জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপিনাথপুরে জমে উঠেছে ৫শ’ বছরের পুরনো ও দেশের বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার মেলা। মেলায় এবার এসেছে বিজলি, কিরণমালা, রানি, সুইটি, টাইগার সহ বাহারি নামের শত শত ঘোড়া।
দেশি-বিদেশি এসব ঘোড়ার ক্ষিপ্রতা, বুদ্ধিমত্তা, দুলকি চলন, বিদ্যুৎ গতিসহ নানামুখী গুণের কারণে যথেষ্ট কদরও রয়েছে। তাই পছন্দের ঘোড়া পেতে ক্রেতাদের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি।
শুধু তাই নয়; এ মেলাকে ঘিরে পুরো এলাকায় চলছে মেয়ে-জামাই আপ্যায়ন ও উৎসবের ধুম। দূরদূরান্ত থেকে আগত দর্শণার্থী, ক্রেতা ও বিক্রেতার ভীড়ে মুখর মেলা প্রাঙ্গণ। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে এখানে মাসব্যাপী মেলা হলেও নানা কারণে এখন মেলা হয় ১৩ দিন। ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল বেচাকেনাও হয় এ মেলায়।
আয়োজকরা জানান, দেশের একমাত্র ঘোড়া বেচাকেনার মেলা এটি। এ কারণে সারাদেশ থেকে আনা কয়েক হাজার ঘোড়া জড়ো করা হয় এখানে। একে ঘোড়ার মিলনমেলা বললেও অতুক্তি হবে না। ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথপুর মেলার ঘোড়ার হাট। দরদাম ঠিকঠাকের পর একটি খেলার মাঠে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ক্রেতাকে দেখানো হয় ঘোড়ার দৌড়।
মেলা কমিটি জানায়, এ মেলায় ময়মনসিংহ, জামালপুর টাঙ্গাইল, বগুড়া, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘোড়ার আমদানি হয়।
স্থানীয়রা জানান, ৫১২ বছরের পুরনো এ মেলা শুরু থেকেই ঘোড়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পরও মেলায় নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উন্নত জাতের ঘোড়া আসতো। বর্তমানে তাতে ভাটা পরলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘোড় সওয়ারি ও ঘোড়া মালিকরা এ মেলায় আসেন।
ঘোড়া বিক্রেতা আব্দুল আজিজ জানান, ঘোড়াটির বয়স সাড়ে চার বছর। এটি রেসিং ঘোড়া। দ্রুত দৌড়াতে পারে। সাদা-কালো ডোরাকাটা ঘোড়াটির যত্ন সে নিজেই করতো। বাহারি এ ঘোড়াটি এবার মেলায় সর্ব্বোচ্চ ৫ লাখ টাকায় কিনেছেন রাজশাহীর সেকেন্দার আলী নামে এক সৌখিন ঘোর সওয়ারি।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার দমদমা গ্রামের ঘোড়া বিক্রেতা আব্দুল হানিফ জানান, প্রায় সাড়ে আট ফুট উচ্চতার বড় কালো রঙের একটি তাজি ঘোড়া ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি।
সিরাজগঞ্জ সদর থেকে আসা বিক্রেতা আক্কাস আলী জানান, তার ঘোড়ার দাম হেঁকেছেন ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, পরে তা দুই লাখ টাকায় বিক্রি করেন।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার দিওর গ্রামের ঘোড়া বিক্রেতা হাসেম আলী জানান, তিনি ২৫ বছর ধরে মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসেন। এবার তিনি চারটি ঘোড়া এনেছিলেন, ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সব বিক্রি করেছেন।জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার ফিরোজ কবির জানান, তার ঘোড়াটির দাম উঠেছে ৬৫ হাজার টাকা। কিন্তু ৯০ হাজারের কমে তিনি বেচবেন না। এই ঘোড়াটা বিক্রি হলে তিনি আরও দুটি ঘোড়া নিয়ে আসবেন।
ঘোড়া কিনতে আসা গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ইব্রাহিম হোসেন জানান, সকাল থেকেই বেশ কয়েকটি ঘোড়া দেখেছেন। পছন্দও হয়েছে একটি। দামে মিললে কিনে নিয়ে যাবেন।ঘোড়া সওয়ারি ও ক্রেতা-বিক্রেতারা জানান, আগেও তাদের বাপ-দাদারা এ মেলায় ঘোড়া কেনাবেচা করতেন, পূর্ব পুরুষের সূত্র ধরে তারাও আগলে রেখেছেন সেই পারিবারিক ঐতিহ্য। আগে ঘোড়ার মেলায় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ঘোর দৌড়ের বিস্তীর্ণ মাঠ থাকলেও বর্তমানে সেই স্থানটি সংকুচিত হয়ে আসায় ঘোড়া বেচা-কেনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
মেলা কমিটির প্রধান ও গোপিনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে এই মেলা মাসব্যাপী হলেও এখন ১৩ দিন স্থায়ী হয়। এর মধ্যে ৭ দিনই থাকে ঘোড়া ও গবাদিপশুর হাট। বাকি দিনগুলো থাকে জামাই-মেয়েদের পদচারণা। সেই কয়েক দিন মেলায় বসে হরেক রকমের দোকান। এছাড়া থাকে শিশুদের মন জয় করা নাগরদোলা, চড়কিসহ বিভিন্ন ধরনের খেলা। সব মিলিয়ে আনন্দেই কাটে মেলার ১৩ দিন। প্রশাসনের পাশাপাশি মেলা কমিটিও সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। এত পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ ঘোড়ার মেলা উত্তরবঙ্গ তো বটেই দেশের কোথাও নেই।
পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মেদ ভুঞা বলেন, মেলা উপলক্ষে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছে। তাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি আনসার মোতায়েন রয়েছে।







