প্রথমে গোপন ক্যামেরা দিয়ে নারীদের গোসলের ভিডিওচিত্র ধারণ। এরপর সেই ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে তাদের ধর্ষণ। গোপন ক্যামেরায় সেই ধর্ষণেরও ভিডিওচিত্র ধারণ করে তাকে বারবার ধর্ষণ বা টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়া। এভাবে অন্তত ছয় জন নারীর সঙ্গে প্রতারণা এবং সামাজিক মাধ্যমে সে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে গত বছরের নভেম্বরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে শরিয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের এক নেতাকে।
এ ধরনের বড় অপরাধ মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যে আসলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। সামাজিক মর্যাদাহানী এবং নানা কারণে বেশিরভাগ নারীই স্বীকার করেন করেন না তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সহিংসতার কথা। অমানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথও।
জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুগ যুগ ধরেই হয়রানির শিকার হয়ে আসছেন নারী। সাইবার জগত সহিংসতাকারীদের নতুন হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এখানে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছে নারী।
প্রযুক্তি নির্ভরতার এ যুগে শিক্ষিত ও অগ্রসর নারীদের অনেকটা বাধ্য হয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে হয়। একাডেমিক বা অফিশিয়াল যোগাযোগ রক্ষা, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খবর সংগ্রহ করার জন্য তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকতেই হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের বেশিরভাগই অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিভিন্নভাবে।
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী অর্ষা (ছদ্মনাম)। তার ক্লাসে ক্লাস রুটিন, নোট এবং একাডেমিক বিভিন্ন তথ্যের আপডেট জানানো হয় ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে। তার একজন মামা প্রবাসী। তিনি মাঝেমধ্যেই তার পরিবারের সঙ্গে অনলাইনে কথা বলেন। অর্ষার বাবা-মা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে পারদর্শী নয় বলে তার আইডি থেকেই কথা হয় তার প্রবাসী মামার সঙ্গে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ফেসবুক আইডি খুলতে হয়েছে তাকে।
কিন্তু সম্প্রতি অর্ষা আবিষ্কার করেন, তার ছবি, নাম এবং পরিচয় হুবহু ব্যবহার করে অন্য একটি আইডি চালু হয়েছে। তার ছবি ব্যবহার করে প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করা হয়েছে। সেখানে আজে বাজে কমেন্টে ভরে গেছে। এ অবস্থা দেখে অর্ষা খুবই বিব্রত বোধ করছে। কিন্তু সে জানেও না যে কে তার নামে এ আইডি চালাচ্ছে। ভয়ে সে বাবা মাকে বলতেও পারছে না। কারণ এ ঘটনা শেয়ার করলে তারা বিচলিত বোধ করবেন। পরে বাধ্য হয়ে তাকে নিজের আইডিও বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু সে উপায়ও নেই। কারণ তার আইডি বন্ধ করে দিলে তার বন্ধুবান্ধবসহ অন্য পরিচিত জনেরা সেই ভূয়া আইডিকে আসল ভেবে ভূলবার্তা পেতে পারে। তাতে সমস্যা আরও বাড়বে।
কিভাবে নারী নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে
এ ধরনের হয়রানি থেকে নারী কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে, এ ব্যাপারে জেন্ডার বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: প্রযুক্তি নির্ভরতার যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে নারীদের দূরে থাকার উপায় নেই, যৌক্তিকতাও নেই। কিন্তু তাকে আরেকটু সতর্কভাবে এসব ব্যবহার করতে হবে।
‘‘চেনা জানার বাইরে কাউকে তালিকায় (ফেসবুক বন্ধুর তালিকায়) অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। কারণ কে ভালো কে খারাপ তাতো আগে থেকেই টের পাওয়ার কোন উপায় নেই। তাছাড়া চেনাজানা কারও কাছেও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। নারীদের উচিত হবে ব্যক্তিগত জোনকে নিরাপদ রাখা, এখানে বিশ্বস্ত ছাড়া কাউকে একসেস না দেওয়া। ‘
তবে কেবল নিজেদের ব্যাপারে সতর্ক থাকলেই নারীরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না। তাদের রক্ষার ব্যাপারে পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র সবার দায়িত্ব রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

‘পরিবারের দায়িত্ব হচ্ছে, মেয়েদের সতর্ক করার পাশাপাশি ছেলেদেরও শিক্ষা দেওয়া যাতে তারা কোন নারীকে হয়রানি করার কাজকে ঘৃণার চোখে দেখে বেড়ে উঠতে পারে’, বলেন এ জেন্ডার বিশেষজ্ঞ।
ধর্ষণের বিচারগুলোতে যদি সরকার কঠোর শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপণ করতে পারে তবে সমাজ থেকে এ সহিংসতা অনেকাংশেই কমে যাবে বলে মনে করেন তানিয়া হক।
‘‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যাচ্ছে ধর্ষকরা। আপনি দেখেন, রূপাকে ধর্ষণ করে হত্যার একটা রায় হয়েছে। ধর্ষকরা প্রান্তিক শ্রেণির বলেই এমনটি হয়েছে। কিন্তু তারা যদি প্রভাবশালী কেউ হতো তা এ বিচার নিয়ে নানা ধরনের গড়িমসি দেখতাম আমরা।’’
সহিংসতা হলেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নারীর ঘাড়েই দোষ দেওয়ার যে প্রবণতা তা থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে সহিংসতা রোধ করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তানিয়া হক বলেন: নারীদের প্রতি কোন ধরনের সহিংসতা হলেই দেখা যায়, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নারীদের ঘাড়েই দোষ চাপানো হয়। একসময় নারীও বিশ্বাস করতে থাকে দোষ বুঝি তারই। তাই সে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার পথে চয়ে যায় অনেক সময়। কিন্তু আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়। প্রতিরোধ করা শিখতে হবে নারীদের।
বিশ্বব্যাপী একই চিত্র
এ ধরনের সাইবার অপরাধ শুধু দেশেই নয় বিশ্বব্যাপীই নারীদের বিরুদ্ধে ঘটে চলেছে। পুরো সাইবার জগত নারীদের জন্য হয়ে উঠেছে আতঙ্কের নাম।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইন ব্যবহারকারীর ৬২ শতাংশই হয়রানি ও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ১৮ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার। এ ছাড়া ৪১ শতাংশ হামলার শিকার হচ্ছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে। তারা রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ সংক্রান্ত বিষয়ে মত প্রকাশের জন্য উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। তাদের উত্তেজক ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ সরাসরি হত্যার হুমকিও পেয়েছেন।
গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত ‘অনলাইন হ্যারাসমেন্ট রিপোর্ট ২০১৭’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা হয়রানি বা হুমকি দিচ্ছে, তাদের অধিকাংশেরই অনলাইনে পরিচয় সুনির্দিষ্ট নয়। অথবা তারা ভিন্ন পরিচয়ে অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করছে। হয়রানিকারীদের মধ্যে ভুয়া কিংবা পরিচয় গোপন রাখা ব্যবহারকারী ৭২ শতাংশ। মজার তথ্য হচ্ছে, অনলাইনে পরিচয় গোপনকারীদের হয়রানিমূলক পোস্ট বা মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করছেন প্রকৃত পরিচয়ধারীদের ৬৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত অসচেতন ব্যবহারের কারণে হ্যাকিং কিংবা নিজেদের অজান্তেই তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতারণামূলক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনার শিকার হচ্ছেন আট শতাংশ।








