গত ২০ মার্চের পর সারাদেশে যে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় ছিলো তা হচ্ছে তনু হত্যা রহস্য। শুধু দেশেই কেন, ফুঁসে উঠেছিলো বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশীরাও। খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে তনু। বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরী করেন তাই তাদের বসবাস ছিলো দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত বলে পরিচিত সেনানিবাস এলাকাতে।
তনু সম্পর্কে যত দূর জানা গেছে সে একজন স্বাবলম্বী এবং সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থাকা মানুষ ছিলেন। নিজে ছাত্র ছিলেন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজের। কলেজ, নাটকের দল, রিহার্সেল, টিউশনি আর বাসা। এই ছিলো তার জীবনের আঙ্গিনা।
আচমকা এক দমকা হাওয়া এসে উড়িয়ে নিয়ে গেলো তনুর সেই হাসিখেলার দিনগুলো। ছিন্ন করে দিলো তার সকল স্বপ্ন। সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হয়ে উঠলো তার জন্য সবচেয়ে বিপদজনক। জীবনের বেশীরভাগ সময় যে এলাকাতে সে বন্ধুদের সাথে খেলতে খেলতে বড় হয়েছে সেই পরিচিত স্থানই হয়ে গেলো তার জন্য চরম অপরিচিত।
আসলে কী হয়েছিলো সেইদিন? এই প্রশ্নের জবাব এখনো পরিষ্কার হয়নি। আমরা এখনো পাইনি কোনো সঠিক উত্তর। আমরা কেবল জানি তনুর ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া গিয়েছিলো সেনানিবাসের ঝোপেড় ভিতর। শুনেছি তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতের চিহ্ন ছিলো, মাথার চুলগুলোকেও রেহাই দেয়নি হায়েনারা।
তনুর পরিবারের দাবী তনুকে ধর্ষণ করে আঘাতের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনাও তাই প্রমাণ করে। কিন্তু দেশের আইন আদালত কি আর আমাদের মতো আবেগে চলে? তাদের চাই সঠিক প্রমাণ এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভিত্তিতে রিপোর্ট। অত্যন্ত আশচর্যজনকভাবে ৪ এপ্রিল কুমিল্লা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক শারমিন সুলতানা প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলেন, তনুর মৃত্যুর কারণ তাদের কাছে স্পষ্ট নয়, ধর্ষণের কোনো আলামতও তারা পাননি। ভিসেরা পরীক্ষায় বিষক্রিয়া বা রাসায়নিকের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাহলে তো ধরেই নিতে হবে তনু নিজেই নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে, রক্তাক্ত করেছিলো। নিজেই নিজের চুল কেটে নিজেকে হত্যা করেছিল। তবে তনুর মাথায় কোনো সমস্যা ছিলো বলে কেউ এখনো বলেনি সেই রক্ষা।
বাঙালী হচ্ছে লড়াকু জাতি। হার না মানা জাতি যাদেরকে পাকিস্তানীরা দমাতে পারেনি তাদের রক্তচক্ষু দেখিয়ে, সে জাতি এমন গল্প মানবেই বা কেন? সারাদেশ আবার গরম হয়ে গেলো। তনুর প্রিয় কুমিল্লা হয়ে উঠলো রণক্ষেত্র। এক তনু আবার এক করে দিলো সীমানা ছাড়িয়ে সকল বাংলাদেশীকে।
কিংকর্তব্যবিমুঢ় প্রশাসন আবার বাধ্য হলো হাইকোর্টের নির্দেশে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত করতে। এর মধ্যে আবার সিআইডির রিপোর্টে জানা গেলো ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামতের মধ্যে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যার থেকে এটাই বলা যায় যে তনুকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।
সর্বশেষ ময়নাদতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী ডাক্তার জানালেন. তনুর মৃত্যুর আগে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স হয়েছিলো। তিনমাসের পচাগলা লাশ বের করে তারা বুঝতে পারলেন তনু কারো সাথে যৌন মিলনে মিলিত হয়েছিলো কিন্তু তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন আবিষ্কার করতে পারলেন না। কি তাজ্জব কথা! ইন্টারকোর্সের আবিষ্কর্তারা ধর্ষণের আলামত বলতে নারাজ। প্রশ্ন হচ্ছে ইন্টারকোর্স এবং ধর্ষণের কি আলাদা ধরণ বা আলামত থাকে?
এ নাটক চলছে এবং চলতেই থাকবে। এ যেন বর্তমান বাংলাদেশের ছবি। ১৯৭১ সালে অনেক স্বপ্ন নিয়ে জন্ম নিয়েছিলো বাংলাদেশ নামক একটি দেশ। সময়ের পরিক্রমায় আশা ছিল এই বাংলাদেশ হবে সবার যেখানে মানুষের মধ্যে থাকবে একটাই পরিচয়, আর তা হচ্ছে তিনি একজন বাংলাদেশী নাগরিক। সে আশা কি পূরণ হচ্ছে? আজকের বাংলাদেশের পরিচয় কি আমরা নির্ধারণ করতে পারছি? তনু কি কোনদিন কল্পনা করেছিলো তার এই পরিণতি? হত্যা করেও তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়া হচ্ছে না। বারবার টেনে তোলা হচ্ছে তার পচা গলা মৃত শরীরকে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখানো হচ্ছে তার মূল্য তার প্রিয় স্বদেশে কতটা?
আজকের বাংলাদেশে আমরা প্রতিমুহূর্তে সংশয়ে আছি। কী হচ্ছে কেন হচ্ছে, যা হবার কথা তা কি হচ্ছে? কেন হচ্ছে না? রাষ্ট্র কি আমার প্রতি আন্তরিক? আমার অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখছে? এই যে এত এত মানুষ মরছে প্রতিনিয়ত তার কয়টার বিচার পাচ্ছি আমরা? আমরা কি কেউ বলতে পারি আমার মৃত্যু স্বাভাবিক হবে কিনা?
ঠিক যেমন একজন দর্জি বা একজন পাদ্রী বা একজন মন্দিরের সেবক মারা গেলে চলে দায়ী খুঁজে বের করার ঠেলাঠেলি, ঠিক তেমনি চলছে হত্যার আগে তনুকে ধর্ষণ করা হয়েছে কি হয়নি তা নিয়ে যেমন খুশি তেমন গল্প বলার রিহার্সেল। যা চলছে তা এই মুহূর্তে ধর্ষণের চেয়েও মারাত্মক।
পচাগলা তনুর মরদেহকে আর কতবার ধর্ষিত হতে হবে! হয়তো এভাবেই একদিন পাতা উল্টে যাবে তনু নামক উপন্যাসটির। কিন্তু তনু কীভাবে মারা গিয়েছিল সেই প্রশ্নের কোনো সমাধান আর পাবে না এই দেশ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)










