গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে বিরল প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ৮৮ জনের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। তবে এই প্রাদুর্ভাবকে এখনই ‘মহামারী’ হিসেবে ঘোষণা করেনি সংস্থাটি।
রোববার (১৭ মে) সংবাদ মাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
এই জরুরি অবস্থা ডব্লিউএইচওর সতর্কতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর। কঙ্গোতে এই বিরল প্রজাতির ভাইরাসের সংক্রমণে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে থাকায় বৈশ্বিক সতর্কতার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে ডব্লিউএইচও।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি আফ্রিকা) গত শনিবার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সংক্রামক এই রক্তক্ষরণজনিত জ্বরে ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩৩৬টি সন্দেহজনক সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই কঙ্গোর স্বর্ণখনি অধ্যুষিত মঙ্গওয়ালু ও রামপারা শহরের বাসিন্দা।
চিকিৎসা সহায়তাকারী সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় পরিসরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। তাছাড়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রাদুর্ভাবকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের এমন একটি জায়গায় ভাইরাসটি কয়েক সপ্তাহ ধরে ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে গৃহযুদ্ধের কারণে এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট ইবোলা প্রজাতিটিও বিরল। তাই এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করাও কঠিন, যার ফলে আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মারা যায়। এরই মধ্যে প্রায় ২৫০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বেশিরভাগ ইবোলা প্রাদুর্ভাব ছোট আকারের হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ২০১৪-১৬ সালের প্রাদুর্ভাবের কথা ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছেন। তখন পশ্চিম আফ্রিকায় ২৮ হাজার ৬০০ জন মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল, যা ছিল এই রোগের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব।
সমগ্র বিশ্বের জন্য ইবোলার সংক্রমণের ঝুঁকি এখনও খুবই সামান্য। এমনকি ২০১৪-১৬ সালের প্রাদুর্ভাবের সময়েও যুক্তরাজ্যে মাত্র তিনটি সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল এবং তারা সকলেই ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের ড. আমান্ডা রোজিক বলেন, “বর্তমান সংক্রমণের পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে এর জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজন।”
সর্বোপরি, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান এবং রুয়ান্ডার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এখনও একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি রয়েছে, যাদের বাণিজ্য ও যাতায়াত সম্পর্কের কারণে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
উগান্ডায় ইতোমধ্যে দুজনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন।
ইবোলা একটি গুরুতর এবং প্রাণঘাতী রোগ, যদিও এটি বিরল। ইবোলা ভাইরাস স্বাভাবিকভাবে প্রাণীদের—প্রধানত ফলভোজী বাদুড়কে সংক্রমিত করে, তবে মানুষ এই ভাইরাসের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হতে পারে।
ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘটানোর জন্য পরিচিত তিনটি প্রজাতির মধ্যে একটি হচ্ছে বুন্দিবুগিও, যা তুলনামূলকভাবে অপরিচিত। এর আগে বুন্দিবুগিও মাত্র দুটি প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে – ২০০৭ এবং ২০১২ সালে, যেখানে এটি আক্রান্তদের প্রায় ৩০ শতাংশের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। বুন্দিবুগিও ইবোলা ভাইরাসের অন্যান্য প্রজাতির মতো নয়। বুন্দিবুগিও-র কোনো অনুমোদিত টিকা বা ওষুধের চিকিৎসা নেই, শুধুমাত্র কিছু পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা রয়েছে।
এটি ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে নিঃসৃত তরল, যেমন রক্ত এবং বমির মাধ্যমে ছড়ায়, তবে সাধারণত উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে এটি ছড়ায়না। ইবোলা ভাইরাসে প্রথম শনাক্ত হওয়া রোগী ছিলেন একজন নার্স, যার মধ্যে গত ২৪ এপ্রিল এর উপসর্গ দেখা দেয়।
ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের ড. অ্যান কোরি বলেন, ” গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে এবং প্রাদুর্ভাবটি অনেক দেরিতে শনাক্ত হয়েছে, যা উদ্বেগজনক।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে যা শনাক্ত ও রিপোর্ট করা হচ্ছে তার চেয়ে সম্ভাব্য অনেক বড় একটি প্রাদুর্ভাবের দিকে ইঙ্গিত করছে বিষয়টি।
কাজেই দ্রুত শনাক্ত করতে হবে যে, কারা সংক্রমিত এবং তারা কাদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিতে পারে। হাসপাতাল এবং অন্যান্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ইবোলার বিস্তার রোধ করতে সেখানে যেই রোগীরা সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত তাদের চিকিৎসা করতে হবে এবং যারা মারা যাবে এবং যাদের দেহে সংক্রামক থাকবে, তাদের নিরাপদে দাফন নিশ্চিত করতে হবে।
ইতোমধ্যে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে এটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে কারণ এটি ডিআর কঙ্গোর একটি সংঘাত-বিধ্বস্ত অংশে ঘটছে, যেখানে ২ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়িঘর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
তবে, ডিআর কঙ্গোর ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় অভিজ্ঞ এবং লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ডক্টর ড্যানিয়েলা মানো বলেন, “এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে এর প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী। এই প্রাদুর্ভাবটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, নাকি এটি এক দশকেরও বেশি সময় আগে যা ঘটেছিল তার পুনরাবৃত্তিতে পরিণত হবে, তা এখনকার প্রতিক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করবে।”







