দীর্ঘদিন রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে থাকা খালেদা জিয়াকে ফেনী হামলা রাজনীতিতে ফিরিয়ে এনেছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম অভিমুখে গাড়িবহর আর দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্ধুব্ধ করেছে। পুলিশি ভয়কে উপেক্ষা করে লক্ষ কর্মী-সমর্থক পথে নেমেছে। বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের দেখতে যাওয়ার নামে দলীয় শোডাউন করেছে বিএনপি। হাজার মাইল অতিক্রম করা খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে স্বাগত জানাতে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমেছিল। বিশাল এ জনসমাগমের মাধ্যমে বিএনপি নেতাকর্মীরা হৃত আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে পেয়েছে অনেকখানি। এই আত্মবিশ্বাস কেবল গাড়িবহর অতিক্রম করা অঞ্চলের নেতাকর্মীদের উদ্ধুব্ধ করে নি সারাদেশের নেতাকর্মীদের মধ্যেও তা সঞ্চারিত হয়েছে।
কয়েক মাস আগে খালেদা জিয়া যখন চিকিৎসার জন্যে লন্ডন গেলেন তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতা দাবি করেছিলেন তিনি আর ফিরবেন না। তাদের ওই বক্তব্যের পেছনের সত্যতা ছিল না মোটেও, ছিল কেবল মিডিয়ায় শিরোনাম হওয়ার উদগ্র বাসনা। খালেদা জিয়া বিদেশ সফরে যাওয়ার সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকেও জানানো হয়নি কবে ফিরবেন তিনি। তাই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এনিয়ে অনেকখানি জল ঘোলা করেছিল। তারপর চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার দিন বিশাল শোডাউন করেছিল দলটি। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থক দলীয় চেয়ারপার্সনকে স্বাগত জানিয়েছিল।
বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধাপ্রাপ্ত এবং রুটিন সংবাদ সম্মেলনের বাইরে দলীয় কোন কর্মসূচি না থাকা দলটির এমন শোডাউন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার খোরাক যুগিয়েছে। এই শোডাউন আওয়ামী লীগের বাইরে বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি ফের প্রমাণ করেছে। খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাতে যাওয়া দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢল খোদ আওয়ামী লীগকেও যে নাড়া দিয়েছে সে প্রমাণ পাওয়া যায় দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কথায়। ওবায়দুল কাদের ওই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন নিউ ইয়র্ক সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে যত লোক গিয়েছিল খালেদা জিয়ার স্বাগত জানাতে নাকি তার দশভাগের একভাগও হয় নি। ওবায়দুল কাদেরের এই দশভাগের একভাগ তত্ত্ব সংখ্যা পরিমাপের সূচক আদতে নয়, এটা বিশাল ওই লোকসমাগম আওয়ামী লীগকেও যে নাড়া দিয়েছে তার সবিশেষ প্রমাণ। তুলনামূলক প্রসঙ্গ টানা ক্ষমতাসীন দলটি উদ্বেগের চিহ্নও বটে। কারণ জাতীয় নির্বাচনের খুব বেশি দেরি নেই, আর আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বি দেশে একমাত্র বিএনপিই; জাতীয় সংসদে এরশাদের জাতীয় পার্টির মত যতই স্মারক বিরোধি দল থাকুক না কেন।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের উদ্দেশে খালেদা জিয়া সড়কপথে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গেছেন। দীর্ঘ এই সফর রোহিঙ্গাদের নামে পরিচালিত হলেও আদতে এটা ছিল রাজনৈতিক এক সফর। দলকে রাজনৈতিকভাবে চাঙ্গা করার পাশাপাশি ফেনীতে তার গাড়িবহর হামলার মুখে পড়ার কারণে সারাদেশে এ সফরের কথা প্রচার হয়েছে। ক্ষমতার বাইরে থাকা যেকোনো রাজনৈতিক দলের কোন কর্মসূচি বাধাপ্রাপ্ত হলে স্বাভাবিক দোষ পড়ে সরকারের ওপর। হামলার খবর প্রচারের সাথে সাথেই সেটা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওপর গিয়ে পড়েছে। বিএনপি স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগ করেছে সরকারি দল কর্তৃক হামলার; আওয়ামী লীগ এটাকে অস্বীকার করে বলছে বিএনপি নিজেরাই এহামলা করেছে। এনিয়ে দুই দলের কথন-প্রিয় রাজনীতিবিদরা মিডিয়া গরম করে চলেছেন।
আওয়ামী লীগ কর্তৃক হামলা, বিএনপি কর্তৃক নিজেরাই হামলা বা তৃতীয় কারও থেকে হামলা- ঘটনা যাই ঘটুক না কেন এটা নিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে। বিএনপি দেশে রাজনীতি করতে পারছে না, তাদেরকে রাজনীতিতে বাধা দেওয়া হয়- এমন এক প্রচারণা ও আংশিক সত্যতার বিপরিতে দায় গিয়ে পড়ে সরকারের ওপর। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ হামলা করলে, অথবা বিএনপি নিজেরাই নিজেদের কর্মসূচিতে হামলা করে সরকারের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতি করলে সরকার ও পুলিশের এনিয়ে ভূমিকা থাকা উচিত। পুলিশ এনিয়ে কথা বলবে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে- ঘটনার পূর্বাপর অনুসন্ধান শেষে দোষিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে, এটাই ত কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু সেটা না হয়ে হলো রাজনীতিবিদদের রাজনীতি; আওয়ামী লীগ-বিএনপির দায় ঠেলাঠেলির চেষ্টা।
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সাংবাদিক পয়েন্টে হামলার ঘটনায় এহামলা মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছে দ্রুত। হামলা যেই করুক না কেন খালেদার গাড়িবহর আক্রান্ত হওয়ার কারণে পাবলিক সেন্টিমেন্ট বিএনপির পক্ষেই গেছে। পাবলিক সেন্টিমেন্টকে আরেকটু বিএনপির দিকে ঠেলে দেওয়ার কাজটাও করেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের থেকে শুরু করে মাহবুব-উল-আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ সহ অপরাপর নেতারা। বিএনপির অভিযোগের জবাবে পালটা অভিযোগ ও জবাব দিতে গিয়ে পুরো বিষয়টিকে রাজনীতির আবর্তে নিয়ে গেছেন তারা। অথচ এটা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; ছিল ক্রিমিনাল অফেন্স।
এধরনের হামলার ঘটনায় কথা বলার দায়িত্ব স্থানীয় পুলিশের। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান ও দেশেবিদেশে এই হামলার ঘটনা প্রচারের কারণে পুলিশের আইজিপি একেএম শহিদুল হক কথা বলার উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল হিসেবে বলতে পারতেন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ওবায়দুল কাদের, মাহবুব-উল-আলম হানিফ কিংবা হাছান মাহমুদরা দলীয় পদ-পদবীতে আসাদুজ্জামান খান কামালের উচ্চপর্যায়ে থাকলেও তারা ক্রিমিনাল অফেন্সের ব্যাপারে কথা বলার যোগ্যতা রাখেন না। এটা একান্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কিত বলে সরকারি পদক্ষেপ ও ব্যাখ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে আসাদুজ্জামান খান কামালই যথাযথ ব্যক্তি।
এদিকে ফেনী হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ২৫-৩০জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে মামলা করেছে। প্রশাসন এ নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে- এটা শুভ সংবাদ।
সরকার ও দল দুই ভিন্ন প্রপঞ্চ। এ দুইকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা উচিত। সরকারি কর্মসূচি, কার্যবিধি আর দলীয় কর্মসূচি-কার্যবিধির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এগুলোকে সচেতনভাবে মানা না হলে আখেরে দুইয়েরই ক্ষতি। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের ওপর হামলার ঘটনার পর আওয়ামী লীগের অতি-উৎসাহী কথনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের কারণে ফের প্রমাণ হলো।
ফেনী হামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পরস্পরবিরোধি অভিযোগ পালটা অভিযোগের প্রেক্ষিতে সারাদেশ জেনেছে খালেদা জিয়ার ওপর হামলা হয়েছে; আর এধরনের হামলার ঘটনায় সত্য-মিথ্যা যাই থাকুক না কেন প্রথম সন্দেহের মধ্যে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলই পড়ে। বিএনপির অভিযোগ ও আওয়ামী লীগের পালটা অভিযোগ আর জবাবের কারণে পুরো বিষয়টি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে জল যত ঘোলা হবে লাভ হবে বিএনপিরই। বিএনপি সে লাভই ঘরে তুলছে। ফেনী হামলা সম্ভবত বিএনপির রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথই দেখিয়ে দিচ্ছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








