বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও একটু দেরি হচ্ছে। সাত পাঁচ ভেবে গ্রিনরুমের দিকে পা বাড়াই। গ্রিনরুমের ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে তবলাশিল্পী দিব্যেন্দুর সঙ্গে কথা বলছিলেন ভারতের প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার।
পরিচয় দেওয়ায় সময় মিলল দুই মিনিট। জানতে চেয়েছি, বাংলাদেশে এসে কেমন লাগছে? শুভ প্রসাদ বললেন, ‘বাংলাদেশে এলেই ভালো লাগে।’
‘বাংলাদেশ’ শব্দটায় এমন জোড় দিয়ে বললেন যেন এখানেই লুকিয়ে আছে ভালোলাগার হাজার উপকরণ। নিজ থেকেই ভালোলাগার কারণ বললেন, ‘প্রিয়জন হারানোর বিয়োগব্যথায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি (শিল্পী কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের অকাল প্রয়াণকে ইঙ্গিত করে)। এ সময় উঠে দাঁড়ানোর জন্য যে অবলম্বনের প্রয়োজন হয়, বাংলাদেশ হচ্ছে প্রকৃষ্ট অবলম্বন। সে জন্য পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করলাম না। সেই আত্মজন আর বাংলাদেশ খুব করে জড়িয়ে আছে। এজন্যই বাংলাদেশকে খুব করে ভালোবাসি। যে কোনো ধরনের অন্ধকারে বাংলাদেশকে আলোকস্তম্ভ মনে হয়।’
এরপর হেসে বললেন, ‘দিতে আসিনি কিছুই, নিতে এসেছি।’
কী নিতে এসেছেন? বললেন, ‘বাংলাদেশের সবুজে, শ্যামলে, সুনীলে, জলে-স্থলে, সবকিছুতে একটা অনুপ্রেরণা আছে। ভালো থাকার অনুপ্রেরণা। ভালো স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা। সেটাই নিতে এসেছি।’
কয়েকদিন আগে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও দোহার গানের দলের সদস্য কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। শুভ প্রসাদ বলেন, ‘ওর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল, সেটা বলছি না। একটা কথাই বলব, সে যে গানগুলো গাইতো, সিলেট অঞ্চলের গান এবং পূর্ববঙ্গের গান। বাংলাদেশের লোক ওকে আত্মজন মনে করে। নিজের ছেলে মনে করে। তার কর্মক্ষেত্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের লোক তাকে নিজের ছেলে মনে করে। আবার সে শীলচরের, আসামের ছেলে বলে তারাও ওকে নিজের ছেলে মনে করে। আমি এই সময়ে কোনো বাঙালিকে দেখিনি যে তিন বাংলার মানুষের আপন হতে পেরেছে। যার কাছে এসে সমস্ত কাঁটাতার তুচ্ছ হয়ে গেছে।’
অনেক কিছুই বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। মঞ্চে গিয়ে বসতে হবে। বিদায় নিয়ে মঞ্চের দিকে পা বাড়ালেন শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে শিল্পী শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদারের ‘অপার বাংলার গান’ শীর্ষক একক গানের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সভাপতি কামাল লোহানী, নাট্যজন শংকর সাঁওজাল, চলচ্চিত্র নির্মাতা শাকুর মাজিদ। ভারত থেকে আসা শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার, বাদযন্ত্রশিল্পী দিব্যেন্দু ব্যানার্জি আর অভিজিৎ চক্রবর্তীকে সম্মাননা স্মারক ও উত্তরীয় প্রদান করা হয়।
শুরু হয় শুভ প্রসাদ নন্দীর একক সংগীত পরিবেশনা। লোকগান, রবীন্দ্রসংগীত, গণসংগীতসহ নানা আঙ্গিকের গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখেন রাত ১০টা পর্যন্ত। গানের মাঝে মাঝে বললেন কিছু কথা। বললেন, বাংলায় থেকেও বাংলায় না থাকার ব্যাকুলতা। মাতৃভাষার কারণে এপার বাংলা অপার বাংলার আত্মার সম্মিলনের কথা। সদ্যপ্রয়াত বন্ধু কালিকা প্রসাদের কথা। আবার বাংলাদেশে আসার ইচ্ছা জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন।
শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার ভারতের আসামে জন্ম নেওয়া গণসংগীতশিল্পী। দুই বাংলার প্রগতিশীল সাস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে তিনি খুব পরিচিত। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গান ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিয়ে সমানতালে চলছেন তিনি।










