দল হিসেবে নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়েছে। বিএনপিও তার দীর্ঘ বছরের পরীক্ষিত রাজনৈতিক মিত্রকে হতাশ করেনি। নিজেদের প্রতীকে নির্বাচন করতে ২৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করা জামায়াতের জন্য।
তবে সেই ২৫টি আসনের মধ্যে অন্তত ১৬টি আসনে বিএনপি তার নিজেদেরও একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। সেখানেই তৈরি হয়েছে জটিলতা। প্রশ্ন উঠেছে, আসল ধানের শীষ কার? কোন প্রার্থী পাচ্ছেন বিএনপির প্রতীক? দাড়িপাল্লা প্রতীক হারানো জামায়াতের প্রার্থীরা যে কোনো উপায়েই এখন ধানের শীষ পেতে চাইছে।
কিন্তু বিএনপি মহাসচিব ও ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এটা মানতে নারাজ। তার দাবি এখানে জামায়াতের কেউ নেই।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, জামায়াতের এখানে কেউ নেই। সব ধানের শীষ। সবাই বিএনপির। আমরা সব আসনে এক বা একাধিক প্রার্থী দিয়েছি। সেসব আসনে যেভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে ঠিক একইভাবে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। জনপ্রিয়তা দেখে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।
‘‘এই কঠিন সময়ে আমাদের সবার ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। এটি আমাদের আন্দোলন। এই আন্দোলনে জয়ী হতে না পারলে দেশ ও স্বাধীনতা হুমকিতে পড়বে৷ গণতন্ত্র আর পুনরুদ্ধার করা যাবে না। তাই আমাদেরকে সেভাবে তৈরি হতে হবে।’’
চ্যানেল আই অনলাইনের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জামায়াতের যেসব নেতা বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন, তাদের আসনগুলোতে ২৫টির মধ্যে ৯টি আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। তবে বাকি ১৬টি আসনে একাধিক প্রার্থী দিয়েছে দলটি।
এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জামায়াতের প্রাথী আব্দুল হাকিম। তার সঙ্গে বিএনপি থেকে আছেন মো. আবদুস সালাম ও জুলফিকার মুর্তাজা চৌধুরী তুলা।
দিনাজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে আছেন মোহাম্মদ হানিফ। বিএনপির প্রার্থী নাজমুল হাসান রানা।
দিনাজপুর-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম। বিএনপি থেকে আছেন লুৎফর রহমান মিন্টু ও শাহীনুর ইসলাম মন্ডল।
রংপুর-৫ আসনে জামায়াতের গোলাম রব্বানী এবং বিএনপি থেকে ডা. মমতাজ ও শাহ মো. সোলায়মান আলম।
গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের পক্ষে আছেন মাজেদুর রহমান সরকার। বিএনপি থেকে খন্দকার আহাদ আহমেদ ও মাহমুদুন্নবী টিটুল।
পাবনা-৫ আসনে জামায়াতের ইকবাল হুসেইন। বিএনপি থেকে আছেন- শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও মামুনুর রশীদ খান।
ঝিনাইদহ-৩ আসন থেকে জামায়াতের আছেন মতিউর রহমান। বিএনপির প্রার্থী কণ্ঠশিল্পী মনির খান ও সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম মাস্টারের ছেলে মেহেদী হাসান রনি।
কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের আছেন হামিদুর রহমান আজাদ। বিএনপি থেকে আছেন আলমগীর মোহাম্মদ ফরিদ।
যশোর-২- আসন থেকে জামায়াতের আবু সাঈদ মুহাম্মদ শাহাদত হোসাইন। বিএনপি থেকে আছেন সাবিরা সুলতানা।
বাগেরহাট-৩ আসনে জামায়তের প্রার্থী আব্দুল ওয়াদুদ। বিএনপি থেকে আছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু।
বাগেরহাট-৪ আসন থেকে জামায়াতের আবদুল আলিম এবং বিএনপি থেকে খায়রুজ্জামান শিপন।
খুলনা-৫ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং বিএনপি থেকে ড. মামুন রহমান ও ডা. গাজী আবদুল হক।
সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতের গাজী নজরুল ইসলাম এবং বিএনপি থেকে কাজী আলাউদ্দিন ও হাবিবুল ইসলাম হাবীব।
পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী শামীম সাঈদী। বিএনপি থেকে ব্যারিস্টার সারোয়ার হোসেন ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার।
সিলেট-৬ আসনে জামায়াতের হাবিবুর রহমান এবং বিএনপি আসনে ফয়সল আহমদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট মাওলানা আব্দুর রকিব (ইসলামী ঐক্যজোট)।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী শফিকুর রহমান এবং বিএনপির মামুন হাসান।
যে ৯টি আসনে জামায়াতের একক প্রার্থী ছাড়া বিএনপি আর কারো মনোয়ন দেয়নি তার মধ্যে আছে; নীলফামারী-২ আসনে জামায়াতের মনিরুজ্জামান মন্টু, নীলফামারী-৩ আজিজুল ইসলাম।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে রফিকুল ইসলাম খান, কুমিল্লা-১১: সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে আনম শামসুল ইসলাম, খুলনা-৬ আসনে আবুল কালাম আযাদ, সাতক্ষীরা-৩ আসনে রবিউল বাশার, সাতক্ষীরা-২ আসনে আব্দুল খালেক এবং সিলেট-৫ আসনে ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী।
এ বিষয়ে কিভাবে সমাধানের প্রক্রিয়া কি হবে জানতে চাইলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কথায় আছে, ‘দুঃখ দিনের বন্ধন দৃঢ় হয়’, আমরা কঠিন সময়ে আছি। তাই জেতার জন্য যেখানে যাকে ছেড়ে দেয়ার ছেড়ে দিতে হবে এবং তারা তা করবে। এটি আমাদের দুঃখের দিন। এসময় যখন চূড়ান্ত করতে যাব সব ঠিক হয়ে যাবে৷
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জামায়াত ইসলামীর নেতা জানিয়েছেন, আমরা আশা রাখি আমাদের যেসব আসন দেয়া হচ্ছে সেখানে বিএনপির প্রার্থীরা ছাড় দেবেন। কেননা, এসব আসনে আমাদের প্রার্থীরা বেশি জনপ্রিয়৷
তবে জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সব কিছু চূড়ান্ত হবে বলে জানান এই নেতা৷
২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট।
এরপর গত ২৮ অক্টোবর জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাই দল হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ নেই জামায়াতের।








