যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ট্রাক হামলায় নিহত আট জনের মধ্যে ৫ জন আর্জেন্টাইন। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কাছে সাইকেল চালানোর পথে ট্রাক তুলে হামলার এ ঘটনায় আহত হন আরও ১১ জন। একজন উজবেক অভিবাসীকে এই হামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে।
নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রিও কুয়োমো সিবিএস’কে জানান: হামলা চালানো ট্রাকে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। সেখানে লেখা, ‘আইএসের (ইসলামিক স্টেট) পক্ষ থেকে এ হামলা।’
সন্দেহভাজন সাইফুল্লা হাবিবুলেভিক সাইপোভ ট্রাক থেকে বেরিয়ে আসার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই উগ্রপন্থায় দিক্ষীত হয়েছেন বলে জানান কুয়োমো।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেলে লোয়ার ম্যানহাটনে এ ঘটনা ঘটে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর এটাই নিউইয়র্কের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
আক্রান্তদের পরিচয়
৫ জন আর্জেন্টিনার নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর্জেন্টিনার গণমাধ্যম জানায়, তারা নয়জন বন্ধুর গ্রুপের একটি অংশ, যারা আর্জেন্টিনার রোজারিও-র পলিটেকনিক কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার ৩০ তম বার্ষিকী উদযাপনের জন্য এসেছিলেন।

নিহতদের একজন স্টিল ফার্মের মালিক অ্যারিয়েল এরলিজ বন্ধুদের ভ্রমণের অর্থায়ন করেন বলে স্থানীয় একটি পত্রিকা জানায়।
নিহতদের সবাই ৪৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মধ্যে। এদের নাম হার্নান ডিয়েগো মেনডোজা, ডিয়েগো এনরিক অ্যাঞ্জেলিনি, আলেজান্দ্রো ডামিয়ান পাগনুক্কো, অ্যারিয়েল এরলিজ এবং হার্নান ফেরুক্কি। অপর একজন বন্ধু লুডোভিকো ম্যারো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
রোজারিওতে তিনদিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
বেলজিয়ান গণমাধ্যম জানায়, দেশটির ফ্ল্যান্ডার্স প্রদেশের স্ট্যাডেন গ্রামের অধিবাসী দুই সন্তানের মাও (৩১) এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন। কিন্তু তার স্বামীর অনুরোধে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। এছাড়াও আরও তিনজন বেলজিয়ান আহত হয়েছেন হামলায়।
অপর দুই আক্রান্তের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
হামলা পরিচালনা
নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি) কমিশনার জেমস ও’নেইল বলেন, স্থানীয় সময় বেলা ৩টার দিকে হোম ডিপো নামের দোকান থেকে ভাড়া করা ট্রাক নিয়ে সাইফুল্লাকে ব্যস্ত ম্যানহাটনের পশ্চিম দিক থেকে বাইক লেনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এরপর সে সাইকেল আরোহী ও পদচারীদের উপর হামলা করে। পরে ট্রাকটি একটি স্কুল বাসে আঘাত করে থেমে যায়। সেই বাসে থাকা শিশুসহ দুইজন আহত হয়।
হামলার পর একটি খেলনা বন্দুক দেখিয়ে স্থান ত্যাগ করার সময় ট্রাক চালককে আটক করে পুলিশ। পুলিশের গুলিতে আহত হলে তাকে পুলিশি হেফাজতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, একটি সাদা পিকআপ ট্রাক দ্রুত গতিতে এসে সাইকেল চালানোর রাস্তায় সাইকেল চালকদের ওপর দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে ট্রাকটি চালিয়ে দেয়। এসময় নয় থেকে দশ রাউন্ড গুলির শব্দও শোনা গেছে বলেও জানায় তারা।
সন্দেহভাজনের পরিচয়
ওহাইওর বাসিন্দা দিলফুজা ইসখাকোভা গার্ডিয়ানকে বলেন, ছয় বছর আগে উজবেকিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর সাইফুল্লাহ কয়েক মাস তার এখানে ছিলেন। তাকে ভালোই মনে হয়েছিল। তিনি মৃদুভাষী ছিলেন, তেমন কথা বলতেন না। কাজে যাওয়া-আসার মধ্যেই তার চলাফেরা ছিল। তিনি সম্ভবত পণ্যের গুদামে কাজ করতেন।
দিলফুজা বলেন, সাইফুল্লার সঙ্গে যখন তার পরিচয়, তখন তিনি গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন। তার স্ত্রী ও ছোট দুটি সন্তান আছে বলে তিনি জানেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। সাইফুল্লা ধার্মিক ছিলেন কি না, সেটা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
তার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার মতো তিনিও উজবেকিস্তান থেকে এসেছেন। তার বাবা আমার স্বামীকে চিনতেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কাউকে চিনতেন না বলে তার বাবা এখানে পাঠিয়েছিলেন।’ এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, এখান থেকে সাইফুল্লা ফ্লোরিডায় চলে যান। সেখানে তিনি ট্রাকচালক হিসেবে কাজ করতেন। পরে নিউজার্সিতে গিয়ে তিনি উবার চালাতেন।
কবিলজন মাকারোভ (৩৭) নামের এক উজবেক অভিবাসী নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘সাইফুল্লাহ যখন ট্রাক চালক হিসেবে কাজ করছিলেন তখন ফ্লোরিডায় তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তাকে তখন ভালো মানুষই মনে হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পছন্দ করতেন। তাকে খুশিই মনে হয়েছিল। জানিয়েছিলেন, সবকিছু ঠিকঠাকই আছে। তাকে সন্ত্রাসী মনে হয়নি। তবে তার ভেতরে কী ছিল, সেটা আমি জানি না।’
পুলিশ রেকর্ডে দেখা যায়, এর আগে গত বছর সাইফুল্লা মিসৌরিতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ট্রাফিক জরিমানার কারণে।
উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, এই হামলার তদন্ত সাহায্য করতে তার দেশ সকল শক্তি ও সম্পদ ব্যবহারে প্রস্তুত। তবে উজবেক কর্তৃপক্ষ এখনও হামলাকারীর পরিচয় বা জাতীয়তা নিশ্চিত করেনি।
প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারে হামলাকারীকে ‘খুবই অসুস্থ ও বিকারগ্রস্থ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন: ‘মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যত্র আইএসকে (ইসলামিক স্টেট) পরাজিত করার পর আমরা কখনোই তাদের আমাদের দেশে ফিরতে, বা প্রবেশ করতে দিবো না। যথেষ্ট হয়েছে!’
অভিবাসীদের যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার ইঙ্গিত দেন তিনি।
কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা বলে অভিহিত করেছেন নিউ ইয়র্ক মেয়র বিল দ্য ব্লাসিও। তিনি বলেন: আমরা জানি এই হামলা আমাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা এও জানি নিউইয়র্কবাসী শক্ত আছে। নিউইয়র্কবাসী প্রাণবন্ত। সহিংসতা দ্বারা আমদের চেতনা ভেঙে দেওয়া যাবে না।
এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে অভিহিত করে ম্যানহাটনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এফবিআইয়ের নেতৃত্বে যৌথ টাস্কফোর্স ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।









