পরিস্থিতির শিকার হওয়ার কারণে কথিত ভারতীয় গুপ্তচর হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে পাকিস্তানের
করাচিতে ১৫ বছর কারাভোগ করা বাংলাদেশী নাগরিক মোসলেমউদ্দিন সরকার (৫৬)
বৃহস্পতিবার মারা গেছেন। তেইশ বছর নিখোঁজ থাকার পর চার বছর আগে বাংলাদেশে ফিরে আসতে পেরেছিলেন
মোসলেমউদ্দিন।
তার ভাই জুলহাসউদ্দিন মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করে মার্কিন সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-কে বলেন, তিনি ডায়াবেটিক এবং কিডনি রোগ ও সম্প্রতি শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। পাকিস্তানে কারাভোগ তাকে শারীরিকভাবে খুব দুর্বল করে দিয়েছিল।
জুলহাসউদ্দিন আরও বলেন, আমরা ধরেই নিয়েছিলাম ভাই মারা গেছেন। কিন্তু, আমাদেরকে এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ফোন দিয়ে জানান, তিনি পাকিস্তানে আছেন। ২০১২ সালে বাড়ি ফিরলে আমরা তাকে দেখে বিস্মিত হই। তিনি ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজনকে ফিরে পেয়ে খুশীতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। মাকে দেখার জন্য খুব অস্থির ছিলেন।
আর ২৩ বছর অপেক্ষার পর ছেলেকে ফিরে মা বলেছিলেন, তিনি জীবনের সেরা উপহার পেয়েছেন। পরে তার মা মৃত্যুবরণ করেন।
মোসলেমের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামে। ১৯৮৯ সালে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন তিনি।
নিরুদ্দেশ হ্ওয়ার পর বেশ কিছুদিন তিনি নয়া দিল্লীতে ছিলেন। এরপর ছিলেন মেঘালয় এবং আসামে। সেখান থেকে আবার দিল্লী ফিরে গিয়ে একজনকে বিয়ে করে বস্তিতে থাকা শুরু করেন। কিন্তু, কিছুদিন পর তার ভারতীয় স্ত্রী তাকে ছেড়ে গেলে তিনি জীবিকার সন্ধানে পাকিস্তানের দিকে চলে যান।
১৯৯৭ সালে পাকিস্তানি সীমান্তরক্ষীরা তাকে সীমান্তের কাছ থেকে আটক করে। পরে ভারতীয় গুপ্তচর সন্দেহে পাকিস্তানের করাচি কারাগারে পাঠানো হয় তাকে।
যেভাবে দেশে এবং মায়ের কাছে ফিরেছিলেন মোসলেমউদ্দিন
২০১২ সালের আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক সংস্থা রেড ক্রস তাকে নিরাপদে দেশে ফিরতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এপি’র ঢাকা ব্যুরো চিফ জুলহাস আলম। মোসলেমউদ্দিন এবং সাংবাদিক জুলহাসের জন্ম একই গ্রামে।
জুলহাস আলম বলেন: মোসলেমউদ্দিন ২৩ বছর নিখোঁজ ছিলেন ভারত ও পাকিস্তানে। পাকিস্তানের জেলে কাটিয়েছেন ১৫ বছর। সবাই জানতো উনি বেঁচে নেই। একটা বেনামি ফোনের বরাতে আমি ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দ্যা রেড ক্রস (আইসিআরসি) এর রোকসানা জাহানকে তার নিখোঁজের খবর জানাই। বিষয়টি দেখতে অনুরোধ করি তাকে।
‘কারো কাছে তেমন কোন ক্লু ছিলো না। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে আমাকে অবাক করে দিয়ে রেড ক্রসের পাকিস্তান অফিস খোঁজ পায় তিনি করাচি জেলে আটক। পরিবারের অপেক্ষা আর শেষ হয় না। তার বৃদ্ধা মায়ের আহাজারি ছিল কবে ফিরবে তার হারিয়ে যাওয়া ছেলে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো ২০১২ সালের আগস্ট মাসে। রোকসানা নিজে সাথে করে নিয়ে তাকে মায়ের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আসলেন আমার প্রিয় বিষ্ণুপুর গ্রামে গিয়ে। আমার শিক্ষক বাবা উপস্থিত থেকে বুঝে নেন
তাকে,’ এভাবেই মোসলেমউদ্দিনের ফেরার গল্প জানান সাংবাদিক জুলহাস আলম।
সেসময় তিনি তাকে নিয়ে একটি ফিচার লিখেছিলেন যা অনেক দেশে গুরুত্বপূর্ণ খবর হিসেবে প্রকাশিত হয়। তার মৃত্যুর খবরও জুলহাসের মাধ্যমে জেনেছে সারাবিশ্ব।
মোসলেমউদ্দিনের আপন ভাই’র নাম জুলহাস। আবার যে মানুষটি সাংবাদিকতার সাধারণ দায়িত্বের বাইরে গিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে একরকম নতুন একটা জীবন দিয়েছিলেন তার নামও জুলহাস, জুলহাস আলম।
তিনি বলেন: ফোন পেলাম মোসলেম মারা গেছেন কিছুক্ষণ আগে। তার ছোট ভাই ফোন করে কাঁদছিলেন। আমারও চোখ ভিজে গেলো। রোকসানাকে ফোন করে জানালাম। টেলিফোনের এ প্রান্ত থেকে বুঝতে কষ্ট হলো না রোকসানা কাঁদছেন। কখন কোথায় কার সাথে কিভাবে বন্ধন হয় মানুষের, সে এক অদ্ভুত খেলা। ধন্যবাদ ইন্টারন্যাশনাল কমিটি ফর রেড ক্রস।







