বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি’র জাতীয় কমিটিগুলো ঘোষণা হয়েছে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে। ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলের সারে চার মাস পর প্রায় পূর্নাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হল কয়েক ধাপে। কাউন্সিলে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে পূর্নাঙ্গ কমিটি তৈরি করার দায়িত্ব দেন কাউন্সিলরগন। কাউন্সিলের আগে শুধু চেয়ারপার্সন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন করে দলের নেতা কর্মীদের কাছে মনোনয়ন পত্র চাওয়া হয়। কেউ মনোনয়ন পত্র জমা না দিলে বেগম জিয়া পুনরায় চেয়ারপার্সন হিসেবে এবং তাঁর পুত্র তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। দলের গঠনতন্ত্রে এক তৃতীয়াংশ জাতীয় কাউন্সিলে নির্বাচনের বিধান থাকলেও সর্বশেষ কাউন্সিলে শুধু চেয়ারপার্সন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন হয়েছে।
কাউন্সিলের ১০ দিন পর মহাসচিব মির্জা ফখরুল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সিনহার নাম ঘোষণা করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে তিন দফায় যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ঘোষণা করা হয় কমিটির ৪২ জনের নাম। সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কমিটির নাম ঘোষণা করেন। এতে দুইটি পদ খালি রেখে ঘোষিত হয়েছে ১৯ সদস্যের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম, জাতীয় স্থায়ী কমিটি; ৪টি পদ ফাঁকা রেখে ৫০২ জনের জাতীয় নির্বাহী কমিটি; এবং ৭৩ জনের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিল। নির্বাহী কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন ৩৫ জন। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে ব্যাপক ভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে বিএনপি’র গঠনতন্ত্র।
প্রতি তিন বছর পর পর জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও আট বছর পর এই কমিটি গঠন হয়েছে। অনূর্ধ ৩৫১ জনকে নিয়ে নির্বাহী কমিটি গঠন করার বিধান লঙ্ঘন করে কমিটি গঠন হয়েছে ৫০২ জনকে নিয়ে। এ বিষয়ে বিএনপি’র গঠনতন্ত্রে একটা ফাঁক রাখা হয়েছে। চেয়ারম্যান বিশেষ ক্ষেত্রে ৩৫১ জনের উপর ১০% বেশি সংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করতে পারেন। সে হিসেবে ৩৫১ জনের স্থলে নির্বাহী কমিটতে আরও ৩৫ জন বেশি নেয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ মোট সদস্য কোনমতেই ৩৮৬ জনের বেশি হতে পারবে না। গঠনতন্ত্র নির্ধারিত ১৭ জন ভাইস চেয়ারম্যানের বিপরীতে নিযুক্ত করা হয়েছে ৩৫ জনকে। বিশেষ দায়িত্বে একজন সম্পাদক থাকার কথা থাকলেও আছেন দুই জন। গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে, সদস্যদের মতামতের তোয়াক্কা না করে চেয়ারপার্সনের কার্যালয় কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিক উপায়ে কমিটি গঠন করে আর যাই হোক গণতন্ত্র চর্চা করা যায় না।
বিশাল কমিটি করার পরেও পদ বঞ্চিত, পদাবনত নেতাদের ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা গোপন থাকেনি। কমিটি ঘোষণার পর এই লেখার সময় পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন তিন জন। দুইজন বড় নেতা স্বপদে থেকে রাজনীতি করতে আগ্রহী নন বলে জানিয়েছেন সংবাদ মাধ্যমকে। ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা মেরামত করার জন্য বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির এবং নির্বাহী কমিটির আকার আরও বড় হতে পারে বলে সংবাদ মাধ্যমে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন স্থায়ী কমিটি ২১ বা ২৩ সদস্যের এবং নির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ছাত্রদলের মত ৭০০ জনের হতে পারে। এত বিশাল সাইজের কমিটিগুলো কি দলের শক্তি বর্ধনে না হ্রাসে সহায়ক তা নিয়ে আলোচনা চলছে পত্রিকা থেকে শুরু করে টেলিভিশনের টকশো থেকে পাড়া, মহল্লার চায়ের দোকানে।
বাংলাদেশের বৃহত্তম দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোন স্থায়ী কমিটি নেই। তাদের রয়েছে ৩৪ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ। আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৩৫। অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাহী কমিটির আকার কেমন তা জানার জন্য অন্তর্জালের সাহায্য নিয়েছিলাম। ব্রিটেনের লেবার পার্টির নির্বাহী কমিটিতে আছেন ৩৩ জন সদস্য, কনজার্ভেটিভ পার্টিতে ১৯ জন। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে রয়েছে ১০ জনের নির্বাহী কমিটি এবং সে দেশের রিপাবলিকানদের রয়েছে ১১৬ জনের কমিটি।
কমিটি বড় হলেই যে শক্তিশালী হয় এমন ধারণা করার কারণ নেই। যোগ্য লোকদের সবাইকে যদি কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখতে হয় তবে তা নিয়ন্ত্রনহীনতায় ভুগতে পারে। কমিটির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে নেতা-কর্মিদের মধ্যে পদাকাঙ্খা বৃদ্ধির হার ব্যস্তানুপাতিক। এই আকাঙ্ক্ষার কোন শেষ নেই। এভাবে নেতা-কর্মিদের পুরস্কৃত করা যায় না। ৫০২ জনের কমিটি করার পরেও নেতা-কর্মিদের ক্ষোভ, হতাশা কমেনি; বরং কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে হারাতে হয়েছে। ২০০৯ সালের বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন ৩৭১ জন। এটাও বিরাট সংখ্যা। এই বিরাট সংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতাদের বিএনপি তার প্রয়োজনের সময় কাজে পায়নি। বিএনপির একটি ভাইব্রান্ট ও ডায়নামিক কমিটি হয়েছে বলে মতামত দিয়েছেন মহা-সচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এই কমিটি ঘোষণার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উৎসাহ, উদ্দীপনা দেখা যায় নি। কমিটি ঘোষণার দিন এবং তাঁর পরের দিন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ফাঁকা ছিল। নতুন নেতাদের কেউ ফুল বা মিষ্টি দিয়ে বরণ করেনি। বরং পদ বঞ্চিত এবং পদাবনত নেতা-কর্মিদের হাহাকারই শোনা গেছে গণমাধ্যমের পাতায় পাতায়।
নেতা-কর্মীদের হতাশা পৌঁছেছে বেগম জিয়া কাছে। তিনি হতাশ নেতা-কর্মীদের তালিকা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কমিটিগুলোর আকার আরও বড় করে হতাশা দূর করার চেষ্টা করা হবে বলে জানা গেছে। এত বড় কমিটি গঠন করার পরেও কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা বোঝা যায় কমিটির গঠন প্রক্রিয়া এবং নতুন অন্তর্ভুক্ত ১১৩ জনের নাম, পরিচয় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া দেখলে। এদের মধ্যে ২৩ জন এসেছেন বিএনপি নেতাদের পরিবার থেকে। টাকা নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নাম ঢোকানোর অভিযোগ উঠেছে নয়াপল্টন এবং চেয়ারপার্সনের কার্যালয় কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। সিন্ডিকেটের একজন শীর্ষ নেতাকে ডেকে নিয়ে খালেদা জিয়া তিরস্কার করেছেন বলে দৈনিক সমকাল খবর ছেপেছে।
প্রবীণ কলাম লেখক আব্দুল গাফফার চৌধুরী এ বিষয়ে কালের কণ্ঠে লিখেছেন, “তাঁদের কাউকে কাউকে জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়ার আগেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা করা হয়েছে। তাঁদের নিয়ে কি বিএনপি আন্দোলনে নামার আশা করে”? বিএনপি’র কমিটি গঠনের দিকে ভাল করে লক্ষ করলে এখা যায় এই কমিটিতে স্থান পেয়েছে তারেক জিয়া তথা জামায়াত ঘেঁষা লোকেরা; বঞ্চিত বা পদাবনত হয়েছে দলের ভেতরে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির লোকেরা। ৮০’র দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে ৯০’র দশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত যে সকল তরুণেরা ছাত্রদলে যোগ দিয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদে যারা নির্বাচিত হয়েছিল, সামান্য ব্যাতিক্রম বাদ দিলে তাঁদের উপস্থিতি এই কমিটিতে চোখে পরে না। বরং স্পষ্ট করে চোখে পরেঘৃণ্য অপরাধী এবং তাদের পরিজনদের। 
৫০২ জনের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার আসামী কে এম ওবায়েদুর রহমানের কন্যা শামা রহমান, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামী সাবেক উপমন্ত্রী কারাবন্দী আব্দুস সালাম পিন্টু এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কারাবন্ধী লুৎফুজ্জামান বাবর। এই তালিকায় আরও আছেন বিকৃত মানসিকতার মৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং পুত্র হুম্মাম কাদের চৌধুরী। এছাড়াও রয়েছেন আরেক যুদ্ধাপরাধী – জেনারেল জিয়া এবং বেগম জিয়ার মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে মৃত্যুবরণকারী আব্দুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীম। জামায়াত ঘনিষ্ট বিএনপি নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের, জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার আসামীর কন্যাকে এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দিয়ে বেগম জিয়া জাতিকে কি বার্তা দিলেন? তিনি কি এটা বলতে চান যে এরা ঐ সমস্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না? তা কি কেউ মনে করে? ঐসব অপরাধীদের অপরাধ সম্পর্কে কি জনমানসে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে?
এরা আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে পেট্রোল বোমা মেরে পুড়িয়ে মেরেছে; সরকারী, বেসরকারী মাধ্যমে সাহায্য দিয়ে হিংস্র জঙ্গিবাদের চাষাবাদ করেছে; বিরোধীদের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে জেল অভ্যন্তরে, প্রকাশ্যে হত্যা করেছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদিদের। বিভিন্ন সময়ে মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য, প্রমাণের কারণে, আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষ নিশ্চিতভাবে ঐসব অপরাধীদের অপরাধ সম্পর্কে সচেতন। বেগম জিয়া নিজেও কি সচেতন নন? তবুও কেন এদের পরিবারের সদস্যদের, অপরাধীদের বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করলেন? উত্তর হতে পারে একটাই – বেগম জিয়া এদের কৃতকর্মের জন্য পরিবারের সদস্যদের, অপরাধীদের পুরস্কৃত করে ভবিষ্যতে এরকম আরও অপরাধ করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন।
তাই যদি হয় – বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে নিয়ে, সেনা ছাউনিতে জেনারেল জিয়া কর্তৃক গঠিত এই দলটি ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে আরও অনেক বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটাবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








