রাজনীতিতে গুপ্ত শব্দটা এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে অভিধানও একটু কনফিউজড। একদিকে ইতিহাস বই খুললে আমরা পাই আনুমানিক ৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উত্তর ভারতে রাজত্ব করা গুপ্ত সাম্রাজ্য, যে সময়েকালকে ‘গুপ্তযুগ’ বলা হয় যখন শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।আর অন্যদিকে আজকের রাজনৈতিক আড্ডায় গুপ্ত মানে ও আসলে কার লোক?
ভাবুন, সেই সময়ের কোনো সম্রাট, ধরা যাক চন্দ্রগুপ্ত যদি টাইম মেশিনে চড়ে আজকের ঢাকায় নামতেন! তিনি হয়তো প্রথমে এই ভেবে খুব খুশি হতেন যে, ওহ, এখনও আমার নাম চলছে! কিন্তু পাঁচ মিনিট পরই তিনি দেখতেন, একদল লোক আরেকদলকে বলছে, ওরা গুপ্ত! সম্রাট গুপ্ত তখন অবাক হয়ে বলতেন, আমাদের সময় গুপ্ত মানে ছিল সাম্রাজ্য, তোমাদের সময় গুপ্ত মানে কেন সন্দেহভাজন?
তারপর তিনি একটা প্রেস কনফারেন্স ডাকতেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতেন, মহারাজ, আপনি কি কখনো হেলমেট বাহিনী পরিচালনা করেছেন?
তিনি বলতেন, আমাদের সময়ে হেলমেট মানে বর্ম ছিল যুদ্ধে, রাজনীতিতে না!
বংশ পরম্পরা বাদ দিন, আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়ায় গুপ্ত শব্দটা একেবারেই অন্যরকম। যেমন কানাডায় গুপ্ত গ্রুপ। ওরা হয়তো রিয়েল এস্টেট, বিনিয়োগ, কর্পোরেট মিটিং এসব নিয়ে ব্যস্ত। ওখানে কেউ যদি বলে গুপ্ত গ্রুপ, মানুষ ভাববে, ওহ, ভালো কোনো কোম্পানি। আর এখানে কেউ বলল গুপ্ত, মানুষ বলবে: একটু থামেন, আগে ক্লিয়ার হই, কোন দলের গুপ্ত?
ভারতে, কিছুক্ষেত্রে বাংলাদেশেও গুপ্ত একটা পদবি। আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুপ্ত বলে ডাকলে তিনজন ঘুরে তাকাবে। দুজন বলবে জি?, আর একজন বলবে রং নাম্বার।
তাদের কেউ মিষ্টির দোকান চালাচ্ছে, কেউ স্টার্টআপ করছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
কিন্তু বাংলাদেশে গুপ্ত শব্দটা এমন এক রহস্যে ঘেরা যে, মনে হয় প্রত্যেক গুপ্তের পেছনে একটা করে সাবপ্লট আছে।
এখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন যে, দল করার আগে হয়তো মানুষকে ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন পাস করতে হবে। একটা ফরম থাকবে:
নাম:
বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়:
পূর্বের রাজনৈতিক পরিচয় (যদি থাকে):
গুপ্ত হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা: (✔ / ✘)
হেলমেট ব্যবহারের দক্ষতা: প্রাথমিক/মধ্যম/অ্যাডভান্স
ধরা যাক দলীয় যোগদানের, ইন্টারভিউ বোর্ডে বসে আছেন তিনজন গুরুগম্ভীর নেতা। একজন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কখনো দুই দলের সভায় একসাথে উপস্থিত ছিলেন? প্রার্থী উত্তর দিলেন: জি স্যার, সেটা ছিল মাল্টিটাস্কিং।
আরেকজন প্রশ্ন করলেন, আপনি কি কখনো নিজের দলের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন? প্রার্থী একটু হেসে বলবেন, স্যার, সেটা ছিল ডিপ কভার অপারেশন!
এখন রাজনীতিতে গুপ্ত হওয়া যেন এক ধরনের সুপারপাওয়ার।
আপনি একসাথে দুই জায়গায় থাকতে পারেন, এক জায়গায় স্লোগান দিচ্ছেন, আরেক জায়গায় খবর পাঠাচ্ছেন। একদিকে আপনি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করছেন, অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে হাসছেন, মিশন সাকসেফুল।
ফলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী? তারা টিভি খুলে দেখেন: এক নেতা বলছেন, আমাদের দলে কোনো গুপ্ত নেই। আরেকজন বলছেন, ওদের অর্ধেকই গুপ্ত।
দর্শক তখন চা খেতে খেতে ভাবেন, তাহলে আসল দলটা কোনটা?
একদিন হয়তো সরকারিভাবে ঘোষণা আসবে, জাতীয় গুপ্ত সনাক্তকরণ কমিশন গঠন করা হলো। কমিশন বসে রিপোর্ট দেবে: দেশে মোট গুপ্তের সংখ্যা এক্স, তবে এদের মধ্যে ওয়াই জন নিজেরাও জানে না যে তারা গুপ্ত।
আরেকদিন হয়তো নতুন একটি দিবস চালু হবে: গুপ্ত দিবস। সেদিন সবাইকে বলা হবে: যারা গুপ্ত, তারা দয়া করে স্বেচ্ছায় সামনে আসুন। কোনো শাস্তি হবে না, শুধু পরিচয়টা ক্লিয়ার হবে।
সেদিন লম্বা লাইন পড়বে। কেউ বলবে, আমি আগে গুপ্ত ছিলাম, এখন ফুলটাইম।
কেউ বলবে, আমি পার্টটাইম গুপ্ত। আর কেউ বলবে, আমি আসলে গুপ্ত না, কিন্তু সবাই সন্দেহ করে, তাই ভাবলাম লাইনেই দাঁড়াই!
শুধু রাজনীতি নয়, রাজনীতির বাইরে সাধারণ জীবনেও গুপ্ত ঢুকে পড়েছে। আড্ডায় বসে একজন বলল, তুই গতকাল অন্য গ্রুপে গেছিস কেন?
অন্যজন উত্তর দিল, আমি গুপ্ত ছিলাম!
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, গুপ্ত শব্দটা আমাদের সমাজে একটা নতুন রূপ নিয়েছে। এটা আর শুধু ইতিহাস আর না, শুধু পদবি না, শুধু ব্যবসার নাম না, এটা এখন একধরনের মানসিক অবস্থা।
প্রাচীন গুপ্তরা স্বর্ণযুগ তৈরি করেছিল। আজকের গুপ্তরা তৈরি করছে কনফিউশন যুগ।
তবে একটা কথা ঠিক এই গুপ্ত রহস্য যতদিন থাকবে, ততদিন আড্ডা জমবে, রাজনীতি গরম থাকবে, আর লেখকদের কলমে রম্যরস কখনো শুকাবে না। গোয়েন্দা কাহিনী ও থ্রিলারে ত অবশ্যই গুপ্ত রহস্য লাগবে।
এত কথা না বলে অবশ্য কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর একটা কবিতার দুটি লাইন বলি: রসভরা রসময় রসের ছাগল, তোমার কারণে আমি হয়েছি পাগল।
গুপ্তভরা দুনিয়া, স্যরি দুনিয়া না; গুপ্তভরা বাংলাদেশে গুপ্ত দেখে বা না দেখে আসলেই ছাগল হয়েছেন অনেকে, হচ্ছেনও অনেক।








