‘ঘটনাগুলো একটু ভিন্নভাবে ঘটলে চুপচাপ শান্ত এই লোকটাকে এখন লন্ডনের হেমন্তের কাঁপুনি ধরা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। তিনি হতে পারতেন বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) রাজা, ৫ কোটিরও বেশি মানুষের রাষ্ট্রনায়ক।’
কিন্তু বর্তমানে পরিপাটি একখানা সুন্দর গোঁফ ছাড়া ইউ সো উইন নামের মানুষটির মাঝে রাজকীয় বংশধর হওয়ার কোনো চিহ্নই বাকি নেই। বার্মার রাজা হওয়ার জন্য একটা সময় এমন গোঁফ থাকা ছিল পূর্বশর্ত। কিন্তু সো উইন তার পুরো জীবনটাই কাটিয়েছেন তার বাসস্থান লন্ডনের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে ফেলার পেছনে।
এই ইউ সো উইন এবং লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সাউথ-ইস্ট এশিয়া বিভাগের তত্ত্বাধায়ক জন ক্লার্কের সঙ্গে যাদুঘরে সো উইনের রাজবংশীয় নিদর্শন দেখতে গিয়েছিলেন বিবিসি’র বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালেক্স বিসকোবি। কথায় কথায় বেরিয়ে আসে এমন এক নিখোঁজ অমূল্য সম্পদের কথা, যার ‘অলৌকিক ক্ষমতা’য় সেরে যেত নানা রোগব্যাধি, সৌভাগ্য বয়ে আনত তার মালিকের জন্য।
সম্পদটির নাম নাগা মক রুবি- হাঁসের ডিমের মতো বড় রক্তলাল এক রত্নপাথর। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষায় পাথরটি থেকে উজ্জ্বল লাল দ্যুতি ছড়াত। ইউ সো উইনের প্র-পিতামহ (দাদার বাবা) ছিলেন এই রুবির মালিক। বলা হতো, পাথরটি এতই মূল্যবান যে তার বিনিময়ে আস্ত একটা রাজ্য কিনে নেয়া সম্ভব।
১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী মিয়ানমার দখল করে। তখন দেশটি বার্মা নামেই পরিচিত ছিল। বার্মার রাজা থিবাওকে ক্ষমতাচ্যুত করে তাকে কয়েক ঘণ্টা সময় দেয়া হয় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম গুছিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। তাকে নির্বাসিত করার পর বংশানুক্রমে সংরক্ষিত বার্মিজ রাজপরিবারের স্বর্ণ ও রত্নখচিত ১৬৭টির বেশি রাজকীয় সরঞ্জাম জব্দ করে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
১৯৬৪ সালে সেগুলো আবার বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে বার্মার তৎকালীয়ন শাসক জেনারেল নে উইনের কাছে ফিরিয়ে দেয় ব্রিটিশ সরকার। সেগুলো থেকে আবার রত্নসজ্জিত স্বর্ণের তৈরি হিন্থা নামের বড়সড় হাঁসের মতো একটি পাখির ভাস্কর্য উপহার হিসেবে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেন জেনারেল। সেটি এখন ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
এই সবগুলো ঐতিহাসিক রাজকীয় নিদর্শনেরই হিসাব রয়েছে। শুধু জানা নেই সেই রাজ-রুবির খবর।
জন ক্লার্ক জানান, নাগা মক কখনোই ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে আসেনি। ‘আমার মনে হয় এটা কোনো একটা রাজ সংগ্রহশালায়ই রক্ষিত আছে। আমার ধারণা এটা সম্ভব, কারণ যতটুকু মনে পড়ে আমি কোথাও পড়েছিলাম যে রুবিটা কোনো এক সময় রাণী ভিক্টোরিয়াকে দেয়া হয়েছিল,’ বলেন তিনি।
কিন্তু এ পর্যন্ত যদি রুবি এসেও থাকে, তা এসেছে সেনাবাহিনীর জব্দ করা সম্পদের হিসেবের বাইরে, চুরি করে।
কে সেই রুবি চোর?
এখন পর্যন্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি কোথায় আছে নাগা মক রুবি বা কে চুরি করেছিল তাকে। তবে অনেক আগে থেকেই ধারণা করা হতো, এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ভারত-বার্মা অঞ্চল দখলের প্রধান রাজনৈতিক কর্মকর্তা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্নেল এডওয়ার্ড স্লাডেন। তিনি আবার ছিলেন রাজা থিবাওয়ের বিশ্বস্ত ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের একজন। তিনিই থিবাওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করেছিলেন কোনো ঝামেলা ছাড়া ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য।
ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুসারে, কথা ছিল কর্নেল স্লাডেন রাজা থিবাওয়ের সপরিবার নির্বাসনের প্রস্তুতি নেয়ার সময় নাগা মক রুবিসহ অতি মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় সম্পদগুলো সঙ্গে গুছিয়ে নিতে তাকে সাহায্য করবেন।
কিন্তু সেই রক্ষকই হয়ে গেলেন রাজার সম্পদের ভক্ষক। নির্বাসনের বহু বছর পর রাজার ছোট মেয়ে লিখেছিলেন:
স্লাডেন আমার বাবা-মাকে বলেছিলেন, তাকে একবার রুবিটা দেখতে দিতে এবং তারা সেটা বের করে তার হাতে দিলেন। আমার বাবা-মা বলেছেন, কিছুক্ষণ রুবির দিকে তাকিয়ে থাকার পর স্লাডেন অন্যমনস্ক ভাব দেখিয়ে সেটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেন, তারপর আর ফেরত দেননি।
অনেকে আবার বলেন, রাজা রুবিটা নিজেই স্লাডেনকে দিয়েছিলেন সাবধানে রাখার জন্য। কিন্তু নিরাপদে দেশত্যাগের পর আর সেটা ফেরত না পেয়ে এক পর্যায়ে ১৮৮৬ সালের জুনে ব্রিটিশ ভাইসরয়কে নিজ সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন জানিয়ে চিঠিও লেখেন রাজা থিবাও। তারপরও নাগা মকের কোনো সন্ধান পাননি তিনি।
দফায় দফায় চেষ্টায় শেষমেষ ১৯১১ সালে থিবাও নতুন ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ বরাবর চিঠি লিখে জানান কীভাবে স্লাডেন তার বহুমূল্য ‘নাগামক’ নামের একটি রুবির আংটি চুরি করেছেন। কিন্তু স্লাডেনের মৃত্যুর ২১ বছর পর আর তখন এ ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার আগ্রহও ছিল না ব্রিটিশ সরকারের। এর পাঁচ বছর পর মারা যান থিবাও।
ইতিহাসবিদদের ধারণা, স্লাডেন রুবিটি চুরি করে রাণী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দিয়েছিলেন। কারণ এর মাত্র ক’মাস পরই নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
কোথায় এখন নাগা মক?
চোরের পরিচয় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা না গেলেও অন্তত নাগা মক কার কাছে গেছে তার খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। খুঁজতে খুঁজতে মাইকেল ন্যাশ নামের এক ইতিহাস বিষয়ক লেখক ব্রিটিশ রয়্যাল কালেকশন ট্রাস্টের ক্যারোলিন ডি গুইতাতের কাছ থেকে একটি চিঠি পান।
সেখানে জানানো হয়, তিনি রাণী ভিক্টোরিয়ার গয়নার ১৮৯৬ সালের এক তালিকায় ‘কাবোচন রুবি (৭৫)’ নামের একটা জিনিস দেখেন। ৭৫ সংখ্যাটি রুবির ক্যারেট সংখ্যা হতে পারে। নাগা মক ছিল ৮০ ক্যারেটের বেশি ওজনের। ক্যারোলিন বলেন, এটাই নাগা মক হয়ে থাকলে হয়তো পাথরটি কাটা হয়েছিল।
কিন্তু সেই কাবোচন রুবিটাই বা কোথায়?
তালিকা অনুসারে, রত্নটি তৎকালীন বার্মার রাজার ছিল এবং ‘বার্মিজ দূতদের পক্ষ থেকে’ রাণীকে এটি উপহার দেয়া হয়েছিল। এটা একটা ব্রেসলেটে বসিয়ে ডাচেস অব আর্গিল প্রিন্সেস লুইসকে দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান ডিউক অব আর্গিল জানান, এমন কোনো রত্ন ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছে বর্তমানে নেই। অর্থাৎ সেটা প্রিন্সেস রুবি অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কাকে?
ন্যাশ তার বইয়ে জানান, প্রিন্সেস লুইস মৃত্যুর আগে যে উইল করে গেছেন তা এখনো সিল করাই আছে এবং রাজপরিবারের নিয়ম অনুসারে অতি সম্প্রতি তা খোলার সম্ভাবনা নেই। তাই প্রিন্সেসের ব্রেসলেটের রুবি যদি নাগা মক হয়েও থাকে, তার খবর এভাবে এত জলদি পাওয়া যাচ্ছে না।
সো উইনের পরিবার হাল ছাড়েনি। প্রজন্ম ধরে এখনো খোঁজা হচ্ছে সেই রুবি। হাল ছাড়েননি ইতিহাসবিদরাও।









