পরিবারে কন্যা শিশুর প্রতি প্রত্যাশা করার মধ্য দিয়ে নারীকে মানুষ হিসেবে তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া উচিৎ। এরপর আসে ভূমিকা পালনের বিষয়টি। আমি এ যাবৎ ছাত্রনিবাসে বসবাসকারী এবং গার্মেন্টস এর কর্মজীবী মেয়েদের ছাড়া কোন কমবয়সী মেয়েকে কাঁচা বাজারে যেতে দেখিনি।
বাবা মা মেয়েটিকে ব্যাংকের কাজে, বিল দেয়ার কাজে, ট্রেনের টিকিট কাটতে, ছোট ভাইকে স্কুলে নিয়ে যেতে বা বয়োজ্যেষ্ঠদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার দায়িত্ব দেন না। শেয়ার বাজার? প্রশ্নই উঠে না। পরিবারের আর্থিক বা অন্য কোন বিষয়ে মেয়েদের সিদ্ধন্ত চাওয়া বা নেয়া হয় না। এ দায়িত্বগুলো প্রায়োগিক অর্থে ছেলেদের এবং এগুলো তারাই পালন করে।
মেয়েদের কাজ সীমাবদ্ধ থাকে স্কুল কলেজে যাওয়া আসায় (সেখানে মা বা বাবা তার সঙ্গে থাকেন) ছোট ভাইবোনকে দেখাশোনা করা, অসুস্থ সদস্যদের সেবা করার মধ্যে। কিন্তু তথাকথিত পুরুষালী দায়িত্বগুলো যদি কোনদিনও নারীদের না করতে হতো তাহলে ব্যাপার ছিল না। কিন্তু নারীদেরকে সংসার জীবনে এ কাজগুলো করতে হয়, করা উচিত। অনেকেই তখন এ দায়িত্বগুলো নেয়ার সাহস করে উঠেন না। করতে হলে তার অদক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবটি সবাই বুঝতে পারে। সে সঙ্গত কারণে পুরুষের উপর নির্ভর করে।
এমনকি পরিবারের সবচেয়ে ছোট পুরুষ সদস্যটিও নারীর এ অদক্ষতায় মুখ টিপে হাসে। অথচ এর কোন কারণ নেই। সমাজের অনেক উচ্চপদ্স্থ পদে নারী রয়েছেন। তারা ঐশী ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন নারী নন। উপযু্ক্ত ভূমিকা পালন শিক্ষা দেয়া হলে নারী তার সকল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে কোন নির্ভরশীলতা ছাড়াই।
নারীর মানসিক প্রস্তুতির অভাব ও প্রশিক্ষিত না হয়ে উঠর ফলাফল শুধু তার জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে এমন নয়। এটি পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি নেতিবাচক অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে ওঠে । যে পরিবারের মেয়ে সদস্যটি তার মাকে, বোনকে ভাবিকে বা বয়োজ্যেষ্ঠ কোন নারী সদস্যদের যোগ্য, আত্মনির্ভর এবং আত্মবিশ্বাসী দেখে না তার স্বাভাবিকভাবেই অনুকরণীয় আদর্শ খুঁজে পায় না।
ফলে মাতৃজাতির প্রচলিত ভূমিকাটিকে তার অনুকরণ করতে থাকে। একটি মেয়ে শিশু যখন পুতুল নিয়ে খেলে তখন লক্ষ করলে দেখা যায়, সে মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করছে। এটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ্ একটি বিষয়। কারণ এ খেলার মানে হলো শিশুটি নিজের আত্মপরিচয় স্থির বিশ্বাসে নির্ধারণ করে নিচ্ছে। একইভাবে একটি ছেলে শিশুও নারীর প্রতি একটি প্রাথমিক ধারনা গৃহ থেকেই পেয়ে যায় । ফলে পরবর্তীতে নারীর প্রতি তার আচরণ শৈশবকালীন ও কৈশোর কালীন অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রভাবিত হয়। সে নারীর দুর্বলতাগুলো বুঝতে পারে। নারীর নির্ভরশীলতার সুযোগ নিতে চাইলে সে সুযোগ সে সহজেই পেয়ে যায়। এভাবে তৈরি হয়ে যায় এক লিঙ্গভিত্তিক সমাজ মানস।
দেখা গেছে, কর্মজীবী নারীদের সন্তানেরা গৃহিনী (অর্থনৈতিক ক্ষমতাহীন অর্থে)নারীদের সন্তানদের চাইতে নারীর প্রতি বেশি ইতিবাচক ধারণা নিয়ে বড় হয়। যেটি একটি বিকাশমান সমাজের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য ভীষণ প্রয়োজন। আমেরিকাতে এ জাতীয় গবেষণা প্রচুর হয়েছে। এ সকল গবেষণায় দু ধরণের পরিবারের শিশুদের লিঙ্গানুগ ধারণায় তাৎপর্যপূর্ণ পার্খক্য দেখা গেছে। কর্মজীবী মায়েদের সন্তানেরা বাবা ও মাকে সমান ক্ষমতাবান হিসেবে দেখে।
মায়ের উপার্জন ক্ষমতা, নিজের টাকা দিয়ে কিছু কিনে দেয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি নানা কারণ সন্তানের কাছে মাকে ক্ষমতাবান করে। শৈশবকালের এ অভিজ্ঞতা নারীর প্রতি তাদের পরবর্তী ধারনাকে ব্যাপক প্রভাবিত করে। অপরদিকে গৃহিনী মায়ের সন্তানরা যদি মাকে যথেষ্ট ক্ষমতাবান (বেশিরভাগই ক্ষমতাবান হয় না) হিসেবে না দেখে, তাদের মধ্যে নারীর প্রতি প্রচলিত ধারণারই বিকাশ ঘটে। মনে রাখতে হবে প্রতিটি মানুষই যে পরিবেশে বসবাস করে, সেটিই তার কাছে বাস্তব পৃথিবী।
এটি ঠিক কি বেঠিক সে যৌক্তিকতা বিচারের ক্ষমতা সুযোগ তার নেই। কারণ মানুষ তার নিজের অস্তিত্বের স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়ে নিয়ে জীবন যাপন করে। এখানে ব্যতিক্রমী হবার সুযোগ খুবই কম। ধরা যাক, কোন পরিবারে শিশুরা হয়তো মাকে নির্যাতিত হতে দেখে। তাদের কাছে বিষয়টি গভীর পীড়াদায়ক।তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। আবার মাকে খুব আগ্রাসী ও প্রতিবাদী ভূমিকায় দেখতেও চায় না তারা। এর কয়েকটি কারণ আছে।
প্রথমত: একজন মানসিক পীড়ায় থাকা মা সন্তানের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্র্থ হয়। ফলে শিশুর সাথে মায়ের নিরাপদ সম্পৃক্ততা কমে যায়। দ্বিতীয়ত: শিশুদের কাছে বাবাও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। বাবাকে তারা শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান মানুষ হিসেবে দেখে এবং নিজের অজান্তে এ ক্ষমতা ও শক্তির সাথে আপোস করে নেয়। এতে তাদের নিরাপত্তাহীনতার বোধ কমে।
এসব শিশুরা আত্মবিশ্বাসী, উপযোজনক্ষম, স্বাভাবিক মূল্যবোধসম্পন্ন উদার মানুষ হিসেবে বড় হয় না। বড় হবার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই মায়ের নির্যাতিত জীবনের চাইতে তার নিজের জীবনের অর্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। কারণ পরিবারে সে মানবিক আশ্রয় থেকে বঞ্চিত ছিল। এ মানুষটি নিজের জীবনে অন্যের মর্যাদা কতাটা দেবে তা নির্ভর করে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মূল্যায়নের উপর। নিজের অভিজ্ঞতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে মানুষটির পক্ষে নিজের শিক্ষা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের বাইরে যাওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।
মায়ের নির্যাতিত রূপটি মায়ের জন্য তার মায়া উৎপাদন করতে পারে কিন্তু নারীজাতির প্রতি তার আস্থা বা শ্রদ্ধাবনত হবার অনুভব তৈরি হয় না। যদি সন্তানটি ছেলে হয় তাহলে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার প্রশ্নই ওঠে না। এখন দেখা যাক, নির্যাতিত মায়ের মেয়ে সন্তানেরা কেমন হতে পারে। এসব পরিবারের মেয়েরা এক ধরণের অসহায়ত্ব নিয়ে বড় হয়। যেটাকে বলা হয় শিক্ষালব্ধ অসহায়ত্ব। তারা মনে করে কোন ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের নেই। এরা নিজের জীবনকে সহজ করতে আরও বেশি পরনির্ভর হয়ে উঠে।
এ পরনির্ভরতার আবেগীয় দিকটি স্বাভাবিক আবেগীয় অবস্থার চেয়ে খারাপ। এদের কাছে পুরুষ হয়ে উঠে সকল ক্ষমতার উৎস। নিজেদের সম্ভাবনাকে এরা পুরোপুরি উপেক্ষা করে। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী সেলিগমেন্ট ও মনোবিজ্ঞানী মায়ার এ তত্ত্বটির জন্ম দেন। কতগুলো বানরকে এ মনোবিজ্ঞানীদ্বয় একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর ইলেকট্রিক শক দিতেন। প্রথম প্রথম বানর গুলো খুব চিৎকার চেচামেচি করতো, মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতো। 
যখন দেখলো এতে কোন কাজ হয় না, তারা নিরবে এ অত্যাচার মেনে নিতে শুরু করলো। অর্থাৎ তারা অসহয়াত্বের কাছে নিজেকে সমর্পন করলো। পরবর্তীতে মানুষের উপর গবেষণা করে এর সত্যতা পাওয়া যায়। মানুষ অসহায় অবস্থায় এতটা প্রতিবাদহীন ও নিশ্চেষ্ট না হলেও অসহায়ত্ব মানুষের ব্যক্তিত্ব দূর্বল করে। তার এ দুর্বলতা তার প্রায় সবরকম আচরণে বিস্তার ঘটে।
আমেরিকান সমাজে বিভিন্ন মানুষের উপর পরীক্ষায় মনোবিজ্ঞানীদ্বয় দেখেছেন যে, দুই তৃতীয়াংশ মানুষ পরিস্থিতি থেকে অসহায়্ত্ব শেখে। আমাদের দেশে গবেষণা করা হলে এ সংখ্যা আরো বেশি হবে কম হবে না। আমাদের দেশে নিগৃহীত মানুষের সকলেই কমবেশি অসহায়ত্বকে শিক্ষালব্ধ আচরণে পরিণত করেছে। নারীদের ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা আরও বেশি। মেয়েরা তাদের মাকে ক্ষমতাহীন, সর্বংসহা চরিত্র হিসেবে দেখে বড় হয়।
নিজেরা ঘরে বাইরে নারীর যন্ত্রণাগুলো দেখে, অনুভব করে এবং এগুলোর শিকার হয়। ফলে মনের ভেতর গভীর যন্ত্রনা নিয়ে এগুলো মেনে নিতে শুরু করে। কারণ, সমাজে নারীর প্রতি অবহেলা, অপমান, লাঞ্ছনা সবসময়ই প্রতিবাদহীন, প্রতিকারহীন। কেউ যদি প্রতিবাদ করে তাকেও এ সমাজ সাদরে মেনে নেয়নি কখনও। ফলে নারীরা সেলিগমেন্টর বাঁদরের মতো অসহায়্ত্ব নিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নির্বিবাদী হয়ে উঠে এবং অসহায়্ত্ব নিয়ে বাঁচে, অসহায়ত্ব স্বজাতির মধ্যে বিতরণ করে দিয়ে একসময় মারা যায়। সে মৃত্যু প্রকারান্তরে আত্মহত্যাই।
সাধারণত হতাশাবাদী ব্যাক্তিত্বের মধ্যেই শিক্ষালব্ধ অসহায়ত্ব জন্ম নেয়। আমাদের সমাজের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন, নারীর আশাবাদী হয়ে বড় হবার সুযোগ ও সংস্কৃতি কোনটিই নেই। আলোচনা করছিলাম নারীর ভূমিকা পালন শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে। প্রকৃতপক্ষে নারীদের এখন বুঝতে হবে, তার তথাকথিত কোমল, নির্ভরশীল এবং আনাড়ি ব্যক্তিত্বটি কবির কাব্যের জন্য একটি উপকরণ কিন্তু নারীর সম্মানজনক জীবনের জন্য খুব ভালো উপকরণ নয়।
একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে জীবনকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে নারীর ব্যক্তিগত অযোগ্যতাগুলোই বরং অনেক বেশি শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।নারীকে প্রাচীন ভূমিকায় আবদ্ধ রেখে নারীর বা সমাজের কোন ইতিবাচক পরিবর্তন হয় না। হবার কথাও নয়। কারণ নারীরা এখন অবগুন্ঠিত নয় আবার যথাযথ যোগ্যতা ও সক্ষমতা নিয়ে অনবগুন্ঠিতাও নয়। নারী যে সকল সন্ত্রাসের শিকার তার জন্য পুরুষদের একচ্ছত্র দায়ী করা উচিৎ নয়।
নির্জলা বাস্তববাদী হয়েই এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। প্রকৃতিতি প্রতিটি প্রাণীই এক অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়। প্রাণী হিসেবে মানুষ তার বাইরে নয়। এমনকি মানুষের এ প্রাধান্যবিস্তার প্রক্রিয়া অনেক জটিল ও বহুমাত্রিক। অন্যান্য প্রাণী তাদের নিন্মতর শ্রেণির প্রাণীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে, তাদের ধরে ধরে খায়। প্রাণী জগতের এ নিয়ম অনুযায়ী মানুষ যাদের দুর্বল দেখে তাদের উপর উপর প্রাধান্য বিস্তার করে, চিরকাল তাই হয়ে এসেছে। পৃথিবীর ইতিহাস মূলত শক্তিহীনদের উপর শক্তিশালীদের নির্যাতনের ইতিহাস। (কার্ল মাকর্স তার তত্ত্বের শুরুতে এমন একটি কথাই সম্ভবত বলেছিলেন। এবং তার এ আপ্ত বাক্যটি যে সত্যি তারও প্রমান মানুষ করেছে কার্ল মার্কস এর তত্ত্বটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে। )
মানুষ নিজেদের প্রয়োজন ও প্রকৃতি অনুযায়ী দুর্বলকে ব্যবহার করবে এবং প্রয়োজনবোধে অপব্যবহার করবে, সে নারী হোক বা পুরুষ হোক। এ নিয়মের অন্যথা হবার সুযোগ নেই। কাজেই নারীরা যদি পুরুষের মতো শারীরিক ও মানসিক ভাবে যোগ্য না হয়ে ওঠে তাহলে তারা পুরুষের আধিপত্যের আওতায় থাকবে। এ আধিপত্য সবসময় তার কাছে সুখকর হবে না। যে পুরুষ প্রভূর ভূমিকায় আছে এবং যে পুরুষ এখনও বিশ্বাস করে, ‘নারীকে হেন তেন অধিকার দেয়া হয়েছে’- মনে করে, অধিকার দেয়ার মালিক তারা.. তাদের কাছে অধিকার ভিক্ষা করাটা কোনভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
নারীর উপর পুরুষের আধিপত্যের কারণে নারীরা কতটা নিগৃহীত হয় তা প্রমান করার জন্য যথেষ্ট উপাত্ত আমাদের দেশে তো আছেই, সভ্যতার দাবীদার উন্নত দেশগুলোতেও খুব ভাল ভাবেই আছে। সমস্যা হলো, এগুলোর উদঘাটনের তেমন একটা প্রচেষ্টা নেই। সমাধানের সুযোগও তাই খুবই সামান্য। কে ই বা হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!
যারা নারীবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত, তারা বেশিরভাগই পুরুষের অনুদারতার কথাটি প্রাধান্য দিয়ে ভাবেন।
নারী নেতৃবর্গের, সকল নারীদের এবং সকল কন্যা সন্তানদের পিতামাতাকে ভাবতে হবে, নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়ার দায় পুরুষের নয়। এটি পুরুষরা করবে না কোনদিন। একজন গৃহকর্তা/কর্ত্রী তাদের কাজের মানুষটিকে এমন কোন মর্যাদার আসন দেবেন না যাতে তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। নারী পুরুষের মধ্যে যে জাতিভেদটি বিরাজমান, যে বঞ্চনা প্রবহমান তা নিরসন করতে নারীকে এবং বেড়ে উঠা মেয়েদের পরিবারকেই প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে।
মেয়েদের দায়িত্ব পালন শিখে বড় হতে হবে। মেয়েদের কাছে যোগ্যতা প্রত্যাশা করতে হবে। নারী জীবন যাপনের যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে প্রকৃতি ও মনুষ্যসৃষ্ট জটিলতা। বর্ণময় নারীজীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সকল রকম দায়িত্ব পালনের জন্য তৈরি হতে হবে। সকল প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করার মানসিক শক্তি অর্জন করতে হবে। নারীকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হতে হবে। আত্মবিশ্বাস অর্জনের বিষয়টি একদিনের বিষয় নয়। এটি একটি বিকাশ প্রক্রিয়া।
শৈশব কাল থেকেই এ যোগ্যতাটি চর্চার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে পরিবারকে। নারী কোমল, এবং নারী আবেগময়। এটি নারীর আত্মবিশ্বাসী হবার পথে কোন বাধা নয়। সমাজ নামক যে জুজুর ভয়ে নারীরা নিজেদের গুটিয়ে রাখে, সকল নির্যাতন মুখ বুজে সয়ে যায়, তার মুখ উন্মোচন করতে হবে। পায়ের তলায় মাটি নেই একথাটিকে মিথ্যে প্রমান করার সময় এসেছে। ‘নারীর পায়ের তলার মাটি’ বিষয়টি আসলে মানসিক দুর্বলতার স্বপক্ষে একটি অজুহাত মাত্র।
পৈত্রিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বা নিজ নিজ কর্মজীবনে সফল নারীরাও এ ধরণের পায়ের তলার মাটি নামক অজুহাতে ভোগেন। এ মাটি আর্থিক নির্ভরতার মাটি নয়। এ মাটি মানসিক নির্ভরতার মাটি। সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার অর্জিত হবার সম্ভাবনা কতটা আচে এবং কবে সেটা হবে তা বিধাতাই জানেন। যদি তা হয়ও নারীর মানসিক পরনির্ভরতার দিকটি অপসৃত হবার সম্ভাবনা সহসা নেই। শুধু সম্পদ নারীকে স্বয়ংসর্পূর্ণ করবে না বা সম্পদশালী হলেই নারী সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা অর্জন করবে না যদি নারী তার বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও দক্ষতার বিকাশে যত্নবান না হয়।
কারণ সম্পত্তি মানুষের মানসিক বিকাশের একটি উপাদান মাত্র, সব নয়। পুরুষের পায়ের তলার মাটি যেমন তার যোগতা নারীরও তাই। ভাল চেহারা, ভাল রান্না করতে পারা বা মনোরঞ্জনের দক্ষতা নারীর যোগ্যতা নয়। নারী যখন নিজের লিঙ্গগত পরিচয় অগ্রাহ্য করে, নিজেকে সকল শক্তিতে শক্তিশালী করতে পারেবে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারবে, সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, অন্যায়ের সক্ষম ও যৌক্তিক প্রতিবাদ জানাতে পারবে তখনই নারী আত্মনির্ভর।
রবীন্দ্রনাথের কুমু তার সংসারের পীড়ার কথা জেনেও ফিরে গিয়েছিলো মধুসূদনের সংসারে, জলন্ত চুলোর ভেতর। পুরুষের শক্তি ও নিজের অসহায়ত্বের কাছে পরাজিত হয়েছিলো সে। সে বিধাতাকে আশ্রয় করে পরোক্ষভাবে নিজের অসহায়ত্বকে স্বান্তনা দিতে চেয়েছিলো। বিধাতা সর্বশক্তিমান, নিঃসন্দেহে। তিনি তার এ পৃথিবীতে নানা প্রাণী সৃষ্টি করে পাঠিয়ে দিয়েছেন এবং দেখছেন, কে কতটা পারে, কে সীমা লঙ্ঘন করে, কার সীমা লঙ্ঘিত হয়। এ শক্তির প্রতিযোগিতায় নারী যদি হারতেই প্রস্তুত থাকে তাহলে কে তাকে বাঁচাবে? কেনই বা বাঁচাবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








