ভাঁড়ামো, কান্না-হাসি কিংবা একগুঁয়েমিতে পূর্ণ বাংলা নাটক। ভিউ সর্বস্ব প্রবণতায় আক্রান্ত পুরো নাট্যাঙ্গণ! সেখানে থাকে না কোনো গল্প। বাংলা নাটক নিয়ে এমন অভিযোগ নতুন নয়।
কিন্তু রঙঢঙের এই নাট্য মঞ্চে কেউ কেউ আছেন, যারা নিভৃতে দেখিয়ে চলেছেন জীবন ঘনিষ্ঠ গল্প, রোদে পোড়া-বৃষ্টিতে ভেজা এই শহরের গল্প, এই শহরের মানুষের জীবন ধারণের গল্প, যে গল্পের নায়ক এই শহরের খেটে খাওয়া বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। প্রতিনিয়ত এমন গল্প যারা দেখিয়ে চলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন তরুণ নির্মাতা সেরনিয়াবাত শাওন।
বছর কয়েক আগেও রাস্তায় রাস্তায় লিফলেট বিলি করা নারীদের দেখা পাওয়া যেত হরহামেশায়। কিন্তু গল্পে কিংবা নাটক-সিনেমায় কখনো গুরুত্বের সাথে ঠাঁই পায়নি সেইসব মানুষের গল্প। ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো লিফলেট বিলি করা নারীর গল্প নিয়ে নাটক নির্মাণ করে আলোচনায় আসেন সেরনিয়াবাত। এরপরও তার সব নাটকেই উঠে এসেছে এমন পেশার মানুষের গল্প। এবার এমন আরো বিচিত্র পেশাজীবীদের গল্প নিয়ে নাটক নির্মাণ করলেন সেরনিয়াবাত শাওন। নাটকের নাম ‘ভোল বদল’।
যেখানে উঠে এসেছে নতুন টাকা বিক্রি করা মতিন, কান পরিষ্কার করে সংসার চালানো আলতাফ, অর্থের বিনিময়ে রান্না করে মানুষকে খাওয়ানো মল্লিকার গল্প। যে নাটকে অভিনয় করেছেন দাপুটে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। শহীদুজ্জামান সেলিম, তাসনুভা তিশা, শ্যামল মাওলা ও শরিফুল ইসলামের মতো অভিনেতা আছেন। নির্মাতা জানান, এই নিন্মবর্গীয় চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব, সঙ্ঘাত ও ভালোবাসার গল্পই হলো ‘ভোল বদল’।
এই নাটকের শুটিং শেষ হয়েছে চলতি মাসেই। শুটিং হয়েছে গুলিস্তান ও পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়াতে। আসন্ন ঈদের দ্বিতীয় দিন রাত সাড়ে দশটায় মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে প্রচার হবে নাটকটি।
এই মুহূর্তে বাংলা নাটকে গল্পের চেয়ে ‘ভিউ কতো হলো?’-এই প্রশ্নটিই যখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন ভিউয়ের পেছনে কেন ছুটছেন না শাওন?
জানতে চাইলে তরুণ এই নির্মাতার সরল উত্তর: একটা অদ্ভুত ব্যাপার, আমার নাটক কিন্তু ভিউ হয় ই না, খুবই কম হয় এটা সত্য। আমার ‘লিফলেট’ নাটকের কিছু ভিউ হয়েছে কিন্তু সর্বশেষ যে নাটকটা করলাম ‘কষ্টিপাথর’, ওইটার ভিউ একেবারেই নাই। কিন্তু সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে আমার যে প্রোডিউসার বা যে চ্যানেল থেকে আমি কাজ করি তারা আমাকে অ্যাপ্রিসিয়েট করেন ভালো গল্পের ভিজ্যুয়াল নির্মাণে। বলেন গল্পের দিকে নজর দিতে। এই জায়গায় আমি মোটামুটি সৌভাগ্যবান এবং একইসঙ্গে অনুপ্রাণিত। আমিও গল্প দেখাতে চাই, ভিউ কতো হলো এই পথে আমি যেতেই চাই না। আমাকে তারা বলেছে ‘আপনি আপনার কাজটাই করেন’, ভিউ হোক কিংবা না হোক। এটা সত্যিই আমার জন্য অনেক বড় কমপ্লিমেন্ট!
কিন্তু আপনার কি জনপ্রিয় হতে ইচ্ছে হয় না? -প্রশ্নে শাওনের সোজাসাপ্টা উত্তর: না, আমার জনপ্রিয় হতে ইচ্ছা করে না। সংবাদমাধ্যম কিংবা যে কোনো ধরনের মিডিয়া এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আমি চাই আমার জনপ্রিয়তার চেয়ে আমার গল্পগুলো বেশী ফোকাস হোক। ডিরেক্টর বা রাইটারের চেয়ে তার কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় আমার।
‘লিফলেট’ থেকে শুরু করে আপনার টিভি ফিকশনগুলোর চরিত্র শহরের নিন্মবিত্ত মানুষেরা। এমন চরিত্র নিয়ে কাজ করার বিশেষ কোনো কারণ আছে? এমন প্রশ্নে শাওন বলেন: আমার কাজ না থাকলে আমি রাস্তায় ঘুরে বেড়াই, এটা আমার পুরনো অভ্যাস। প্রচুর মানুষ দেখি। যারা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিদিন ভিড় ঠেলে বাসে উঠি, প্রচণ্ড জ্যামে বসে আছি হয়তো তখন কোনো চরিত্র সামনে চলে আসে, তাদের নিয়ে গল্প লিখে ফেলি। আমার বেশির ভাগ গল্পই এই শহরের পাব্লিক বাসে জার্নি করতে করতে লেখা। আমার গল্পগুলো কোনো ফ্যান্টাসাইজ গল্প না, জীবন ঘনিষ্ঠ মানুষের গল্প।
নিজের বলা গল্প ও চরিত্র নিয়ে এই নির্মাতা বলেন, আমার চরিত্র বা গল্প আমদানি করা গল্প নয়। পৃথিবীর কোনো গল্প বা চরিত্রগুলোর সাথে এদের কোনো যোগ নেই। একশো বছর পরে দেখলেও সেই চরিত্রগুলো কিন্তু বাংলাদেশের কথাই মনে করিয়ে দেবে। পেশাজীবীদের নিয়ে আমি কাজ করতে ভালোবাসি। যে পেশাগুলো হয়তো ধীরে ধীরে একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু আমার নাটকে সেগুলো ডকুমেন্টেশন হয়ে থেকে যাবে, এমন ভাবনা থেকেই তাদের নিয়ে আমার গল্প। একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও আমার নাটকের চরিত্রগুলো সৃষ্টি।







