সকল আমেরিকান অভিবাসী মুসলমানদের মতোই ‘নাইন ইলেভেন’ রইস ভূঁইয়ার জীবনে এসেছিলো একটি কালো অধ্যায় হয়ে। শতাব্দীর আলোড়ন সৃষ্টিকারী নৃশংস ওই সন্ত্রাসী হামলার পর সাধারণ আমেরিকানরা অভিবাসী মুসলিমদের দেখছিলেন সন্দেহ আর ঘৃণার দৃষ্টিতে। রইস ভূঁইয়াও অঙ্গার হতে চলেছিলেন ওই ঘৃণার আগুনে। কিন্তু তার গল্পটা একটু ভিন্ন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিঃক্ষণ পার করে আসা রইস শেষ পর্যন্ত সমর্থ হয়েছিলেন আমেরিকানদের মনে অভিবাসী মুসলিমদের জন্য ভালোবাসার জন্ম দিতে।
সিলেট ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন রইস। এরপর তিনি স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে পfড়ি জমান তিনি। কিছুদিন নিউইয়র্কে থাকার পর ডালাসে চলে যান গ্যাস স্টেশনে চাকরি নিয়ে। পরবর্তী গল্পটা এখানেই: নাইন ইলেভেনের ১০ দিনের মাথায় কট্টরপন্থী শেতাঙ্গ আমেরিকান মার্ক স্ট্রোম্যানের ছোঁড়া গুলিতে আহত তিনি। তবে গ্রেপ্তার হন স্ট্রোম্যান। রইসকে গুলি করার আগে স্ট্রোম্যান আর দুই অভিবাসী মুসলিমকে হত্যা করেন। আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। কিন্তু মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে রইস নিজের হন্তারককে বাঁচানোর জন্য রাস্তায় নামেন। যা শুধু আমেরিকায়-ই নয় সাড়া জাগায় বিশ্বজুড়ে।
চ্যানেল আই অনলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রইস ভূঁইয়া বলছিলেন তার বদলে যাওয়া এবং অনেককে বদলে (মনুষ্যত্ববোধ জাগিয়ে তোলা) দেওয়ার গল্প। তিনি বিশ্বাস করেন: আমি যদি একজন মানুষকে শ্রদ্ধা করতে পারি, তাহলেই অন্যরা আমাকে ভালোবাসবে। এর মাধ্যমেই অবসান হবে ঘৃণার।
নিজের এই মতবাদ প্রচারে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ওয়ার্ল্ড উইদাউট হেট’ নামের একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অহিংসবাদ প্রচারে যাচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রইস বলেন: আমরা কাজ করছি, একজন মানুষকে ‘বেটার হিউম্যান বিইং’ বা ভালো মানুষ তৈরীর ক্ষেত্রে, যাতে সে নিজেকে আরও বেশি উন্নত করতে পারে। একইসঙ্গে আজকের চেয়ে কাল আরও ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ওয়ার্ল্ড উইদাউট হেট সংগঠনটি বিশেষ কোন ইস্যুর বদলে কাজ করছে মোটিভেশন নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে শুরুটা হলেও সংগঠনটির কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপেও। এ প্রসঙ্গে ওয়ার্ল্ড উইদাউট হেট চেয়ারম্যান বলেন: আমি আমার ধারণা নিয়ে কথা বলতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। অল ওভার ইউরোপ অ্যান্ড আমেরিকা। অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। যেটা কখনও ভাবিনি।
‘আমরা মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করছি ক্ষমা এবং সহানুভূতি শব্দগুলোর আসল মর্মার্থ কী। কিভাবে আমি বুঝতে পারবো, আমি একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমি মানুষকে পরিস্কার ধারণা দিতে চাই। আমাদের উদ্দেশ্য উৎসাহ দেওয়ার মধ্যদিয়ে মানুষকে সাহায্য করা। আমি যেন গতকাল থেকে আজ আরও ভালো হিউম্যান বিইং হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি।’
এসবের পাশাপাশি রইস কাজ করতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্পিকারের ভূমিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এমন ব্যাক্তিদেরই স্পিকার মনোনীত করে, যারা দেশটিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। স্পিকারদের কাজ হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে নির্দিষ্ট ইস্যুতে বক্তব্য তুলে ধরা। স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্পিকার হওয়াকে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন রইস।
তিনি বলেন: কিছুদিন আগে আমি ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে একটি কলাম লিখি। আমার লেখায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পেয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে তারা আমাকে ডাকে। আমি বলতে চেয়েছি: সকল সমস্যার মূল কারণ বের করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। নাহলে বিশ্বে যুদ্ধ-বিগ্রহ থামবে না। মানুষ হিসেবে মানুষকে গণ্য করতে শিখতে হবে, তবেই শান্তি আসবে। তারা আমার বক্তব্য পছন্দ করেছে। এখন আমাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়ে ইস্যু ভিত্তিক বক্তব্য তুলে ধরার জন্য।
বুধবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখে ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। বলেন: আপনি যখন মানুষের সঙ্গে শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করবেন, ঘৃণার জায়গাটা অনেক অংশে কমে যাবে।
প্রাপ্তির খাতাও বেশ ভারী তার। ২০১১ সালে স্কয়ার ম্যাগাজিনের স্টিভ জবস, ওয়ারেন বাফেটের মতো ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি ‘আমেরিকান অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন।

২০১৩ সালে বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ‘রিডার ডাইজেস্ট’ তাকে নিয়ে নিয়ে আর্টিকেল প্রকাশ করে। ২০১৪ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনের সাংবাদিক আনন্দ গিরিধারা দাস তাকে নিয়ে ‘দ্য ট্রু আমেরিকান: মার্ডার অ্যান্ড মার্সি ইন টেক্সাস’ শিরোনামে একটি বই রচনা করেন। এক সপ্তাহের মধ্যে এই বই হলিউডে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এরপর অনেক নামকরা নির্মাতা রইস ভূঁইয়ার গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করে। ‘দ্য ট্রু আমেরিকান’ নামে চলচ্চিত্রটি তৈরির কথা ছিল ক্যাথরিন বিগলোর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করছেন ‘জ্যাকি’ ছবি নির্মাতা পাবলো লারাইন। ২০১৮ সালে এই চলচ্চিত্র মুক্তির কথা রয়েছে।
এছাড়া একজন পরিচালক রইস ভূঁইয়াকে নিয়ে ৫ মিনিটের একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস ন্যাশনাল টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। ‘লাক অব মুসলিম’ শিরোনামে ১৫ পর্বের ওই ডকুমেন্টরিতে দেখানো হয়েছিল: সব মুসলমানই খারাপ নয়। সব ধর্ম কিংবা কালচারেই ভালো-খারাপ মানুষ রয়েছে। সিরিজটি প্রচারের পর আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এর মানসিকতা পরিবর্তনে প্রভাব রাখে।
এদেশের তরুণদের নিয়ে চরম আশাবাদী রইস। এ বিষয়ে তিনি বলেন: আজ যারা তরুণ, কাল তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে, পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে। আমাদের তরুণরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ব্যবহার করে বেটার ওয়ার্ল্ড তৈরীতে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আমাদের সময় শেষ পর্যায়ে। তোমরা ভালো একটি পৃথিবী তৈরিতে ভূমিকা রাখো। যত কষ্ট হোক না কেনো, আশা ছেড় না।








