সময়ের চেয়ে এগিয়ে তিনি। দেখেছেন দূরতম আগামীর স্বপ্ন। আবার সময়ের দাবি মেটাতে ক্রিকেট ব্যাট-প্যাড ছেড়ে দেশের ডাকে হাতে তুলে নিয়েছিলেন স্টেনগান-গ্রেনেড। নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেশের জন্য লাল-সবুজ পতাকা আর স্বাধীনতা এনে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের হয়ে ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখা ক্রিকেটার আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল একাত্তরে দেশের ডাকে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।
মেজর খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন হায়দারের গড়া দুই নম্বর সেক্টরের দুর্ধর্ষ ‘ক্র্যাক প্লাটুনের’ হয়ে তৎকালীন অবরুদ্ধ রাজধানী ঢাকায় হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চালিয়েছেন একের পর গেরিলা অপারেশন। ফার্মগেট, ধানমণ্ডি কিংবা সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে দুঃসাহসী সেই অপারেশনগুলোতে পাকিস্তানীদের বিপর্যয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দুনিয়ায়, অত্যাসন্ন বিজয়ের স্বপ্নে উদ্দীপ্ত হয় অবরুদ্ধ বাঙ্গালি জাতি।
শেষ পর্যন্ত তাদের সেই সাফল্যের পথ ধরেই নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে আসে চূড়ান্ত বিজয়। তবে তার আগে সুরকার আলতাফ মাহমুদ এবং আজাদ, বদি, রুমিসহ ‘ক্র্যাক প্লাটুনের’ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ১৯৭১’র ২৯ আগস্ট রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন ক্রিকেটার আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েল।
সেদিন কোনো এক বাঙ্গালির বিশ্বাসঘাতকতায় গভীর রাতে মগবাজার রেলক্রসিং সংলগ্ন আজাদের বাসা থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল অন্যদের সঙ্গে ধরে নিয়ে যায় জুয়েলকে।
একাত্তরের আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ধ্বংসের অপারেশনে অংশ নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে হাতের আঙ্গুলে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন জুয়েল। হাতে ব্যান্ডেজ বাধা আহত জুয়েলকে আটক করে পাকিস্তানিরা। এরপর তৎকালীন তেজগাঁও’র এমপি হোস্টেলের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্য়ালয়) অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েও জুয়েল, আজাদ, বদি কিংবা আলতাফ মাহমুদদের কাছ থেকে পাকিস্তানিরা পায়নি ক্র্যাক প্লাটুনের অন্য যোদ্ধাদের খবর। সেই ক্যাম্প থেকেই চিরদিনের মতো হারিয়ে যান তারা।
ধারণা করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কথিত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে কোনো এক সময়ে তড়িঘড়ি করে হত্যা করা হয় তাদের।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দলে শহীদ জুয়েলের টিমমেট, বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসানের স্মৃতিতে আজো অমলিন এই মৃত্যুঞ্জয়ী মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি।
‘যোগ্যতা থাকলেও বাঙ্গালিদের জন্য পাকিস্তান দলের দরজা ছিলো বরাবরই বন্ধ। তারপরও জুয়েল স্বপ্ন দেখতো টেস্ট খেলার। বলতো পাকিস্তান না হোক, বাংলাদেশ দলের হয়ে টেস্ট খেলবো। বাংলাদেশ আজ যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দূর্দান্ত খেলছে তখন খুব বেশি মনে পড়ে জুয়েলকে। সে কি জানছে তার রক্তে গড়া বাংলাদেশের ক্রিকেট দল একের পর এক বড় দলকে হারিয়ে নিজেরাই সমীহ জাগানো দলে পরিণত হচ্ছে!’ বলতে বলতে জুয়েলের জন্য অশ্রুসিক্ত হন রকিবুল হাসান।
ঢাকার হাটখোলার অভয় দাস লেনের আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরীর তিন ছেলে ও চার মেয়ের সংসারে প্রথম ছেলে ও দ্বিতীয় সন্তান জুয়েলের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক ছিলো না। নওয়াবপুর হাই স্কুল ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে গ্রাজুয়েশনের পর ক্রিকেটের পাশাপাশি স্বপ্ন দেখতেন জার্মানি থেকে গ্লাস টেকনোলজির উপর উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে আজাদ বয়েজ ও মোহামেডানের হয়ে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন এই হার্ডহিটিং ওপেনার। বন্ধু রকিবুলসহ যারা তার ব্যাটিং দেখেছেন তাদের অভিন্ন মন্তব্য: সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন জুয়েল। ওপেন করতে নেমে তার আক্রমণাত্মক ব্যাটিং স্টাইল সেসময়ে ছিলো অভাবিত। ওপেনার হিসাবে সেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এখন ক্রিকেট দুনিয়ায় বহুল ব্যবহৃত হলেও তখন কেউ এরকম খেলার সাহস পাননি।
তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে ‘কায়েদে আজম ট্রফি’র প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলে তার যোগ্যাতা প্রমাণের মাঝেই শুরু হলো বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধ। রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও সময়ের দাবি মেটাতে ভুল করেননি জুয়েল। ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতে বাসার সামনে হাটখোলা রোডে মুক্তিকামী জনতার সঙ্গে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছেন। ক্র্যাক ডাউনের পর মে মাসে ট্রেনিং নেয়ার জন্য ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘরে দুই নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গড়া হয় দুর্ধর্ষ ক্র্যাক-প্লাটুন। ঢাকার ছেলে জুয়েলকে মায়া, শাহাদাত, আলম, বদি, রুমি, গাজীদের সঙ্গে রিক্রুট করা হয় সেই আরবান গেরিলা ইউনিটে।
এরপরের কাহিনী দেশের ডাকে সাড়া দেয়া এক ক্রিকেটারের অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত হওয়ার। রূপকথা নয়, স্বাধীনতার বেদীমূলে বুকের রক্ত দিয়ে দেশকে শৃংখলমুক্ত করার বীরত্বের কাহিনী। ১৯৭৩ সালে ক্র্যাক-প্লাটুনের অন্য যোদ্ধাদের সঙ্গে শহীদ জুয়েলকে বাংলাদেশ সরকার ভূষিত করে মরণোত্তর ‘বীর-বিক্রম’ খেতাবে। মিরপুরের শেরে-বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যলারির একাংশের নামকরণ করা হয়েছে‘শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ড’। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে তার স্মরণে শহীদ জুয়েল বনাম শহীদ মুশতাক একাদশের প্রদর্শনী ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করে।
শহীদ জুয়েলের পাশপাশি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এদেশের ক্রিকেট হারিয়েছে নিবেদিতপ্রাণ এক সংগঠক ‘শহীদ মুশতাক’কে। ১৯৪৭ এ ভারত বিভক্তির পর পূর্ব পাকিস্তানে আসা মুশতাক দ্রুতই আপন করে নেন এদেশ আর এদেশের মানুষকে। তার অক্লান্ত সাংগঠনিক দক্ষতায় ঢাকার ক্রিকেট আসরে শক্তিশালী দলে পরিণত হয় আজাদ বয়েজ ক্লাব। রকিবুল হাসান, শহীদ জুয়েল, সৈয়দ আশরাফুল হক, তান্না, ইউসুফ বাবুর মতো তরুণ প্রতিভার বিকাশ হয় মুশতাকের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে।
চিরকুমার এই ক্রিকেট সংগঠকের স্থায়ী আবাস ছিলো তৎকালীন পল্টন ময়দান সংলগ্ন গুলিস্তান সিনেমা হলের বিপরীতে আজাদ বয়েজ ক্লাব ভবনে। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে সেই ক্লাব সংলগ্ন ঢাকা জেলা ক্রীড়া সমিতি মিলনায়তনে পাকিস্তানীরা হত্যা করে মুশতাককে।
২৭ মার্চ সকালে কয়েক ঘন্টার জন্য কারফিউ প্রত্যাহার হলে শহীদ মুশতাকের লাশ দেখতে সেখানে গিয়েছিলেন রকিবুল হাসান। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তার পক্ষে সম্ভব হয়নি ক্রিকেট গুরুর লাশ দাফনের।
‘সেই ভয়াল পরিবেশে ইচ্ছা থাকলেও কিছু করতে পারিনি। এজন্য আফসোস থাকবে সারাজীবন,’ উল্লেখ করে রকিবুল হাসান বলেন: তার মতো নিঃস্বার্থ একজন সংগঠক ছিলেন বলেই স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় দলে যোগ্যতা দেখিয়ে সুযোগ পেয়েছিলো তার হাতে গড়া বেশ ক’জন ক্রিকেটার।
তবে সবার আগে নাম আসতো যার, সেই জুয়েল যে মুশতাক হত্যার প্রতিশোধের সঙ্গে দেশ স্বাধীন করার স্বপ্নে উৎসর্গ করেছেন নিজের জীবন।
ছবির ক্যাপশন:
১. ঢাকা স্টেডিয়ামে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেটার ব্যাসিল ডি অভিভিয়েরার সঙ্গে শহীদ জুয়েল (বাঁ-দিকে প্রথম) ও রকিবুল হাসান (সর্বডানে)
২. ১৯৭১’র জানুয়ারিতে ঢাকা স্টেডিয়ামে পূর্ব পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের গ্রুপ ছবিতে শহীদ জুয়েল (বসা বাঁ থেকে দ্বিতীয়)। ছবিতে আরো আছেন রকিবুল হাসান, সৈয়দ আশরাফুল হক, তানভীর হায়দার তান্না; যারা স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ দলে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।






