আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তরাংশের বারমুডা ট্র্যায়াঙ্গেলের মতোই রহস্যে ঘেরা বিশ্বকাপ ফুটবলে ম্যারডোনা-মেসির আর্জেন্টিনার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ। প্রথম আসরের ফাইনালিস্ট,দুইবারের চ্যাম্পিয়ন,তিনবারের রানার্সআপ,মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট কোপা আমেরিকায় দ্বিতীয় সর্বাধিক ১৩বারের শিরোপা জয়ী আর্জেন্টিনা। সামর্থ্য,মাঠের পারফরম্যান্সের গাণিতিক অনুবাদ কোথায় তাদের সাফল্যের ইতিহাসে?
১৯৮৬’র মেক্সিকো আসরের পর পেরিয়ে গেছে ৩২ বছর, একের পর এক হাতছাড়া হয়েছে বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ। স্যার আলফ্রেডো ডি স্টিফানো,ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতোই ইতিহাসের কালজয়ী ফুটবলার লিওনেল মেসি। পাঁচবার দুনিয়া সেরা ফুটবলারের শিরোপা জিতেছেন,বার্সেলোনাকে জিতিয়েছেন বিশ্বসেরা ক্লাবের খেতাব, এমনকি ২০১৪’র বিশ্বকাপ আসরে ‘গোল্ডেন-বল’ জিতে হয়েছেন বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার।
কিন্তু আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব বাঁ-পায়ের জাদুকরের কাছে এখনো সোনার হরিণ! ১৯৯৩’র পর নিজ মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা কোপা আমেরিকা জিততে পারেনি ‘লা-আলবিসেলেস্তে’। ২০১৪’র বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬’র কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনালে উঠেও চোখের জলে ভাসতে হয়েছে মেসি, অ্যাগুয়েরো, হিগুয়েন,মাশ্চেরানোদের।
বিশ্ব ফুটবলের ‘একটা সোনালী প্রজন্ম’ যোগ্যতা দেখিয়েও বীরত্বের লড়াইয়ে শেষ পর্বে পিছিয়ে পড়ছে, বিশ্ব ফুটবলের এর চেয়ে রহস্যময় আর ট্র্যাজিক ঘটনা কি হতে পারে! গত দুই দশকে আর্জেন্টিনার বারংবার এই না পাওয়া.. বেদনার রঙ’কে নীল থেকে আকাশী নীলে পরিণত করছে।

এবারের বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব নিয়ে তো আর্জেন্টিনার বিখ্যাত নদী পারানার জল কম ঘোলা হয়নি! শেষ ম্যাচে মেসির হ্যাটট্রিকে ইকুয়েডরকে ৩-১ হারাতে না পারলে আর্জেন্টিনার তো রাশিয়ার টিকিটই জুটতো না। টাটা মার্টিনো,বাউজা হয়ে শেষ পর্যন্ত মান বেঁচেছে জর্জ সাম্পাওলি’র কোচিংয়ে।
৫৮ বছর বয়সী সাম্পাওলি’র কোচিং ক্যারিয়ারে বৈচিত্র্য যেমন আছে, তেমন সাফল্যও ভুরিভুরি। লাতিন আমেরিকার দেশ পেরু থেকে কোচ হিসাবে আর্জেন্টাইন সাম্পাওলি’র উত্থান। ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত কোচ হিসাবে চিলি’কে সাম্পওলি ২০১৪’র ব্রাজিল বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলিয়েছেন। ২০১৫ সালে তার কোচিংয়ে কোপা আমেরিকা জিতেছে চিলি, ফিফা বর্ষসেরা কোচের তিনজনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলো তার নাম।
২০১৬’র শুরুতে স্প্যানিশ লা লিগায় সেভিয়ার দায়িত্ব নিয়ে ক্লাবকে চতুর্থ স্থান পাইয়ে দেন সাম্পাওলি। ২০১৭’র মে মাসে দায়িত্ব নেয়ার পর তার কোচিংয়ে আর্জেন্টিনা ১১ ম্যাচের পাঁচটিতে জিতেছে,তিনটিতে ড্র করেছে,হেরেছে তিনটিতে। আর্জেন্টিনার বিশ্বখ্যাত কোচ মার্সেলো বিয়েলসা’র ‘হাই প্রেসিং ফুটবল’ দর্শনের অনুসারী সাম্পাওলি। ২০১৪’র বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ আলেসান্দ্রো সাবেয়ার ফুটবল দর্শনের খোলনলচে পাল্টে দেয়ার আগ্রহ তার নেই।
বিশ্বকাপের মূল আসরে ‘লা-আলবিসেলেস্তে’কে’ ৪-৩-৩ অথবা ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে দেখা যেতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করছে প্রতিপক্ষ কে তার উপর। তবে সাম্পাওলি পরিষ্কার জানিয়েছেন মেসি’কে নিউক্লিয়াস করেই সাজানো হবে আর্জেন্টিনা দল,‘এটা হবে মেসি’র দল। বিশ্বকাপে মেসি গুলিভর্তি রিভলবারের নল মাথায় ঠেকিয়ে খেলবেন। ট্রিগার টেপার এখতিয়ার কেবলই তার। যদি তার টেপা ট্রিগার বিশ্বকাপের লক্ষ্যভেদ করতে পারে তাহলে ইতিহাসের নায়ক । ব্যর্থ হলে তার পরিণতি মৃত্যু’।

রূপক অর্থে বলা সাম্পাওলি’র এই মন্তব্যই যেন বলে দিচ্ছে সবকিছু। শুধু মেসি নন, আটজন ফুটবলারকে নিয়ে আর্জেন্টাইন কোচের আছে একটি কোর গ্রুপ: মেসি,রোমেরো,ডি-মারিয়া,মাশ্চেরানো,অ্যাগুয়েরো,হিগুয়েন,বিগলিয়া এবং ওটামেন্ডি। এই পছন্দ-অপছন্দ জটিলতা বাড়াতে পারে মূল দল ঘোষণার সময়।
যতটুকু খবর,হাঁটুর ইনজুরিতে অনিশ্চিত অ্যাগুয়েরো’র রাশিয়া বিশ্বকাপ,বিগলিয়াকে নিয়েও আছে শঙ্কা। হিগুয়েন, ডি-মারিয়ার পারফরম্যান্সও আশাপ্রদ নয়। তবে প্রতিভাবান,পরীক্ষিত পারফরমারের অভাব নেই আর্জেন্টিনা দলে। গ্যারাই, জাবালেত্তা, ওটামেন্ডি, বানেগা, রোহো, ফার্নান্ডো গ্যাগো, লামেলা,পাস্তোরে,ইকার্ডি,দিবালা,অ্যাঞ্জেল কোরেরা প্রতিভাবান ফুটবলারের মেলা বসেছে ম্যারাডোনার দেশে।
একই পজিশনে একাধিক তারকা। কঠিন হয়ে যেতে পারে অ্যাটাকিং ট্র্যায়ো সাজানো। ‘ফলস-নাইন’র ভূমিকায় ‘অ্যাটাকিং থার্ড’ হিসাবে প্রতিপক্ষের সীমানায় বিচরণ হবে মেসি’র। সেক্ষেত্রে দুই উইং’কে অ্যাগুয়েরো ও হিগুয়েন’কে খেলানোর ইচ্ছার কথা ইঙ্গিতে শুনিয়েছিলেন সাম্পাওলি। কিন্ত অ্যাগুয়েরো’র ইনজুরি আর হিগুয়েনের পড়তি ফর্ম ভেস্তে দিতে পারে সাম্পাওলি’র রণকৌশল। এই দু’জন বাদ পড়লে প্রথম পছন্দ হবে দিবালা। মেসি’র পজিশনে খেলে অভ্যস্ত দিবালা নতুন পজিশনে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে কতটা খাপ খাওয়াতে পারেন সেটাও দেখবার। তারপর সিরি’আয় দুরন্ত ফর্মে থাকা ইকার্ডি ও অভিজ্ঞ ডি-মারিয়া’কে মাঠে নামানোর অপশনও খুঁজতে হবে সাম্পাওলি’কে।

এ তো গেলো আক্রমণভাগের কথা। একই অম্ল-মধুর সমস্যা রক্ষণভাগ,মধ্যমাঠ এমনকি গোল কিপিং পজিশনেও। এই হ্যাপা সামলে মাত্র দু মাস সময়ের মধ্যে সবাইকে খুশি করে সেরা একাদশ বাছাই করা সাম্পাওলি’র জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। আরো একটা চ্যালেঞ্জ আর্জেন্টিনা দলকে ঘিরে,যতটা না দলীয় তার চেয়ে অনেক বেশি মেসি-কেন্দ্রীক। ইউরোপের ক্লাব মৌসুমে ব্যস্ত বছরটি কাটিয়ে বিশ্বকাপের আসরে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় রাশিয়ায় পা রাখবেন মেসি।
বার্সেলোনার হয়ে গেল মৌসুমে স্পেনের ঘরোয়া এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মিলিয়ে প্রায় অর্ধ-শতাধিক ম্যাচ খেলেছেন মেসি। বার্সা কোচ ভালভার্ডে গুরুত্বপূর্ণ, কম গুরুত্বপূর্ণ, প্রায়ই সব ম্যাচই খেলিয়েছেন তাকে। লা লিগার সেল্টা ভিগো বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রোমার বিপক্ষে ম্যাচ,তাকে ছাড়া একাদশ সাজায়নি বার্সেলোনা। জিদানের রিয়াল মাদ্রিদের রোটেশন পলিসি’তে রোনালদো,ক্রুস,মড্রিচ বা মার্সেলোরা যতটা বিশ্রাম পেয়েছেন তার অর্ধেকও বিশ্রাম পাননি মেসি।
ফ্রেব্রুয়ারি’র ইনজুরি ও অস্ত্রোপচার নেইমারকে দু’একমাসের জন্য হলেও মাঠের বাইরে বিশ্রামে রেখেছে,কিন্তু মেসি’র রেহাই মেলেনি। পুরো মৌসুমের পেশাদার ক্লাব ফুটবলের ধকল সামলে বিশ্বকাপে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শারিরিক ও মানসিকভাবে কতটা সুস্থ থেকে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন মেসি,সেটাই কোটি টাকার প্রশ্ন। ৩১ বছর বয়সী মেসি’র জন্য এবারের বিশ্বকাপ ‘নাউ অর নেভার।’








