ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ‘মি টু’ (#MeToo) হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে সব রকমের যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া প্রচারণায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি যোগ দিয়েছেন তারকারাও। বিশেষ করে হলিউড সেলিব্রিটিরা নিজেদের সঙ্গে ঘটা অপ্রীতিকর ঘটনার পাশাপাশি অন্যদের প্রতি সমব্যথিতা প্রকাশেও বেছে নিচ্ছেন এই হ্যাশট্যাগ।
অতীতের ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতা বেরিয়ে আসছে এই ‘মি টু’ প্রচারণার মধ্য দিয়ে। ‘একবার ধর্ষিত হলে আরেকবার হওয়ার অনুভূতি চলে যায়’ – একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হওয়ার মানসিক অনুভূতিশূন্যতা বা কাঠিন্যের এই চরম কষ্টের কথাও এই হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রকাশ্যে বলছেন তারকারা।
যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারীদের প্রতিবাদে সোচ্চার করতে বছর দশেক আগে নারী অধিকার কর্মী তারানা বার্ক ‘মি টু’ নামের একটি প্রচারণা শুরু করেছিলেন। চলতি মাসের শুরুতে হলিউড প্রযোজক হার্ভি ওয়েইনস্টেইনের বিরুদ্ধে বহু তারকাকে যৌন নিপীড়ন, এমনকি ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর সেই আন্দোলনকেই হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলেন হলিউড অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো।
তারপর থেকেই জোয়ারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ‘মি টু’। এই ক্যাম্পেইনের সঙ্গে বিশ্বের এত বেশি নারীর সম্পৃক্ততা অনেকটা বুঝেও না বুঝে থাকা সত্যটিকে সবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে: পৃথিবীতে বোধহয় এমন কোনো নারী নেই, যাকে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে কোনো না কোনো ধরণের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়নি।
অ্যালিসা মিলানো
অ্যালিসা মিলানো সামাজিক মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটারে গত ১৫ অক্টোবর দেয়া পোস্টে লেখেন, ‘যারা যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন, তারা ‘মি টু’ লিখে এই টুইটের জবাব দিন।’ টুইটে ছিল একটি স্ক্রিনশট, যেখানে লেখা:
মি টু (আমিও)
একজন বন্ধুর পরামর্শ দিলো: ‘যদি যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার সব নারী ‘মি টু’ লিখে স্ট্যাটাস দেয়, আমরা হয়তো এই সমস্যার ব্যাপকতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবো।’
এরপর থেকে ফেসবুক ও টুইটারে দ্রুত ছড়িয়ে যেতে থাকে এই প্রচারণা। মিলানোর টুইটে শুধু নারীরা নয়, সাড়া দিয়েছেন পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও, এবং এখনো দিচ্ছেন।
If you’ve been sexually harassed or assaulted write ‘me too’ as a reply to this tweet. pic.twitter.com/k2oeCiUf9n
— Alyssa Milano (@Alyssa_Milano) October 15, 2017
লেডি গাগা
‘মি টু’ হ্যাশট্যাগসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অসংখ্য নারী-পুরুষ সেলিব্রিটি পোস্ট দিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় ভিন্ন ধারার পপ গায়িকা লেডি গাগা। ২০১৪ সালে তিনি প্রথম নিজের ধর্ষণের শিকার হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। এরপর বিভিন্নভাবে নিজের গান ও বক্তব্যের মাধ্যমে গাগা ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন। সর্বশেষ সাম্প্রতিক ক্যাম্পেইনে অংশ নেয়া সেলিব্রিটিদের মধ্যে প্রথমদের একজন হলেন তিনি শুধু ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ টুইট করে।
— xoxo, Gaga (@ladygaga) October 15, 2017
গ্যাব্রিয়েল ইউনিয়ন
নন্দিত হলিউড অভিনেত্রী গ্যাব্রিয়েল ইউনিয়ন ১৯ বছর বয়সে তাকে অস্ত্রের মুখে ধর্ষিত হওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন গত বছরই। তখন থেকেই যৌন নির্যাতনের ভিক্টিমদের সমর্থক ও মুখপাত্র হিসেবে তেজোদ্দীপ্ত ভূমিকা রাখছেন তিনি। ১৫ তারিখে আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান ব্যারি ক্রিমিনস-এর অভিজ্ঞতার টুইট শেয়ার করে প্রচারণায় অংশ নেন। টুইটে ব্যারি ধর্ষণের শিকার ছেলেশিশু হিসেবে, যে নিজের অভিজ্ঞতা সবার সামনে প্রকাশ করেছে এবং তার কাছে যা অনেককে নিজের কথা বলতে সাহায্য করেছে, তার প্রসঙ্গ তুলে ধর্ষণের নীচতার কথা বলেছেন। টু্ইটের শেষে তিনিও ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ দিয়েছেন।
This. #MeToo https://t.co/oYiyeMxvuy
— Gabrielle Union (@itsgabrielleu) October 15, 2017
নিজের কথাও শেয়ার করেছেন তিনি:
Reminder. I got raped at work at a Payless shoe store. I had on a long tunic & leggings so miss me w/ “dress modestly” shit.
— Gabrielle Union (@itsgabrielleu) October 15, 2017
এই প্রচারণা নিয়ে গ্যাব্রিয়েল মঙ্গলবার একটি টিভি সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে কথাও বলেন, ‘#মি টু দেখতেই আমার হাতগুলো অবশ হয়ে গেল। আমার মনে হচ্ছিল এটা আসলে পুরোপুরি আমাকে নিয়েই হচ্ছে। এবং যখন আমি বুঝতে পারলাম আক্ষরিকভাবে লাখ লাখ মানুষ, নারী ও পুরুষ এই দুর্ভাগ্যের ভুক্তভোগীদের অংশ হিসেবে এটা নিয়ে কথা বলছে, ভাবতেই মনটা ছিঁড়ে যায়…’
ইভান রেচেল উড
আরেক স্পষ্টভাষী হলিউড তারকা ইভান রেচেল উড দু’বার যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা আগেই জানিয়েছেন। ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ যোগ করে তিনি একাধিক টুইট করেছেন, যেখানে বলেছেন, ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও তাকেই সবাই দোষ দিয়েছে, ভাবতে বাধ্য করা হয়েছে, তিনি খারাপ, তাই এসবেরই যোগ্য।
‘একবার ধর্ষিত হলে আরেকবার হওয়ার অনুভূতি চলে যায়। আমার শরীরের মনে ছিল, তাই পরেরবার আমাকে কষ্ট থেকে রক্ষা করেছে,’ বলেন তিনি।
Because I was shamed and considered a “party girl” I felt I deserved it. I shouldnt have been there, I shouldn’t have been “bad” #metoo
— #EvanRachelWould (@evanrachelwood) October 16, 2017
Being raped once made it easier to be raped again. I instinctually shut down. My body remembered, so it protected me.
I disappeared. #metoo— #EvanRachelWould (@evanrachelwood) October 16, 2017
It took a while for my body to feel again after shutting down. Empathy, joy, sex, tears, all had to be re-learned. #metoo
— #EvanRachelWould (@evanrachelwood) October 16, 2017
Through years of trial & error, strains on my relationships, intense therapy & self help I am starting to notice a real change. Not out–
— #EvanRachelWould (@evanrachelwood) October 16, 2017
ছোট ও বড় পর্দায় সমান পরিচিত আরেক হলিউড তারকা মেলানি লিনস্কি ওয়েইনস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী নারীদের সমর্থন জানিয়ে অনেকগুলো টুইট করেছেন। এরপর ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে লিখেন, ‘যেসব নারী সবার সামনে এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছেন এবং যারা এখনো ভয় পাচ্ছেন, আমি আপনাদের সবার পাশে আছি। এ ঘটনা আমাদের সবার সঙ্গেই ঘটেছে।’
To all the women who have come forward. And those who are still afraid to. I stand with you
It’s happened to all of us. #MeToo
— Melanie Lynskey (@melanielynskey) October 16, 2017
এছাড়া অ্যানা প্যাকিন, প্যাট্রিশিয়া আরকুয়েট, ডেবরা মেসিং মার্থা স্টুয়ার্টসহ অসংখ্য সেলিব্রিটি এই হ্যাশট্যাগ যোগ করে স্ট্যাটাস ও পোস্ট দিয়েছেন। যেমন অ্যামেরিকা ফেরেরা হৃদয় নিংড়ানো কষ্টে ইনস্টাগ্রামে বর্ণনা করেছেন শিশুকালে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা।
বলিউডেরও অনেকে ‘মি টু’ ক্যাম্পেইনের সঙ্গে একাত্ম হচ্ছেন। কৌতুকশিল্পী মল্লিকা দুআও ইনস্টাগ্রামে ছোটবেলায় তার ও তার বড় বোনের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন হ্যাশট্যাগ দিয়ে।
এছাড়া হ্যাশট্যাগটি সরাসরি ব্যবহার করে পোস্ট বা স্ট্যাটাস না দিলেও ওয়েইনস্টেইনের ঘটনার পর বিভিন্নভাবে নিজ নিজ অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলেছেন অনেকে। চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এলি ইউমেন ইন হলিউড অনুষ্ঠানে জেনিফার লরেন্স এবং রিজ ইউদারস্পুনের মতো তারকারা যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার বুক কাঁপানো অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। ‘মি টু’ প্রচারণার সঙ্গে মৌখিকভাবে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন তারা।










