চারদিকে আয়না বসানো ঘরে একই দৃশ্য অগণিত দেখা যায়। সেটি অসীম হয়ে যায়। ফকির লালন সাঁই কি এই আরশীনগরের কথাই বলেছিলেন? এখন সময়টি আরশীনগরের। দৃশ্যপটের গভীরে দৃশ্যপট। তারও গভীরে দৃশ্য। সেটির দৃশ্যও স্বচ্ছ। তার গভীর থেকেও কিছু তুলে আনা যায়। কোনোকিছুর আর আব্রু থাকছে না। সবকিছু বেআব্রু করার প্রতিযোগিতা চলছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বিবিসি রেডিওর বাংলা বিভাগের প্রচারিত একটি প্রতিবেদন শুনে ভালো লাগলো। মানবিক একটি প্রতিবেদন। বিষয়টি এমন, এখন একটি দুর্ঘটনার পর শোকাচ্ছন্ন পরিজনের মাঝে গণমাধ্যমের ঝাঁপিয়ে পড়াটা এমনই লাগামহীন যে, ওই পরিবারটি স্বাভাবিক শোক উপলব্ধির চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্নের মুখে অস্থির হয়ে পড়েন। একের পর এক জিজ্ঞাসার জবাব দিতে দিতে তারা শুধু হতবিহ্বল হয়ে পড়েন না, রীতিমত মুষড়ে পড়েন। তারা মানসিক ও শারীরিক এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন যে তা মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।
বিবিসির ওই প্রতিবেদনটি করা হয়েছে, নেপালে দুর্ঘটনায় নিহত পাইলট আবিদের স্ত্রী আফসানার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর পর। বড় কোনো অঘটন বা দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের গণমাধ্যম মোকাবিলার মতো মানসিক প্রস্তুতি ও সামর্থ থাকে না। অথচ তাদের মুখের কথা, তাদের আহাজারি, তাদের মুষড়ে পড়া দৃশ্যই গণমাধ্যমের মোক্ষম খোরাক হয়ে ওঠে। সেটিই সাংবাদিকের সফল উৎপাদন। বিশ্বব্যাপিই এই অনুশীলন দিনে দিনে আরো সেজে গুজে সুপ্রিতিষ্ঠিত হচ্ছে। আরো কতটা গভীরে পৌঁছে যাওয়া যায় তার প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু যাওয়ার উপায়, সাংবাদিকের মানবিক বোধ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো কোনো দক্ষতা ও শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। হয়তো আছে, কিন্তু সংবাদ সংগ্রহের তাড়াহুড়োর মধ্যে তা প্রয়োগের উপায় নেই।
নেপালে দুর্ঘটনায় রফিক জামান, সানজিদা হক এবং তাদের শিশুপুত্র অনিরুদ্ধ নিহত হওয়ার ঘটনার পর গণমাধ্যম ওই স্বজনহারা পরিবারের লোকজনদেরকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছে। অবান্তর সব প্রশ্ন। যেগুলো ক্যামেরাতেই লাগবে। শিশুটি দেখতে কেমন ছিল? সে কী কী বলতো, কী কী করতো- এসব। এর কী জবাব দেবে পরিবারটি? তখন ও পরিবারের একজন এক সাংবাদিককে বলতে বাধ্য হয়েছেন। ‘ভাই আপনি তো আগে একজন মানুষ, তারপরে সাংবাদিক। একটু মানবিকভাবে দেখুন। এমন বিপর্যস্ত সময়ে স্বাভাবিকভাবে কোনো কথা বলা যায় না।’ আসলেই তাই। এসব প্রশ্নে শোক অনেক বেশি উষ্কে ওঠে। শোকাহত মানুষের হৃদয়ে অনেক বেশি আঘাত লাগে। কিন্তু গণমাধ্যম সবসময় যায় এক্সক্লুসিভ শোক, এক্সক্লুসিভ কান্না, এক্সক্লুসিভ বিপর্যয়ের তথ্য। মানুষ যত বেশি বিপর্যস্ত হতবিহ্বল তা গণমাধ্যমের জন্য বেশি আকর্ষক।
আমি দেখছি, দেশে-বিদেশের অনলাইন গণমাধ্যমগুলো বেশি পাঠক ও অনলাইনে তথ্য অনুসন্ধানীদের জন্য স্বজনহারা মানুষের আহাজারির ভিডিও বেশ উৎসাহের সঙ্গেই সামনে এনে রাখেন। একজন বিপর্যস্ত মানুষ, একটি বিপন্ন পরিবার, করুণ পরিস্থিতি সবই অনলাইনের ভিডিওতে থেকে যায়। বোঝাই যায়, মানুষটির কষ্টানুভূতিকে আজকের টেলিভিশন ক্যামেরা দারুণ এক খাদ্য হিসেবে সংগ্রহ করেছে। সাংবাদিকতার জায়গা থেকে যে কেউই বলবেন, এর বাইরে কীইবা করার আছে। মুহূর্তটি ধারণ না করা মানে একটা বড় কিছু হারানো। যে হারায় সে তো পিছিয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এর শেষ কোথায় বা সমাধানই বা কি? গণমাধ্যমেরই তো যুগ। একটি ঘটনার পর আইন শৃংখলা রক্ষাকারীদের সঙ্গে গণমাধ্যমই থাকে সবচেয়ে তৎপর। তারা ব্রেকিং দিতে চায় প্রতি মুহূর্তে। সেখানে কোন বিষয়টি মানবিকতাকে ছাড়িয়ে গেল তা দেখার সুযোগ কোথায়? দর্শক তো তার প্রোডাক্টটিরই অপেক্ষা করছে। সাংবাদিক কত গভীরে যেতে পারলো, কী বিশেষ কথা, বিশেষ কান্না তুলে আনতে পারলো সেটিই তো বিশেষভাবে দেখার বিষয়। এই প্রবণতাই তো সময় আমাদেরকে উপহার দিচ্ছে।
অথচ সত্য সবসময় সুন্দর ও শুশ্রুষার কথা বলে। সত্যই মানবতা। এর মধ্যেই রয়েছে শান্তি। কিন্তু সাংবাদিকের পক্ষে এই শান্তি বিনষ্টকারীর ভূমিকা রাখা অনভিপ্রেত। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষকদের যেমন ভাবা প্রয়োজন, একইভাবে ভাবা প্রয়োজন সরকারি নীতি নির্ধারকদেরও।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







