নিজের জন্মস্থান বা নিজের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি বিজড়িত স্থান মানুষের হৃদয়কে টানে। আমরা যারা গ্রামে জন্ম নিয়ে জীবন জীবিকার জন্য ঢাকা বা অন্য কোনো শহরে এসে স্থিতু হয়েছি নানা কারণে, তারা সময় সুযোগ পেলেই গ্রামে যাবার চেষ্টা করি। অনেকে গ্রামে একটা ঘর বানিয়ে রাখেন যাতে করে অবসরকালীন সময়ে সেখানে গিয়ে থাকতে পারেন, সেই প্রত্যাশায়। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা আর হয়ে ওঠে না, সন্তানদের মায়ায়। আমরা যেমন জীবিকার জন্যই মূলত গ্রামে আমাদের বাবা-মা’কে ফেলে এসে থাকি শহরে। ঠিক একইভাবে আমাদের সন্তানেরাও শহরে থেকে যেতে চায়, তাদের শহুরে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি নিয়ে। গ্রাম তাদের হৃদয়কে তেমন টানে না, তাদের প্রাণে গ্রামের জন্য টান তেমন থাকে না, যেমনটা থাকে গ্রাম থেকে উঠে আসা তাদের বাবা-মাদের।
জীবন বড় মায়ার, আমরা নিজের জীবনকে সব চেয়ে বেশি ভালোবাসি। তাই জীবন জীবিকার জন্য, উন্নত শিক্ষার জন্য বাবা-মায়েদের ছেলে মেয়েরাও কখনো কখনো চলে যায় বিদেশে। সরকারি হিসেবে বিশ্বের ১৬৯টি দেশে বাংলাদেশি অভিবাসী রয়েছেন। বিদেশে গিয়ে উন্নত জীবন পেয়ে কিছুদিন খুব আনন্দে কাটে। একটা পর্যায়ে ভালো থাকার জন্য তাদের বিরাট অংশই সেই দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে নেয়। জীবিকা নিশ্চিত হবার পরেই দেশের মায়া তাদেরকে তাড়া করে ফেরে অহর্নিশি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেশের মায়া তাদের রীতিমত অস্থির করে তোলে। তারা দেশে ফিরে আসতে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু পারেন না সেই ছেলে মেয়ের মায়া আর বৃদ্ধ জীবনের সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবে। যারা আসতে পারেন তাদের সংখ্যা খুব কম। সেই ফিরে আসাতেও তাদের সুখ থাকে না। সন্তানের মায়ায় তাদের মন পড়ে থাকে বিদেশে, সন্তানদের কাছে।
নিজের দেশের মাটির মায়া কি জিনিস তা এদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তথা সংখ্যালঘুদের দেখে কিংবা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানদের দেখে কিছুটা হলেও অনুধাবন করা যায়, যদি মনের চোখ থাকে। হাজারো নির্যাতন সহ্য করেও তারা দেশের মাটি আঁকড়ে থাকে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এটা সব দেশের সব মানুষের বেলায় প্রযোজ্য। এই ব্যতিক্রমরাই কিন্তু সমাজে, দেশে অনেক সমস্যার জন্ম দেয়। এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেধাবী। কিন্তু তাদের কাছে ভালোবাসার চেয়ে স্বার্থ আর মোহ বড় হয়ে থাকে। যৌবনে ফুর্তির জন্য টাকা বা জৈবিক চাহিদা মেটাতে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে তারা। মোহমুক্তি যখন হয় তখন আর কিছুই করার থাকে না। তখন তারা নিজের অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য চিৎকার চেঁচামেচি করে।
আজকে একটি দৈনিকে একটা খবর পড়ে আমার মাথায় নানা প্রশ্নের উদয় হয়। তাই তার জবাব বা যুক্তি আমার মাথায় খেলা করছিলো তখন। তাই এই লেখা। আসল কথাতেই আসছি এবার। বাংলাদেশে নাগরিকত্ব প্রদান, নাগরিকত্ব বাতিলসহ প্রাসঙ্গিক বিষয় সুস্পষ্ট করার জন্য ‘দ্য বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পোরারি প্রভিশনস) অর্ডার ১৯৭২ বলবৎ রয়েছে। ‘দ্য সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট ১৯৫১’-এর অধীনে ওই আদেশ জারি করা হয়। বহিরাগমন, নাগরিকত্ব অর্জন, সংরক্ষণ, পরিত্যাগ, অবসান ইত্যাদি বিষয়ের সমাধান দেয়া এই দুই আইনে পরিষ্কার নয়। তাই দুই আইন একীভূত করে ‘বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন ২০১৬-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। হ্যা, সময়ের চাহিদা মেটাতে আইন পরিবর্তন করতেই হয়। সেটা সব আইনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের দেশের বর্তমান, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের পরিবর্তন দরকার হয়ে পড়েছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ এখন এক সম্ভাবনাময় সুন্দরী তন্বী। তাই তাকে পাবার বা নষ্ট করার জন্য বিভিন্ন মানুষের, বিশেষ করে দুষ্টু, শয়তান মেধাবীদের আছে না অপচেষ্টা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী, সহায়তাকারী এমনকি তাদের সন্তানেরাও বাংলাদেশের নাগরিক হতে অযোগ্য হবেন। এমন বিধান রেখে বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন ২০১৬ (খসড়া) চূড়ান্ত করা হয়েছে। আইনের খসড়ায় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশি কোনো ব্যক্তিকে বিয়ে করলে তাকে শর্তসাপেক্ষ নাগরিকত্ব দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। শর্তের বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশি কোনো নাগরিক বিদেশি নাগরিককে বিবাহ করলে, যদি উক্ত বিবাহ সম্পর্কে বৈধতার কোনো প্রশ্ন না থাকে, সরকার উক্ত বিদেশি নাগরিককে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করতে পারবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এটা নিয়েই অনেকে সমালোচনা করছে। করতেই পারে। আইন সব দেশেই, সব কালেই সমালোচনাযোগ্য, পরিবর্তনযোগ্য। সময়ের চাহিদা মেটাতে, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কিংবা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে মালয়েশিয়ার মতো সেকেন্ড হোমের আইন করেও নাগরিকত্ব আইনের পরিবর্তন হতেও পারে অচিরেই, এই বাংলাদেশে। কারণ আমাদের দেশ এগুচ্ছে অবিশ্বাস্য গতিতে নানাদিকে। এখন যদি দুষ্টু, শয়তান, মেধাবী রাজাকারের আওলাদরা এদেশের নাগরিক হয়ে যায় কিংবা তারা যদি দেশের নীতিনির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়, তখন তারা আমাদের দেশের অগ্রযাত্রাকে রহিত করতে বা থামিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশে যাদের বিশাস নেই, যারা এখনো বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে স্বীকার করে না, তাদের আত্মীয় স্বজন বা আওলাদরা এই আইনের বিরধীতা করতেই পারে। করবে, সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে বহু ব্যবসায়ী, আইনজীবী আছেন যারা রক্তে পাকিস্তানী, কিংবা টাকার বিনিময়ে ১৯৭১ সালের মানবতা বিরোধীদের পক্ষাবলম্বন করে। তাদের স্ত্রীরা, সন্তানেরা এই আইনের বিরোধিতা করবে, তাতে কান দেওয়ার কি দরকার আছে?
উন্নত দেশে আমেরিকাতে, কিংবা আমাদের এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়াতেও তাদের স্বাধীনতার বিরোধীদের তিন পুরুষকে সেই দেশের ২য় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হয়েছে বলেই তারা এগিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াতে ‘ছিনিল্পা’দের (জাপানপন্থী) এখনো ভালো চাকরি দেওয়া হয় না। আমেরিকার স্বাধীনতা বিরোধীদের তো গুলি খরচ না করে গরম আলকাতরায় চুবিয়ে মারতে চেয়েছিলেন তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাই ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে। রাজাকারের আওলাদ, আত্মীয়রা বা মানবতা বিরোধীদের দোসরেরা বা তাদের সঙ্গীরা যাদের রক্তে এখনো পাকিস্তানী রক্ত প্রবাহিত, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগ দিতে যত বাহানাই করুক না কেন, তা আমলে নেওয়া কি ঠিক হবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







