দুবাই স্পোর্টস সিটিতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সদর দপ্তর। বিষয়টা এখানে এসে নয়, আগে থেকেই জানতাম। যারা ক্রিকেটের মোটামুটি খোঁজ-খবর রাখেন তাদের প্রত্যেকেরই এটি জানা।
অফিস থেকে এবারের এশিয়া কাপ কাভারের সুযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই মাথায় ঢুকে পড়েছিল আইসিসির অফিস ঘুরে যাওয়ার স্বপ্নটা। কিন্তু শুধু কি পরিকল্পনা থাকলেই হয়? ব্যাটে-বলেও হওয়া চাই।
আসার পর থেকেই চেষ্টা চলছিল। অবশ্য শুধু আমি একা না, বাংলাদেশ থেকে আসা অন্যান্য টেলিভিশনের স্পোর্টস রিপোর্টাররাও যে যার মতো চাচ্ছিলেন আইসিসির অফিসে ঢু মারতে। ঢু মারা মানে একটা রিপোর্ট করার ধান্দা সবারই আছে।
কিন্তু আইসিসি তো অনেক ব্যস্ত। পুরো দুনিয়ার ক্রিকেট নিয়ে তাদের কাজ। কোনোভাবেই একা কোনো টেলিভিশন চ্যানেলকে এ সুযোগ দেবে না তারা। তাই জানিয়ে দিয়েছিল ওরাই নাকি আয়োজন করে আমাদের জানাবে।
চলতি এশিয়া কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে সোমবার খেলা ছিল না। মঙ্গলবারও বাংলাদেশের ম্যাচ নেই। ব্যাটে বলে হয়ে গেল। সে সুযোগটা নিল আইসিসি। বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থার অফিসটা ঘুরে দেখার সুযোগ মিলল। ওরা আমাদের সময় বেধে দিয়েছিল। সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা। সঙ্গে বোনাস হিসেবে থাকবে আইসিসির সিইও ডেভিড রিচার্ডসন’র সংবাদ সম্মেলন এবং ভরপুর লাঞ্চের ব্যবস্থা।
যদিও সকালে ঘুম থেকে উঠতে খুব কষ্ট হয়েছে। আগের রাতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। আবুধাবি স্টেডিয়াম থেকে সে রিপোর্ট এবং পোস্ট ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হওয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের কনফারেন্স কাভার করে অফিসে পাঠিয়ে দুবাইয়ে ফিরতে ফিরতে রাত আড়াইটা। ঘুমাতে গিয়েছি ৩টার দিকে। এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম সকাল ৮টায়। কারণ হোটেল থেকে আইসিসির সদর দপ্তরে পৌঁছাতে সময় লাগে এক ঘণ্টারও বেশি।
ট্যাক্সি পেয়েই ক্যামেরা, ট্রাইপড, মাইক্রোফোন ইত্যাদি নিয়ে দৌড়। কড়া রোদ আর জ্যাম ঠেলে শেষ পর্যন্ত ২০ মিনিট দেরিতে পৌঁছলাম আইসিসির সদর দপ্তরে। অভ্যর্থনা এরিয়া থেকে কিছুটা এগিয়ে এসে আইসিসির হেড অফ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন সামিউল হাসান আমাদের রিসিভ করলেন।
চোখে চোখ পড়তেই সম্ভবত কিছু একটা মনে করতে পারলেন সামি। তার মনে আছে কি না জানি না। তবে আমার স্পষ্ট মনে পড়ল। ২০১৬ সালে এই সামির সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা। আপাদমস্তক স্মার্ট এই ভদ্রলোকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়টা হয়েছিল ভারতে। ২০১৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে। কলকাতায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে।
বিশ্বকাপে আইসিসির কড়া নিয়ম-কানুন না জেনেই আমরা তিন-চারজন বাংলাদেশি টিভি রিপোর্টার ম্যাচ ভেন্যুতে ক্যামেরার কাজ করেছিলাম। গোয়েন্দা নজরদারিতে সামি সে খবর পেয়ে গিয়েছিলেন। খবর পাওয়ার পর আমাদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড আটকে দিয়েছিল সামিউল হাসানের টিম। তার কড়া নির্দেশ ছিল আমাদের কার্ড সিজ করে দেয়ার।
অবশ্য সে মহাবিপদের সময় এক সাংবাদিক বড় ভাই এগিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশি হলেও তিনি সামির খুব ঘনিষ্ট বন্ধু। অনেক চাপাচাপির পর অবশ্য কার্ড ফেরত পেয়েছিলাম আমরা সবাই এবং এটি মনে আছে, সেদিন পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন এই সামিও।
প্রায় দু-বছর পর দেখা তার সাথে। সিইওর মিটিংয়ে আমাদের জয়েন করিয়ে দিলেন সামি। এরপর আইসিসির সদর দপ্তরের সবকিছু ঘুরে দেখার সুযোগ হল। ছবি তোলার অনুমতি মিলল। দেয়ালে ঝুলে আছে এ যাবতকালে যারা আইসিসির সভাপতি হয়েছিলেন তাদের পোট্রেট। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না বাংলাদেশের প্রতিনিধি আ হ ম মোস্তফা কামালের ছবি। তিনিও তো আইসিসির সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেছেন বছর খানেক। ২০১৫ সালে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন বলেই মনে হয় তাকে সম্মান দেখায়নি আইসিসি। অথবা অন্য কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে তাদের। জটিল এই বিষয়টি নিয়ে আর ঘাটাঘাটি করতে ইচ্ছা হল না। মূল কাজটা করতে পারলেই হয়।
আস্তে আস্তে সবই দেখা হল, ছবি তোলা হল। কিন্তু কিছু কিছু এরিয়া খুব সেনসেটিভ। সেখানে ক্যামেরা চালানো একেবারেই বারণ। ভুলেও ক্যামেরা অন করিনি। অতীত শিক্ষা। কারণ এখানেও সামিউল হাসান আছেন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এশিয়ান সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ক্রিকেটের বিভিন্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী ডেভিড রিচার্ডসন। প্রায় ২০ মিনিটের প্রেস কনফারেন্সে ক্রিকেটের বিশ্বায়ন, টেস্ট ক্রিকেটের মার্কেটিং, উইমেন্স ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট এবং টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট নিয়ে আগামীদিনের পরিকল্পনা শুনিয়েছেন আইসিসি সিইও।
সবশেষে ক্ষুধার্ত সবাই ঝাপিয়ে পড়ল লাঞ্চ এক্সটেনশনে। সাদা ভাত, চিকেন কড়াই, ফিস বেকনের কামড়ে কামড়ে আরও কিছুক্ষণ চলল ক্রিকেট সাংবাদিকদের জমজমাট আড্ডা। কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে রওনা দিতে হল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের হোটেলে।








