখে এরকম অহেতুক মন্তব্য মানায় না। এই বক্তব্যের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হতে পারে। বেগম জিয়ার দীর্ঘ বক্তব্য থেকে বস্তুত গঠনমূলক কিছুই পাওয়া যায়নি। বিএনপি কিভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, অধিকতর গণতান্ত্রিক হবে এবং দুর্নীতি-দুঃশাসন শেষ করবে তার কোন দিক-নির্দেশনা বা কর্মসূচী ৬ষ্ঠ কাউন্সিলে পাওয়া যায়নি। তৃণমূল থেকে আসা নেতা-কর্মীরা আগামী দিনের রাজনীতির জন্য সুনির্দিষ্ট কোন দিক-নির্দেশনা নিয়ে যেতে পারেনি। কাউন্সিলের পর সাত দিন পার হয়ে গেলেও কোন কমিটি ঘোষণা হয়নি। এমনকি মহাসচিবের নাম পর্যন্ত ঘোষণা করতে পারেনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। কাউন্সিলের সাত দিন পর আজ বলা যায়, বিএনপি’র ৬ষ্ঠ কাউন্সিলের কোন প্রভাব এখন আর রাজনৈতিক অঙ্গনে নেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







