আমার জন্মস্থান নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে। শিল্পশহর হলেও মেয়েরা অনেক পিছিয়ে সেখানে। ওই অর্থে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি মেয়েদের। পুরো উপজেলায় খুজলে স্নাতোকোত্তর পাশ মেয়ের সংখ্যা ছেলেদের চেয়ে কমই হবে-আমি নিশ্চিত।
কারণ এই বিংশ শতাব্দীতে এসেও এখনও ছেলের বিয়েতে যৌতুক আশা করেন ছেলের বাবা-মা আর মেয়ে জন্ম নিলে মাথায় হাত পড়ে কন্যার পিতার। সেখানে এখনো বহুবিবাহকে সামর্থ্যের, প্রতিপত্তি আর আভিজাত্যের বহি:প্রকাশ ভাবা হয়। এখনও স্ত্রী নির্যাতনকে স্বামীর অধিকার ধরে নেয়া হয়।
এছাড়াও বহুবিধ কুসংস্কার সেখানে রয়েছে। বাড়ীর বাইরে গিয়ে মেয়েদের পড়াশুনা এখনও ভালো চোখে দেখেন না সেখানকার অভিভাবকরা। বড়জোর রংপুরের কারমাইকেল কলেজ। রাজশাহী কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পরের হিসাব। এর মধ্য থেকেও কিছু কিছু অভিভাবক যে তাদের সন্তানদের জন্য সর্বোচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দেয়নি, তা কিন্তু নয়। অবশ্যই দিয়েছে, কিন্তু তুলনামূলক হারে কম।
তো এমন একটা সামাজিক অবকাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠা আমি এসএসসি দিয়েছি ১৯৯৩ সালে সৈয়দপুর বাংলা হাইস্কুল থেকে। এরপর এইচএসসি। যখন আরো পড়ার বিষয় এলো, তখন বাড়ীর প্রথম পছন্দ ছিলো স্থানীয় ডিগ্রী কলেজ, সৈয়দপুর মহাবিদ্যালয়। মানে হলো এটা্ও অনেক পড়া কিন্তু। এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করা চাট্টিখানি কথা না। বিএসসি ভর্তি হলাম সৈয়দপুর মহাবিদ্যালয়ে। আমিও কিন্তু ঢাকা এসে অনার্স-মাস্টার্স করার কথা ভাবিনি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রংপুর কিংবা রাজশাহীতে অনার্স না পড়তে পারার কোন কষ্ট বা হীণমন্যতা আমার মধ্যে ছিলো না।
গ্রামের মহাবিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী পাশ আমি যুক্ত হলাম এনজিওতে। ঢাকায় এলাম ২০০০ সালে। তখন অল্প অল্প করে বুঝতে শুরু করলাম যে আরও অনেক জানা বাকী আমার। কিন্তু সহকর্মীদের আন্তরিকতা আমার এই জ্ঞানের স্বল্পতাকে কখনও বড় করে দেখেননি। বরং সব সময় সহযোগিতাই করতেন। আঞ্চলিক সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছি চার বছরেরও বেশি সময়। তখন সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে হতদরিদ্রদের সাথেও কাজ করতে হয়েছে। বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ইভেন্ট আয়োজনসহ কখনও প্রশিক্ষক কখনও নিজে প্রশিক্ষণাার্থী হয়েছি।
২০০৫ সালে সালমা সোবহান ফেলোশিপ দিয়ে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি।ডিগ্রী পাশ সাজেদার নতুন জীবন শুরু। এনজিও আর গণমাধ্যমের কাজে ভিন্নতা আছে। এখানে তথ্য নিয়ে কাজ, বাক্য নিয়ে খেলা। তাই জানতে হয় অনেক কিছু। ছোটবেলায় শোনা কবিরাজের গল্পের মতো, যিনি সব রোগের চিকিৎসা জানেন। তেমনি সব বিষয়ের বিশেষজ্ঞের নাম সাংবাদিক। কিন্তু আমার এই স্বল্প জ্ঞান দিয়ে এনজিও চললেও সাংবাদিকতা চলছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
এটা টের পেতে সময় লেগেছে ৭ বছর। তখন আমি ফেলোশিপ শেষ করে দেশবাংলা, ইটিভি ও যমুনা টিভি হয়ে বৈশাখী টিভিতে যোগ দিয়েছি। সেখানকার সহকর্মীদের বেশ কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা। মোস্ট সিনিয়র এক ভাই আমাকে ডেইলি বকা দেন, কোন লেখাই হয় না আমার, কিচ্ছু না। কোথা থেকে পড়াশুনা করেছি-এসব ছিলো নিত্যদিনের ঝারি। বেশির ভাগ সময় বলতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে পড়াশুনা ঠিকমতো করা হয় না আসলে। উনি সব সময় বলতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা গরু ঢুকলেও মানুষ হয়ে বের হয়। আরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দা দিয়ে যে ছাগলগুলো ঘুরে বেড়ায় সেগুলোও মানুষ হয়ে বের হয়। আর তুমি না হইছো মানুষ, না হইছো গরু।
তো, সেই গরু থেকে মানুষ হওয়ার শখ তখন আমার তীব্র হলো। কিন্তু বয়স তো আর বসে নাই। মনের মধ্যে গরু, হইতে চায় মানুষ। ফেসবুকে কথায় কথায় আলাপ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক কলিমুল্লাহ স্যারের সাথে। তিনি বললেন, চাইলে আমি এখনও মাস্টার্স করতে পারি, তা্ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। কিভাবে তা বিস্তারিত বললেন এবং সহায়তাও করলেন।
আমি ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপান স্টাডিজ সেন্টারে। সান্ধ্যকালীন কোর্স, দুই বছরের। দুই বছরে অনেক দেখেছি, শিখেছি, দেখছি এবং শিখছি। ২০১৪-১৫ সেশনে ভর্তি হওয়া এই আমি তাই এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। যেদিন পাশ করে বের হবো ঠিক করে রেখেছি, সেদিন সেই ভাইয়ের সামনে যাবো। জানতে চাইবো গরুটা কি মানুষ হয়েছে? আর আমার মনের বা মেধার কতোটা পরিবর্তন হয়েছে তা জানাবো অন্য কোনোদিন অন্য কোন গল্পে।
শুভ জন্মদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘজীবী হও।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)






