রাজনীতিকদের অনেকে যে মেয়েটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে বড় হতে দেখেছেন সেই শামা ওবায়েদ এখন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। পিতা কে এম ওবায়দুর রহমানের রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেকের সহকর্মী এখন তিনি।
বাবার ইচ্ছায় রাজনীতিতে জড়িয়ে বিএনপির কঠিন সময়ে এখন দলটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে শামা ওবায়েদ। বিভিন্ন ইস্যুতে জোরালো প্রতিবাদ এবং আন্দোলনে তিনি নানা সময়ে আলোচনায় এসেছেন। টেলিভিশন টকশোর প্রিয় এক মুখও তিনি।
চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে সাক্ষাতকারে শামা ওবায়েদ বর্তমান সময়ের রাজনীতি, দলের কর্মকাণ্ড এবং তার নিজস্ব কিছু বিষয়ে কথা বলেছেন।
চ্যানেল আই অনলাইন: দেশের বর্তমান রাজনীতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
শামা ওবায়েদ: বর্তমানে রাজনীতিতে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। গণতন্ত্র যেখানে অনুপস্থিত সেখানে রাজনীতি থাকে না। সংসদে বড় কোনো বিরোধী দল নেই, যারা আছেন তারাও সরকারের মতোই জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। সরকারের বিপক্ষে কথার বলার কোনো লোক নেই।
সরকারের যা ইচ্ছে তাই করছে, কোনো দায়বদ্ধতা নেই। উল্টো বিএনপি সেটার প্রতিবাদ করতে গেলে নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে, গুম-খুনের মতো স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড করছে। এমন একটা অবস্থা যেখানে রাজনীতি বা গণতন্ত্র কিছুই অবস্থান করতে পারে না। এমন একটা অবস্থা যেখানে আপনি সত্য কথা বললে গ্রেফতার হতে পারেন।
চ্যানেল আই অনলাইন: আপনার কথা মতো রাজনীতি যেহেতু ভয়াবহ অবস্থায়, সেখানে বড় একটি দল বিএনপি সরকারের বিপক্ষে কিছুই করতে পারছে না কেন? আপনাদের দুর্বলতাটা কোথায়?
শামা ওবায়েদ: বিএনপি কখনোই দুর্বল ছিল না, আর এখনো নেই। রাজনীতির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিএনপি রাজপথে আন্দোলন করেছে, আর এখনো করছে। কিন্তু বর্তমানে স্বৈরাচারী সরকারের চেয়েও ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী এ সরকারের বিপক্ষে বিএনপি আন্দোলনে মাঠে থাকলেই জঙ্গি বানিয়ে দেয়। দেশে-বিদেশে হত্যা হলে বিএনপির নাম চাপিয়ে দেয়। সরকারের কাছে বিএনপি মাঠে থাকলেও দোষ, ঘরে থাকলেও দোষ। তাহলে বিএনপি থাকবে কোথায়?
বরং আমাদের চেয়ারপারসন সরকারকে সহায়তা করার জন্য সবসময় এগিয়ে এসেছেন। দেশের জঙ্গি দমনে সরকারকে সহায়তা করার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর। কিন্তু, তারা উল্টো সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করছে। তাই আমি বলবো, বিএনপির আন্দোলন চলমান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে থেকে বিএনপি যেভাবে সরকারের বিপক্ষে কঠোর আন্দোলনে ছিল বর্তমানে সেই কঠোর আন্দোলনেই রয়েছে।
চ্যানেল আই অনলাইন: রাজনীতির এমন সময়ে তরুণদের আগমন আপনি কিভাবে দেখেন?
শামা ওবায়েদ: আমি খুব আশাবাদী। তরুণদের রাজনীতিতে আসাকে আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি। বর্তমানে রাজনীতিতে তরুণরা বিভিন্নভাবে অবদান রাখছেন। তাদের মধ্যে নতুন কিছু করার স্পৃহা খুব বেশি থাকে। কিন্তু, আমার কাছে মনে হয় শুধু রাজনীতি করলেই হবে না।
অব্যশই তরুণদের শিক্ষিত হতে হবে, আত্মত্যাগী হতে হবে এবং সর্বোপরি সিনিয়রদের সম্মান করতে হবে। তাদের পথ অনুসরণ করেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রবীণদের যথাযর্থ মূল্যায়ন করতে হবে। প্রবীণদের দেখানো পথে চলতে হবে। কারণ উনাদের রাজনীতির বয়স বা অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। আবার প্রবীণদের উচিত তরুণদের জায়গা করে দেওয়া, তাদের শিক্ষায় আরো বেশি শিক্ষিত করে তোলা। কারণ ভবিষ্যতের রাজনীতি তো এই তরুণদের কাছে চলে যাবে। দেশে নতুন নেতৃত্ব আসবে। তাই প্রত্যেক দলেই নবীণ-প্রবীন সংমিশ্রণ করা উচিত।
চ্যানেল আই অনলাইন: তাহলে জাতীয়াবাদী দল তরুণদের কতটুক মূল্যায়ন করছে?
শামা ওবায়েদ: এবারের কাউন্সিলে বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দলে তরুণদের সুযোগ দিয়েছেন। তাছাড়া নারীরাও সমানভাবে সুযোগ পাচ্ছেন বিএনপিতে।
চ্যানেল আই অনলাইন: আপনি কিভাবে রাজনীতিতে জড়ালেন সেই কথাটা জানতে চাচ্ছি।
শামা ওবায়েদ: আমার বাবা কে এম ওবায়দুর রহমান, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাছাড়া বিএনপির মহাসচিব পদে ছিলেন। বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় তার নির্বাচনী এলাকায় যেতাম। তখন থেকেই এলাকার সবার সঙ্গে আমার ভালো একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
আসলে আমার রাজনীতিটা রুট লেভেল থেকেই শুরু হয়েছে। বাবা চলে যাওয়ার পর ম্যাডাম আমাকে ডেকে বললেন, তোমার এলাকার জনগণ তোমাকে ভীষণ পছন্দ করে, তাহলে এবার নির্বাচন কর। এরপর ২০০৮ সালে নির্বাচনে ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা) থেকে আমি সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করি। বর্তমানে আমি এমপি নই, তারপরও আমার নিজ এলাকার জনগণ এখনও আগের মতোই ভালোবাসে আমাকে। আমিও তাদের বিপদে-আপদে চলে যাই।
চ্যানেল আই অনলাইন: দেশের বাইরে চাকুরি ছেড়ে হঠাৎ রাজনীতিতে আসার ইচ্ছে হল কেন?
শামা ওবায়েদ: ছোটবেলা থেকেই একটি রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়েছি। বাবাকে দেখেছি মানুষের দুঃখে কিভাবে এগিয়ে যেত হয়, কিভাবে দেশের মানুষদের জন্য সব কিছু উৎসর্গ করতে হয়। বাবার আদর্শে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিতে আসার ইচ্ছে ছিল।
সেই ইচ্ছেটি পূরণ করতে পেরেছি। মানুষের মঙ্গলের জন্য সারাজীবন কাজ করতে চাই। আর দেশের বাইরে মূলতঃ থাকা হয়েছে পড়াশুনার জন্য। আমি মনে করি, একজন রাজনীতিবিদকে অবশ্যই আগে শিক্ষিত হতে হবে। তাহলেতো দেশ শিক্ষিত হবে।
চ্যানেল আই অনলাইন: আপনি তো রাজনীতির বাইরে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।
শামা ওবায়েদ: হ্যাঁ রাজনীতির পাশাপাশি কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমি যুক্ত রয়েছি। কিন্তু, সেগুলো আমি একেবারে ব্যক্তিগতভাবে করে থাকি। কোনো রাজনীতি এখানে যুক্ত নেই। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম নামে একটি সংগঠন রয়েছে। এছাড়া উইমেন্স এলায়েন্স ও প্রতিবন্ধীদের একটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছি।
তবে এগুলো সম্পূর্ণ আমি নিজের ইচ্ছাতেই করে থাকি। তাই এই কাজগুলোর কোনো প্রচার বা প্রচারণা করতে ব্যক্তিগতভাবে আমি পছন্দ করি না। আসলে মানুষ হিসেবে সমাজের জন্য কিছু করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
চ্যানেল আই অনলাইন: দলে আরো বড় পদ পেলে দলের কোন জিনিসটি ঠিক করতেন?
শামা ওবায়েদ: আমি দলের সাংগঠিক সম্পাদক, তাই আমি মনে করি আমার আর কোনো বড় পদ দরকার নেই। যেই পদে রয়েছি সেই পদের কাজগুলো সুন্দরভাবে এবং শৃঙ্খলভাবে করতে চাই। আর দল ঠিক করার কথা বলছেন, দল ঠিক করার মতো কিছুই হয়নি। সবকিছুই ঠিক আছে। তাছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক পদ ছাড়াও দলে আমার অনেক কাজ থাকে। 
বাইরে থেকে পড়ে আসার কারণে দলের অনেক কাজ আমাকে করতে হয়। যেমন, দলের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য আমি। আসলে নিজের যোগ্যতা থাকলে দলে বসে থাকতে হয় না। দলের বিভিন্ন জায়গায় নিজের বিস্তার ঘটানো সম্ভব। তাছাড়া বিএনপি এমন একটি দল, যে দল সকল নেতাকর্মীকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারে।
চ্যানেল আই অনলাইন: এত ব্যস্ততার মধ্যে পরিবারকে কিভাবে সময় দেন?
শামা ওবায়েদ: সব কাজের পেছনেই পরিবারের সাপোর্ট দরকার হয়। আর একটি জিনিস দরকার হয় সেটি হল টাইম ম্যানেজমেন্ট। সময়কে যদি ম্যানেজ করতে পারেন তাহলে সব কাজ আপনি গুছিয়ে করতে পারবেন। আর এখন তো মেয়েরা খুব সচেতন। সব সেক্টরে মেয়েরা কাজ করছে। ঘরে-বাইরে সবখানে মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।
চ্যানেল আই অনলাইন: আপনিতো খুব ফ্যাশন সচেতন। এটা কিভাবে ম্যানেজ করেন?
শামা ওবায়েদ: সবকিছুই আসলে নিজের মনের ব্যাপার। আমি ফ্যাশন সচেতন কিনা জানি না, তবে নিজেকে ছিমছাম রাখতে পছন্দ করি। আসলে বাইরের সৌন্দর্য’র চেয়ে ভেতরে সৌন্দর্য থাকাটা অনেক বেশি দরকার। কারণ, আমার চলাফেরা, কথা বলার ধরন সবকিছুই আমার ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলে। আর পোশাকতো নিছক একটি জিনিস।
চ্যানেল আই অনলাইন: সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ।
শামা ওবায়েদ: চ্যানেল আই এবং চ্যানেল আই অনলাইনকেও অনেক ধন্যবাদ।
(শামা ওবায়েদের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৪ মে। স্কলাসটিকায় প্রাথমিক শিক্ষাজীবন। এরপর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়া।
সেখানকার স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে গ্র্যজুয়েশন এবং এমবিএ ডিগ্রি। পরে ৬ বছর যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি। তবে ২০০২ সালে চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসা, বাবার ইচ্ছায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় বাবার মৃত্যুর পর।)








