‘আমার প্রায় ষাট বছরের বন্ধুকে আজকে এখানে অভিনন্দন জানাতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। সেই ১৯৬০ সাল থেকে আজ ২০১৭ সাল। এতোটা বছর আমরা একসাথে চলেছি, আলাপ-আলোচনা, যুক্তিতর্ক, পরিকল্পনা করেছি, জীবন পথে সঙ্গ দিয়েছি। আজও আমরা একসাথে আছি। এখনো আমি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তার সাথে পরিকল্পনা করি। আজ এমন একজন মানুষকে অভিনন্দিত করছি যার হাত ধরে এদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার শুভ সূচনা হয়। তিনি পাকিস্তানী শাসকদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ চিত্র নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন।’
অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানকে শুভেচ্ছা জানাতে উঠে এভাবে প্রশংসাবাণীতে ভাসান বন্ধু ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রেহমান সোবহানকে সংবর্ধনা দিয়েছে বাংলাদেশের শীর্ষ গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস ও দৈনিক বণিক বার্তা। কর্মময় জীবনে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহানের কর্মজীবন মূল্যায়ন করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, “তিনি ফোরাম নামে একটি পত্রিকা বের করেন, সেখানে পাকিস্তানের দুই অর্থনীতির তত্ত্ব প্রচার করে বাংলাদেশ (তখন পূর্ব পাকিস্তান) গরম করে তোলেন।” সেসময় অর্থমন্ত্রী ‘জাতি গঠন’ প্রক্রিয়ায় রেহমান সোবহানের অবদানের কথা তুলে ধরেন।
১৯৬০ সাল থেকে তার সঙ্গে পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে মুহিত বলেন, “৫৭ বছর আমরা মোটামুটিভাবে একইভাবে চিন্তাভাবনা করি। কিছু কিছু পার্থক্য হয়। এটা এমন বড় ধরনের কিছু না।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, “তিনি (রেহমান সোবহান) শুধুমাত্র অর্থনীতিবিদই নন। তিনি একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ, সামাজিক অর্থনীতিবিদ এবং জন ও গণ অর্থনীতিবিদ। তিনি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে কাজ করে যাচ্ছেন।”
ড. কামাল হোসেন বলেন, আমার সৌভাগ্য হলো যে রেহমান সোবহান আমার আশি বছরের বন্ধুই নয়, তিনি আমার মামাত ভাইও। তিনি সারা জীবন বৈষম্যমূলক অর্থনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। আজ এমন একজনকে অভিনন্দন জানাতে পারছি বলে ভালো লাগছে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ বলেন, ‘সোসালিস্ট’ ভাবাপন্ন রেহমান সোবহান ন্যায়বিচারের জন্য লড়েছেন। তার তুলনা তিনি নিজে।
অনুষ্ঠানে রেহমান সোবহানকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, রেহমান সোবহানের স্ত্রী রওনক জাহান এবং বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদসহ গুণীজনরা উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিদের পর বক্তব্য রাখেন রেহমান সোবহান। তিনি জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা স্মরণ করে রোমাঞ্চিত হন। বন্ধুত্বের কথা, কর্মময় জীবনের কথা, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কথা বলেন তিনি। তবে তার কথায় যে বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে সেটি হলো, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব। তিনি চান, বাংলাদেশে কোন বৈষম্য থাকবে না।
১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া রেহমান সোবহান ক্যামব্রিজ ও লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকসে লেখাপড়া করেছেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতির সময় তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্যমূলক অর্থনীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন রেহমান সোবহান। সামরিক শাসক এইচ এম এরশদের সময় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
পরে তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে রেহমান সোবহানের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নাজনীন আহমেদের সঞ্চালনায় পুরো অনুষ্ঠানটি প্রাঞ্চল হয়ে উঠে। সংবর্ধান ও বক্তব্য পর্ব শেষে মনকাড়া গান দিয়ে মন ভরিয়ে দেন সংগীত শিল্পী শামা রহমান।









