যেকোন প্রত্যর্পণের অনুরোধকে গোপনীয় এবং আান্তঃরাষ্ট্র যোগাযোগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে নূর চৌধুরীর প্রত্যর্পণ নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য দিতে বা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি কানাডার বিচার মন্ত্রণালয়।
‘প্রত্যর্পণ অনুরোধ গোপনীয় ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগের বিষয়, সম্ভাব্য কোন মামলার বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে পারি না,’ বলে চ্যানেল আই অনলাইনকে জানিয়েছেন ডিপার্টমেন্টঅফ জাস্টিস কানাডার গণমাধ্যম সম্পর্কিত ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা ইয়ান ম্যাকলিওড।
কানাডার বিচার মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো চ্যানেল আই অনলাইনের সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খানের ই-মেইলের জবাবে তিনি আলাদাভাবে প্রত্যর্পণ সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট আইনের একটি কপি পাঠালেও তার ই-মেইলে সুস্পষ্টভাবে একটি ধারার কথাও উল্লেখ করেছেন।
‘এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ’ মন্তব্য করে তার মেইলে ঊর্ধ্বতন ওই উপদেষ্টা ‘প্রত্যর্পণ আইন’-এর ৪৪(২) ধারার পুরোটাই জুড়ে দিয়েছেন। তার ই-মেইলে উল্লেখ করা ৪৪(২) ধারায় আছে:যাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে অনুরোধ তাকে যদি (যে দেশে প্রত্যর্পণ করা হবে সে দেশে) মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়ে থাকে তাহলে (বিচার) মন্ত্রী তার প্রত্যর্পণের অনুরোধটি নাকচ করে দিতে পারেন।
চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে পাঠানো কানাডা সরকারের তথ্যে দেখা যায়, প্রত্যর্পণের বিষয়টি বিচার বিভাগীয় শুনানীর মাধ্যমে সুরাহা হয়। তবে, ওই শুনানীতে কাউকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া হলে তা নির্বাহী বা মন্ত্রী পর্যায়ে আসে। কেনো একজনকে প্রত্যর্পণ করা হবে না মন্ত্রীর কাছে সে যুক্তি উপস্থাপন করা যায়। সেখানে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত হলে কিংবা প্রত্যর্পণ আদালত প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত দিলে তার বিরুদ্ধে আপিল আদালতে আপিল করা যায়। এরকম বিভিন্ন পর্যায় শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় কানাডার সুপ্রিম কোর্টে।
প্রত্যর্পণের এরকম প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো জানানোর পাশাপাশি বিচার মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা ইয়ানম্যাকলিওড জানিয়েছেন, নূর চৌধুরী কানাডায় কোন ধরনের বিচারের মুখোমুখি হবে কিনা সে বিষয়ে কোন ধারণা করা ঠিক হবে না।
তবে, নূর চৌধুরীর কানাডায় অবস্থান এবং সেখানে তার ‘স্ট্যাটাসের’ বিষয়ে জানার জন্য বিষয়টি তিনি দেশটির ইমিগ্রেশন, রিফিউজি এন্ড সিটিজেনশিপ বিভাগে পাঠিয়ে দেন।
নূর চৌধুরীর সম্মতির অপেক্ষায় কানাডার অভিবাসন বিভাগ
বিচারবিভাগের চিঠি পেলেও নূর চৌধুরী কীভাবে নাগরিক না হয়েও বছরের পর বছর কানাডায় অবস্থান করছে অর্থাৎ তার বর্তমান ‘স্ট্যাটাসের’ বিষয়ে কিছু বলতে চায়নি কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী এবং নাগরিকত্ব বিভাগ।
বিভাগটির মুখপাত্র/ গণমাধ্যম উপদেষ্টা লিসা ফিলিপস চ্যানেল আই অনলাইনকে পাঠানো এক ই-মেইলে জানান, নূর চৌধুরীর কানাডায় অবস্থানের বিষয়টি তাদের আওতাধীন। ‘কিন্তু, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে তার (নূর চৌধুরীর) সম্মতি ছাড়া এ বিষয়ে কিছু জানানো সম্ভব নয়।’
নূর চৌধুরীর সম্মতি পেতে কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী এবং নাগরিকত্ব বিভাগ অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে তার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। এ বিষয়ে তারা গণমাধ্যমকে তথ্য জানাতে পারবে কিনা তার কাছে জানতে চেয়েছে।
চ্যানেল আই অনলাইনের ই-মেইল পাওয়ার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তারা নূর চৌধুরীর কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠায় আর এর চেয়েও কম সময়ের মধ্যে কানাডার দুটি সরকারি দপ্তরই চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে তাদের অবস্থান পরিস্কার করে।
প্রক্রিয়া শুরুর অপেক্ষায় বাংলাদেশ
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরাসরি গুলি করা বরখাস্ত মেজর এসএইচএমবি নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে, গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানাডা সফরের সময় বিষয়টি আরো জোরেশোরে আলোচিত হয়।
কর্মকর্তারাজানান, কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। সেখানেএ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে একমত হয় দু’ পক্ষ।
বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করছেন, এ প্রক্রিয়া মানে তাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া নয়। বরং প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আলোচনার প্রক্রিয়া যা শেষ পর্য়ন্ত নূর চৌধুরীর বর্তমান অবস্থান কানাডার আইন এবং সর্বোচ্চ আদালত দ্বারা নির্ধারিত হবে।
তারা বলেন, সরাসরি প্রত্যর্পণের আশ্বাসের বদলে শুধু প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি ঠিক হওয়ার কারণেই সম্ভবতঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নূর চৌধুরীর প্রত্যর্পণের জন্য প্রবাসীদের জনমত গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে উন্নত দেশগুলো খুনিদের আশ্রয়স্থল হবে কিনা সেই প্রশ্নও তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি গুলি করেছিলো মেজর নূর
এই মেজর নূরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরাসরি গুলি করেছিলো। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’ বইয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের বরাতে সেই বক্তব্য উঠে এসেছে।
চ্যানেল আই অনলাইনের সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খানের লেখা ‘বঙ্গবন্ধুহত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’ বইয়ে বঙ্গবন্ধুহত্যা মামলার সাক্ষীদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, মেজর নূর এবং মেজর হুদা সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করেছিলো। বরখাস্ত মেজর বজলুল হুদাকে নিম্নআদালতে রায় ঘোষণার দিন থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে অন্য চার খুনির সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় তার।
মামলার সাক্ষী এবং ওইদিন ৩২ নম্বরের নিরাপত্তারক্ষী সেনাবাহিনীর তখনকার হাবিলদার কুদ্দুস তার সাক্ষ্যে বলেছেন: মেজর মহিউদ্দিন তার ল্যান্সারের ফোর্স নিয়ে গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দোতলার দিকে যায়। পরে কয়েকজন ফোর্স নিয়ে দোতলার দিকে যায় ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর। যাবার সময় তাদেরকেও পেছন পেছন যেতে হুকুম দেয়। ক্যাপ্টেন হুদা এবং মেজর নূর যখন সিঁড়ির চৌকির ওপরে, তখন আগেই দোতলায় যাওয়া মেজর মহিউদ্দিন ও তার ফোর্স বঙ্গবন্ধুকে নিচের দিকে নামিয়ে আনছিলো। মেজর নূর ইংরেজিতে কিছু বললে মেজর মহিউদ্দিন এবং তার ফোর্স একপাশে চলে যায়। এই সময় বঙ্গবন্ধু বলেন, তোরা কি চাস? সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেন হুদা এবং মেজর নূর স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। সিঁড়ির ওপর লুটিয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু, সেসময়ই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ওসমানী ও জিয়ার এডিসি ছিলো মেজর নূর
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বাদী এবং বঙ্গবন্ধুর রেসিডেন্ট পিএ মুহিতুল ইসলাম আদালতকে জানিয়েছিলেন, মেজর (বরখাস্ত) নূর জেনারেল ওসমানীর এডিসি ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ১২ নম্বর থিয়েটার রোডে জেনারেল ওসমানীর অফিসে মেজর নূরের সঙ্গে শেখ কামালের পরিচয় হয়।
মুক্তিযুদ্ধের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের এডিসি হিসেবেও কাজ করেছে মেজর নূর। পরে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে মেজর ডালিম, মেজর নূর ও আরো কয়েকজনের চাকরি চলে যায়।
তবে, জিয়ার সঙ্গে যেনূরের এরপরও যোগাযোগ ছিল তারও প্রমাণ আছে ‘বঙ্গবন্ধুহত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’ বইয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, তখন ঢাকার স্টেশন কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল হামিদ। সাক্ষী হিসেবে আদালতকে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সনের ১৪ আগস্ট বিকেলে টেনিস খেলার সময় লক্ষ্য করেন যে, চাকুরিচ্যুত মেজর ডালিম ও মেজর নূর টেনিস কোর্টের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। এটা তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। খেলা শেষে তিনি মেজর নূরকে জিজ্ঞেশ করেন, তোমরা কার অনুমতি নিয়ে এখানে খেলতে আসো? জবাবে নূর জানায়, তারা জেনারেল জিয়ার অনুমতি নিয়ে খেলতে আসে।’
৯৬ থেকে পলাতক মেজর নূর
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর নূরসহ অন্য খুনিদেরকে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে চাকরি দেয়া হয়েছিলো। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত নূরকে দেশে ডেকে পাঠানো হয়। কিন্তু, দেশে না ফিরে সে পালিয়ে যায়। পরে চলে যায় কানাডায়। সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে বেশ কয়েকবার আবেদন করলেও তা প্রত্যাখান করে কানাডা রিফিউজি বোর্ড।









