একটি শীতের সকাল, হাতে একটি সংবাদপত্র। তার প্রথম পাতায় একটি ছবি, ছবিটিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ব্যক্তি।
ছবিতে ন্যায়ের দেবীর ভাস্কর্যও দেখা যায় একপাশে, আরেকপাশে দাঁড়ানো মানুষটির ডান হাতটি অকেজো, অস্বাভাবিক চিকন স্পষ্ট বোঝা যায়। অচল সাড়হীন হাতটি ঝুলে আছে কাঁধ থেকে। এই হাত যে পুরোপুরি অকার্যকর দেখেই বোঝা যায়।
ছবির ব্যক্তির নাম তারা মিয়া, তিনি সুনামগঞ্জের প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক। তিনি পুলিশের উপর হকিস্টিক, রাম দা নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা মামলার আসামী!
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ২৮ ডিসেম্বর ষড়যন্ত্র ও পুলিশ সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করার অভিযোগ এনে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলাটি করেন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থানার এস আই মো. তারিকুল ইসলাম।
বিভিন্ন পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, তারা মিয়ার ডান হাতটিই শুধু জন্মগতভাবে অকার্যকর নয়, বাম হাতেও রয়েছে সমস্যা। তিনি প্রতিবন্ধী হবার কারণে ভিক্ষাবৃত্তি করেন। অচল ডান হাত আর সমস্যাগ্রস্ত বাম হাতের কারণে ৪৫ বছর বয়সী তারা মিয়া অন্য কোন কাজ করতে পারেন না। দরিদ্রতার কষাঘাতে ৪৫ বছরে তারা মিয়াকে লাগে ৬০ বছরের মত।
ঘটনাটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে খুব অস্বাভাবিক নয়। কেননা আমাদের দেশে ২০১৭ সালে, ২২ দিনের শিশুর বিরুদ্ধে রাম দা নিয়ে হামলার মামলা হয়েছে, এবং পুলিশ ‘তদন্ত’ করেই চার্জশিট দিয়েছিল! ২২ দিনের শিশু যখন ১০ মাস বয়স, তখন মায়ের কোলে চেপে হাজিরা দিতে এসেছিল কোর্টে জামিন নিতে! আবার একই মামলায় তিন বছর আগে মরে যাওয়া ব্যক্তিও ছিল আসামী।
জামালপুরে আড়াই বছরের একটি শিশুকে মামলায় আসামি করা হয়েছিল।
গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের আব্দুল হানিফ বাদি হয়ে এ মামলা দায়ের করেন। জামালপুরের আমলি আদালত, বকশীগঞ্জ এর মামলা নম্বর ১৬(১)২০১৮।
এতে আড়াই বছরের শিশুসহ ৭ জনকে আসামি করা হয়। ওই শিশুর জন্মের আগেই তার বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সোমবার আদালতে মায়ের কোলে চড়ে হাজিরা দিতে এলে ম্যাজিস্ট্রেটসহ সবাই হতবাক হয়ে পড়েন। যদিও বিজ্ঞ আদালত শিশুকে আসামীকারী বাদীকেই জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেয়।
আইনের মানুষেরা যখন আইনের শক্তির উপর ভর করে অপশক্তি প্রয়োগ করে তখন ভয় ছাড়া অন্য কিছু জাগে না মনে। সংবাদ মাধ্যম সর্বোপরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি প্রতিদিন চলে আসে জনসমুখে।
আইন-শৃঙ্খলারক্ষীরা দিনে দিনে দুর্বৃত্ত, অপ্রতিরোধ্য, নিষ্ঠুর হয়ে পড়ছে। কোন কিছুই যেন তাদের ফেরাতে পারে না অন্যায়ের দিকে থেকে। কারণ হয়ত তাদের নিয়ন্ত্রণকারীরা নিজে এতো বেশি দুর্নীতিপরায়ণ যে তারা অধীনস্তদের আইন,কানুন বা অনুশাসনে বাধ্য করতে অপারগ। পুলিশের এতো এতো অবাস্তব মামলার মাঝে তাই প্রতিবন্ধী তারা মিয়াকে আসামী করাটা আর দশটা মামলার মত স্বাভাবিক মনে হয়।
আনন্দের সংবাদ আদালত তারা মিয়াকে ৬ সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছেন, আশা করা যায় পরবর্তী ধাপে তিনি বেকসুর খালাস পাবেন।
আরেকজন তারা মিয়া প্রতিবন্ধী রিকশা চালক, যাকে নিয়ে একটি দৈনিক পত্রিকায় একটা মানবিক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। জানা যায়, নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বাসিন্দা তারা মিয়া। পঞ্চাশোর্ধ তারা মিয়া রাজধানীর অলিগলিতে রিকশা চালান। কাক ডাকা ভোরে রিকশা নিয়ে বের হন। ঘরে ফেরেন রাতে।
সারাদিনে আয় করেন মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। আবার কোনো কোনো দিন শান্তিবাগের (১৭/১ নম্বর) রিকশা গ্যারেজের মালিক রিকশা দিতে নারাজ থাকলে সারাদিন বসে-শুয়েই দিন পার করেন। ইচ্ছা থাকলেও রিকশা ছাড়া অন্য কোন কাজ করতে পারেন না, কারণ তারা মিয়ার শরীরের এক অংশ প্যারালাইজড। এক হাত ও এক পা দিয়েই তিনি রিকশা চালান। এমনকি রিকশা চালানোর সময় তার পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। এত কষ্টের ভিড়েও তারা মিয়া শান্তি খোঁজেন দুই সন্তানের মাঝে।
আর স্বপ্ন দেখেন বড় মেয়ে ঝুমা আক্তার এমএ পাস করবে। আর ছেলে হবে ডাক্তার। মেয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে নেত্রকোনার সুসং-এর মামার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করছে। সুসং সরকারি মহাবিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষায় দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে সে। ছেলে মাসুম বর্তমানে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। তারা মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া শান্তিবাগের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে সংসারের খরচ জোগান।
প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ (যুগ্ম সচিব) ওয়াহিদা আক্তার একটি দৈনিককে জানান, প্রতিবেদনটির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে। তিনি তারা মিয়ার কষ্টের কাহিনী পড়ে ব্যথিত হয়েছেন। পরে তিনি নেত্রকোনার দুর্গাপুরে তারা মিয়ার গ্রামে একটি বাড়ি করে দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার বোন শেখ রেহানা এ কাজের তত্ত্বাবধান করবেন। প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত তারা মিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন, মানবতার বহিঃপ্রকাশ করেছেন।
আমাদের আশা, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিগ্রস্ত আইন-রক্ষাকারী অদমনীয় ব্যক্তিদের কঠোর হাতে দমন করবেন। সাধারণ জনগণ যেন পুলিশকে ভয় না পেয়ে বন্ধু ভাবে। পুলিশকে মানবিক হবার জন্য যেন কঠোর আইন প্রণয়ন হয়। রিকশাচালক প্রতিবন্ধী তারা মিয়ার মত আমরা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারি। আমাদের জীবন যেন ৬ সপ্তাহের জামিনপ্রাপ্ত তারা মিয়ার মত না হয়ে পড়ে।
মিথ্যা মামলায় স্ত্রী-সন্তান, ঘর বাড়ি, শহর ফেলে পালিয়ে বেড়াতে না হয়। আসামী প্রতিবন্ধী তারা মিয়ার মত আমাদের পাঁজর বের হয়ে না যায় পালাতে পালাতে।
ন্যায়ের দেবীর পাশে দাঁড়িয়েও যেন ন্যায় আশায় অকার্যকর হয়ে ঝুলে না থাকি দেশের কাঁধ থেকে। বেড়ির হাতে মুক্ত হোক আমাদের জীবন, রিকশাচালক তারা মিয়ার মত আমরাও যেন প্রধানমন্ত্রীর কৃপা দৃষ্টি পাই। পালিয়ে বেড়াতে চাই না আসামী নামধারী তারা মিয়ার মত অভিশপ্ত বেড়িময় জীবন থেকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







