আমাদের দেশে ভালো উদ্যোগ, ভালো কাজের খবর খুব বেশি পাওয়া যায় না। যেসব খবর পাওয়া যায় তাতে মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠে। ঈদের প্রাক্কালে টঙ্গীর একটি ফ্যাক্টরিতে আগুনে পুড়ে প্রায় পঁয়ত্রিশজন শ্রমিকের করুণ মৃত্যুর ঘটনাটি আমাদের ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। ঈদের ছুটিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও আমাদের ব্যথিত করেছে। এই খারাপ খবরের ভিড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পাওয়া একটি ছোট্ট খবর মনটাকে প্রফুল্ল করে তুলেছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর বরিশালের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত জেল খালউদ্ধার ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়েছে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে। প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাব্রতী মনোভাব নিয়ে এই অভিযানে শামিল হয়েছেন। এটি একটি বিরল ঘটনা।
বরিশালে জেলখাল উদ্ধার ও পরিচ্ছন্ন অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে সরকারি একটি দপ্তর, সংগঠিত হয়েছে ফেসবুকে, বিকশিত হয়েছে সিটিজেন জার্নালিজম, সম্পৃক্ত হয়েছে হাজার হাজার জনগণ, সমাধান হচ্ছে সামাজিক সমস্যার, সূচিত হয়েছে সামাজিক আন্দোলন। কোনোটিই সহজ নয়। এমন ইতিবাচক উদ্যোগ সচরাচর দেখাও যায় না। সরকারি দপ্তরের নেতৃত্বে, ফেসবুকের মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে, সামাজিক সমস্যা সমাধানে এতো মানুষ এভাবে কখনো পথে নেমেছে বলে মনে হয় না! বরিশাল জেলা প্রশাসন সত্যি যেন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে!
নতুল্লাবাদ থেকে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত জেলখালের বিস্তৃতি ৩ দশমিক ০২ কিলোমিটার (৩২০০ মিটার)। এই ৩২’শ মিটার এলাকাকে ৩০টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। এই খাল উদ্ধার অভিযানে অংশ গ্রহণকারী হাজার হাজার মানুষকে টাকা দিয়ে আনতে হয়নি, সবাই এসেছিলেন স্বপ্রণোদিত হয়ে। অনেকে আবার এসেছিলেন উৎসুক দর্শক হিসেবে। খালের দু’পাড়ে ছিলো শুধু মানুষ আর মানুষ। জেলা প্রশাসন সব শ্রেণি পেশার মানুষকে একত্র করেছে, কাজে লাগিয়েছে। প্রত্যেক অংশের জন্য তৈরি করা হয় একেকটি গ্রুপ। প্রত্যেক গ্রুপে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা, দুটি এনজিও, দুটি সরকারি দপ্তর, একজন কাউন্সিলর, ৫ জন রোভার স্কাউটস সদস্য, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং একটি স্বেচ্ছোসেবী সংগঠন। তিনটি গ্রুপের জন্য একজন নারী কাউন্সিলর, ৫টি গ্রুপের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১০টি গ্রুপের জন্য একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক/জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করেছেন। জেলখাল পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ছিলো ৩০টি নৌকা, স্পিডবোট এবং তিনটি মোবাইল কোর্ট। ৩০টি অংশের প্রত্যেক অংশে সিটি কর্পোরেশনের ৫ জন পরিচ্ছন্নকর্মী সহযোগী হিসেবে ছিলেন।
এক মাস ধরে চলা জেলখাল পরিস্কারের প্রস্তুতি পর্ব সেরেছেন জেলা প্রশাসক। জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, এনজিও, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সাস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম, স্কাউট, গার্লস গাইড, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান প্রস্তুতি সভা করেছেন। নিয়েছেন সকলের কাছ থেকে মতামত। আবার প্রত্যেক গ্রুপ আলাদা আলাদা সভা করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, স্থানীয় তরুণদের সম্পৃক্ততায় সিটিজেন জার্নালিজম ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বরিশালের পরিবেশ উন্নয়নে এই কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। গণমাধ্যমের সহযোগিতা ও বরিশাল জেলা প্রশাসনের নব উদ্ভাবিত Barisal fb TV তে কার্যক্রমটির সরাসরি সম্প্রচার জনগণকে সুসংগঠিতকরণ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে।
স্থানীয় উদ্যোগে স্থানীয় সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বরিশাল জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগটি একটি মডেল হিসেবে ব্যবহৃত পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে স্থানীয় সমস্যা সমাধানের জন্য বরিশাল-সমস্যা ও সম্ভাবনা/ Barisal-Problem and Prospect শীর্ষক ফেসবুক গ্রুপ গঠন করা হয়। জনপ্রিয় এই ফেসবুক গ্রুপে জেলা প্রশাসক বরাবরে একটি পোস্ট দিয়ে বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি জনগণের সম্পত্তি জেলখাল অবৈধ দখলমুক্ত করে সচল করার উদ্যোগে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
খাল উদ্ধারে সংগ্রামী বরিশালবাসী আন্তরিকভাবে আগ্রহী হয়ে জেলা প্রশাসনের আহবানে সাড়া দিয়ে ফেসবুক গ্রুপে ব্যাপক সমর্থন জানান। চলতে থাকে ফেসবুক প্রচারণা। এরই ধারাবাহিকতায় সুশীল সমাজ, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, ব্যবসায়ীগণ, ছাত্র-শিক্ষক ও সর্বস্তরের জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণস্বাক্ষর কর্মসূচির মাধ্যমে এ অভিযানকে সমর্থন জানাতে থাকেন। এই জনসমর্থনে উজ্জীবিত হয়ে গত ২৫ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, দক্ষ সার্ভেয়ার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জেল খাল উদ্ধারের অভিযান শুরু করে প্রায় তিনমাসের অভিযানে কীর্তনখোলা নদী হতে নথুল্লাবাদ পুল পর্যন্ত সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বরিশাল জেল খালকে দখলমুক্ত করা হয়।
এই উদ্যোগটি নানা দিক থেকেই অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। স্বার্থ-সুবিধা-নগদপ্রাপ্তির সম্ভাবনা ছাড়া আমাদের দেশের মানুষ এক পাও নড়ে না-এমন একটা কথা আমরা সব সময়ই শুনি। অথচ একটি খাল উদ্ধার ও পরিস্কার করতে প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ নিঃস্বার্থ ভাবে হাত লাগিয়েছেন। তার মানে সামাজিক উদ্যোগ আমাদের দেশে এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যদি ঠিকঠাক মত ইস্যুকে সামনে আনা যায়, সাধারণ মানুষকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করা যায় তা হলে অসাধ্যও সাধন করা সম্ভব।
আরেকটি কথা আমাদের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তারা তাদের প্রথাগত গণ্ডীর বাইরে খুব একটা বের হন না। তারা অলস, ফাঁকিবাজ, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলেন, তারা দুর্নীতিপ্রবণ ইত্যাদি নানা অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। অথচ বরিশাল জেলা প্রশাসন জনস্বার্থে এত বড় একটা উদ্যোগের সমন্বয় সাধন করেছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। এই খালটি উদ্ধার করে তারা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এই খাল উদ্ধার অভিযানের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকের ইতিবাচক ব্যবহার। ফেসবুক যে কেবল ‘সময় নষ্ট’ করার একটি মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে-বরিশাল জেলা প্রশাসন তা-ই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। এ অভিজ্ঞতা একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। জেলা প্রশাসক বরিশাল শহরবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন-বরিশাল শহরকে ভেনিস নগরের মতো সুন্দর করে তোলা সম্ভব। মানুষ এই স্বপ্নকে বিশ্বাস করেছে, মনে ধারণ করেছে। সেকারণে এতে ব্যাপকসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্পৃক্ততা ও সমর্থন ছিল।
একই কারণে দ্রুত, মাত্র তিন মাসে এবং খুবই স্বপ্ল ব্যয়ে এ উদ্যোগ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রচারের মাধ্যম ছিল ফেসবুক। ফলে স্থানীয় তরুণরা খুব সহজে এবং আনন্দের সঙ্গে সিটিজেন জার্নালিজম করতে পেরেছে। সামাজিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের জন্যই ফেসবুকের কারণে আলোচনা-পর্যালোচনা করে প্রস্তুতি নেওয়াও সহজ হয়েছে। কার্যকর সিটিজেন জার্নালিজমের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে স্বীকৃতি মিলেছে জেলা প্রশাসন থেকে। ব্যাপকসংখ্যক নাগরিক সম্পৃক্ততার এটাও একটি বড় কারণ। সামাজিক উদ্যোগ হবার কারণে অভিযানটি রূপান্তরিত হয়েছিল একটি উৎসবে। একে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে একাধিক গান ও কবিতা।
স্থানীয় তরুণদের নেতৃত্ব এ অভিযানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। তাদের একটি বড় অংশ ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতিদিন সিটিজেন জার্নালিজম করে পুরো অভিযানের গুণগত মান বাড়াতে থাকে। জেলা প্রশাসন তাদেরকে স্বেচ্ছাব্রতী হয়ে সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এতে অভিভাবকরাও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। পরবর্তীসময়ে তারা তাদের সন্তানদের জেলা প্রশাসনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করতে উৎসাহ দিয়েছেন।
এই দৃষ্টান্ত সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। বরিশালের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা-উপজেলার সকল খাল, পুকুর পরিচ্ছন্ন ও অবৈধভাবে দখলমুক্ত করা হোক। সকল খাল-পুকুর হয়ে উঠুক শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। কেবল মানুষের বিনোদন নয়, এই সকল খালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠুক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। খালের পাশ দিয়ে তৈরি হতে পারে শহরকে যানজটমুক্ত করার বিকল্প পথ। দেশের বাকি ৬৩ জেলার জেলাপ্রশাসকগণ একইভাবে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করতে পারেন।
বরিশালের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসন ঘটিয়েছেন বরিশালের ইতিহাসের নয়া বিপ্লব। একইসঙ্গে প্রমাণ করেছেন জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই, জনসম্পৃক্ততাই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। সবচেয়ে বড় কথা পুরো কাজটি শাসনের লাঠি দিয়ে নয় সচেতনতার বাঁশি বাজিয়ে করা হয়েছে। বরিশালের বাঁশির সুর ছড়িয়ে পড়ুক সারা দেশে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







