গত শুক্রবারের আগ পর্যন্ত থাইল্যান্ডের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই ছিল না।
দেশটি টানা পাঁচ বছর ধরে সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। সামরিক সরকার এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে দেশের সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যেন নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর ওপর তাদের প্রভাব বাড়ে বৈ না কমে।
সামরিক ক্ষমতাধরেরা এমন ব্যবস্থাও করেছে যাতে তাদের বিরোধী পক্ষ অর্থাৎ নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সঙ্গে যুক্ত দলগুলো নির্বাচনে বেশি আসন পেতে না পারে।
আগের দলগুলোর পরিসর কমানোর চেষ্টা চলছিল; এখন আবার নতুন যুক্ত হলো ‘থাই রক্ষা চার্ট’। গত নভেম্বরেই এর জন্ম। সবাই তখনই বুঝতে পেরেছিল, থাকসিনপন্থি প্রধান দল ‘ফিউ থাই’কে মজবুত করতে এবং থাকসিন ও তার সহযোগীদের ওপর নতুন সংবিধানে আরোপিত বিধিনিষেধ ভাঙতেই থাই রক্ষা চার্ট গঠন করা হয়েছে।
এই অবস্থায় মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আট বছর পর অনুষ্ঠিতব্য প্রথম নির্বাচনে থাকসিনপন্থিরা আদৌ সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট যোগ্যতা দেখাতে পারবে কিনা এবং তাদের ঠেকাতে কী কী করবে।
সম্ভাব্যতা বাড়ানোর হাতিয়ার রাজকন্যা
তো এই যোগ্যতা দেখানোর পূর্বপ্রচেষ্টা হিসেবেই থাই রক্ষা চার্ট শুক্রবার রাজা ভাজিরালংকর্নের বড় বোন রাজকন্যা উবলরতনাকে দলের পক্ষ থেকে একমাত্র প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। এক মুহূর্তে বদলে যায় থাই নির্বাচন নিয়ে সব সমীকরণ।
সংবিধানে সামরিক বাহিনীর ঢোকানো একটি ধারার ক্ষমতাবলে একজন অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। পাঁচ বছর আগে সেনা অভ্যুত্থানের নায়ক প্রায়ুথ চান-ওচা’কে ক্ষমতায় রাখার জন্য কাজটি করা হয়েছিল।
সেই ধারারই সুযোগ নিয়েছিল দলটি। তাদের যুক্তি মতে, একই আইন তো একজন অনির্বাচিত বা নিষ্ক্রিয় রাজকন্যার জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে। কেননা উবলরতনা বর্তমানে নিজেকে রাজকন্যা নয়, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই পরিচয় দেন। কেননা ৪৬ বছর আগে এক আমেরিকানকে বিয়ে করার সময় তিনি নিজের রাজপরিচয় ত্যাগ করেছিলেন।

কিন্তু থাইল্যান্ডে তার সঙ্গে এখনো রাজপরিবারের সদস্যের মতোই আচরণ করা হয়। তাহলে কীভাবে সমালোচনাার ঊর্ধ্বে থাকা একজন মানুষ গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিযোগিতায় নামবেন?
স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া হয়েছিল এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপের পেছনে নিশ্চয়ই রাজার সমর্থন রয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি থাকসিনের পক্ষ নিচ্ছেন।
ভাজিরালংকর্নের বিরুদ্ধে এমনিতেই প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে তিনি সাম্রাজ্যবাদ, অতি অভিজাত সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরোধী।
এমন পরিস্থিতি থাইল্যান্ডের ক্ষমতার গতিবিধিই পাল্টে দিলো হঠাৎ করে।
কিন্তু নিজের অবস্থান পরিচ্ছন্ন রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নেন রাজা ভাজিরালংকর্ন। উবলরতনার মনোনয়ন ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই রাজফরমান জারি করে তিনি জানান, রাজকন্যা উবলরতনাকে এখনো রাজপরিবারের উচ্চস্থানীয় একজন সদস্যই মনে করা হয়। তাই তার সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেয়াটা ‘খুবই অনুচিত’।
রাজার পক্ষ থেকে এমন সরাসরি প্রত্যাখ্যান থাইল্যান্ডে সাধারণত ভয়াবহ ফল বয়ে আনে। ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই গুজব উঠল থাই রক্ষা চার্টের নির্বাহী বোর্ডের সবাইকে আটক করা হচ্ছে। তবে প্রার্থী উবলরতনা ছিলেন বলেই কিনা কে জানে, গুজবটি সত্যি হয়নি।
তবে সোমবারের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন উবলরতনার প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করে। আপাতত ইসি চেষ্টায় আছে সাংবিধানিক আদালতে বিষয়টি তুলে পুরো দলটিকে বিলুপ্ত করতে।
আগামী ৯ মে বিজয়ী এমপিদের নাম ঘোষণার শেষ তারিখ। তার আগে এটি করা সম্ভব হলে থাই রক্ষা চার্ট ও এর রাজনীতিকদের নির্বাচন থেকে বহিষ্কার করা যাবে।
ক্ষমতার জুয়া
থাকসিনের দল ফিউ থাই ২০১১ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। নতুন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অধীনে দলটির কোনোভাবেই সেবারের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়।
কারণ আড়াইশ’ আসন বিশিষ্ট পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্যরা আগে থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত। তাদের প্রায় সবারই জেনারেল প্রায়ুথের পক্ষে আগামী নির্বাচনে ভোট দেয়ার কথা।

তবে থাই সমাজে রাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বস্ততা তাদের রাষ্ট্রধর্মের গভীরে প্রোথিত। ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আদর্শ যা-ই হোক, রাজতন্ত্রের প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য দেখাতেই হবে। বেশিরভাগ থাই নাগরিক তো রাজপরিবারের সঙ্গে গভীর একটা আবেগের বন্ধনও অনুভব করেন।
তাই বলাই বাহুল্য, যদি রাজকন্যা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী থাকতেন, হয়তো অধিকাংশ সিনেটরই তাদের বিশ্বস্ততা রাজকন্যার প্রতি দেখাতেন।
এই আনুগত্যের সদ্ব্যবহার যেন থাই রক্ষা চার্ট নিতে না পারে সেজন্যই সামরিক সরকার নিযুক্ত নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বাতিল করেছে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কিন্তু থাইল্যান্ডের প্রতিটি সংবিধানেই রাজপরিবারকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে জেনেও কেন উবলরতনাকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নিলেন থাকসিন?
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন থাকসিনকে রাজা নিজেই এ ব্যাপারে সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। রাজপরিবারের অন্যদের চাপে পরে তিনি মত বদলেছেন।
কিন্তু থাকসিনপন্থি শিবিরের অনেকের ধারণা, থাকসিন স্বাভাবিকভাবেই ভেবে নিয়েছিলেন একবার মনোনয়ন দিয়ে দিলে রাজা তার বোনের পক্ষই নেবেন। অর্থাৎ নিশ্চিত না হয়ে শুধু একটি সম্ভাবনা বিশ্বাস করে রাজনৈতিক ক্ষমতার আশায় একটা বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া খেলেছেন তিনি।
থাইল্যান্ডের জাতীয় নির্বাচনের ঠাণ্ডা পরিবেশের মাঝে উবলরতনার আগমন ও প্রার্থিতা নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যে উষ্ণতা এসেছে তা বেশিক্ষণ থাকবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
অনেকেরই ধারণা, যেভাবে আলোচনাটি হঠাৎ শুরু হয়েছিল সেভাবে হঠাৎ করেই থেমে যাবে আর পরিস্থিতি সব ফিরে যাবে আগের জায়গায়। শুধুই মাঝখান দিয়ে রাজকন্যা উবলরতনা থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে একটু আলোড়ন তোলার কাজটি করে গেলেন।








