জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় অনৈক্যের সুর দৃশ্যমান হলো। বিকল্প ধারার নেতা মাহী বি চৌধুরী সম্প্রতি এক আহ্বানপত্র বিতরণ করেন। আহ্বান পত্রটিতে লেখা রয়েছে-
জাতীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি বিকল্পধারা বাংলাদেশ এবং অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দের আহ্বান:
১) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বাধীনতাবিরোধী দল বা ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ঐক্য হতে পারে না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সাথে আমরা জাতীয় ঐক্য চাই।
২) জাতীয় সংসদে কোনো একটি দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। গত ২৮ বছরে দেশবাসী এটা প্রত্যক্ষ করেছে। তাই সংসদে, মন্ত্রিসভায় এবং প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যের রাজনীতির ভিত্তিতেই জাতীয় ঐক্য হতে হবে। এই দাবিকে যারা অগ্রাহ্য করবে তাদের ঐক্য প্রক্রিয়ায় নেয়া হবে না। স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দলকে বা ব্যক্তিকে শরিক রাখলে বিএনপিকে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা যাবে না। স্বাধীনতাবিরোধী দল বা ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত বিএনপি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মঞ্চে স্থান পেতে পারে না। এ জন্য জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্মানিত সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দকে বিএনপির কোনো অনুষ্ঠানে একই মঞ্চে না বসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।
এই আহবান কি বিএনপি মেনে নিতে পারবে? পারবে জামায়াতকে ২০ দল হতে বহিস্কার করতে ও নিজ দলের স্বাধীনতা বিরোধীদের ছুঁড়ে ফেলতে? এ ছাড়াও জাতীয় ঐক্যের বৈঠকে বিএনপি নেতার গোপনে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে মিটিংয়ের তথ্য প্রচার করা নিয়েও শুরু হয়েছে বিবাদ। জাতীয় ঐক্যের বৈঠক থেকে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে কানেক্ট করা হয়েছিল তারেক রহমানকে। ঢাকায় মঙ্গলবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে নবগঠিত যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় চলছিল এই বৈঠক। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তার মোবাইল ফোন থেকেই লন্ডনে কানেক্ট করা হয়েছিল দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।
হোয়াটসঅ্যাপ কানেকশনের মাধ্যমে সরাসরি মিটিংয়ের আপডেট পাচ্ছিলেন তিনি। আর এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে বৈঠকে বচসা বেঁধে যায়। তাতে স্থগিত করা হয় বৈঠক৷
বৈঠকের মধ্যেই খবর আসে লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে বৈঠকের আপডেট যাচ্ছে সরাসরি। এ নিয়ে শুরু হয় হৈচৈ। বি চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ও জানতে চান কে পাঠাচ্ছে তারেক রহমানকে খবর? অল্পতেই জানা যায়, কাজটি করছিলেন বিএনপির নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বি চৌধুরী বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। আর এমন একটি ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বৈঠক স্থগিত করার প্রস্তাব দেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধান আ স ম আবদুর রব। ফলে বৈঠক শেষ হয়ে যায়। জাতীয় ঐক্যের মিটিং চলছিল বাংলাদেশে এর সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকদের উপস্থিতিতে৷এ মিটিংয়ের সরাসরি অাপডেট পেতে লন্ডনে থেকে তারেক রহমান কেন অাগ্রহী হলেন? প্রতিটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়ারই একটি গোপনীয়তা থাকে। বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এই ভূমিকা কি সাংগঠনিক শৃংখলা ভঙ্গ নয়? উদ্ভূত এই সমস্যার সমাধান কি কেবলই বৈঠক স্থগিত?কি বলবেন ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা? ড.কামাল হোসেন চিকিৎসার জন্য বিদেশ চলে গেলেন যে দেশের মানুষদের নিয়ে তিনি রাজনীতি করছেন সেদেশের চিকিৎসা পদ্ধতিতে তার অাস্থা নেই বলে। কিন্তু যাবার অাগে ঐক্য প্রক্রিয়ার চেইন অব কমান্ড নিয়ে কি কিছু বললেন? তবে একটা জিনিস পরিস্কার করে গেলেন যে তিনি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি অাছেন। তার এই মতে ঐক্য প্রক্রিয়ার সকলে কি একমত? যদি তা-ই হয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি কেন?
বহু পথের জল বাতাস খাওয়া ঐক্য প্রক্রিয়ার এই নেতাদের ঐক্য প্রক্রিয়া কি শীঘ্রই অনৈক্য প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে না? ২২ সেপ্টেম্বরের ঢাকা মহানগরের নাট্য মঞ্চের সমাবেশে নাগরিক ঐক্যের অাহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না নির্বাচনের অাগে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছেন। এই দাবি কি কেবলই মঞ্চে উপবিষ্ট বিএনপি নেতাদের খুশি করার জন্য নয় কি? ওয়ান ইলেভেনের দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় অাদালতের রায়ে বেগম জিয়া কারাগারে অাছেন। সরকার কি চাইলেই তাকে মুক্তি দিয়ে দিতে পারে? মান্নার এ দাবি কি অন্যায্য নয়? বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহি বি চৌধুরীর নেতৃত্বে বিকল্প ধারার একাংশ বলছে স্বাধীনতাবিরোধী দল বা ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত বিএনপি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মঞ্চে স্থান পেতে পারে না। তাহলে মহানগর নাট্য মঞ্চের সভায় তারা কিভাবে মঞ্চে ঠাঁই পেল? মাহি বি চৌধুরী তাদের মঞ্চে অাহবানের সিদ্ধান্তের সময় কেন প্রতিবাদ করলেন না?
এখন বলা হচ্ছে কেবল স্বাধীনতা বিরোধী দল নয় ব্যক্তির সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে৷ বিএনপি কি তা পারবে? ২০ দল কি পারবে জামাতকে বাদ দিয়ে ১৯ দল হতে? বিএনপি কি পারবে তার দলের স্বাধীনতাবিরোধী নেতৃত্বকে বহিস্কার করতে? কেউ কেউ বলছে জামাতের সঙ্গে মিশে বিএনপি সাময়িক সুবিধা পেলেও মূলত অসুবিধাকেই স্বাগত জানিয়েছিল সেদিন। আজ বিদেশী মুরুব্বিরাও তাকে জামাত সঙ্গ ত্যাগের পরামর্শ দিচ্ছে। অনেক আশা নিয়ে জাতীয় ঐক্যে এসেও সেই জামাতকে নিয়েই বিড়ম্বনা। বিএনপি নিজ সামর্থ্য বলে সরকার বিরোধী আন্দোলনের কোন মঞ্চ তৈরী করতে না পেরে জাতীয় ঐক্যের ধারায় মিশে গেল। উদ্দেশ্য এর উপর ভর করেই সরকার পতনের ঘন্টা বাজানো। জাতীয় ঐক্যের নেতাদেরও সাংগঠনিক ভিত মজবুত নয়৷ নেই গণভিত্তি ও তাদের নির্ধারিত কোন ভোট ব্যাংক। তাদের আহূত সমাবেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতিই ভরসা। না হয় সমাবেশে নেতা থাকবে কিন্তু কর্মী ও শ্রোতা থাকবে না।
বিএনপি ও জাতীয় ঐক্য প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ভাবনাকেই মূল ধরে পরস্পর পরস্পরের উপর ভর দিয়ে এগুবার চেষ্টা করেছে ৷ আসম আব্দুর রব একসময় আওয়ামী লীগের সাথে মিশে মন্ত্রী হয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘দেশের মালিক জনগণ। কিন্তু দলিল জনগণের হাতে নেই। দেশের দলিল একটি দলের কাছে, একটি ব্যক্তির কাছে জিম্মি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে কথা বলে একরকম, ক্ষমতায় না থাকলে কথা বলে অন্যরকম। তারা দুই রূপ ধারণ করে।
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় অাসে আসম আব্দুর রব তখন তাদের ক্ষমতার সঙ্গী হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। ক্ষমতায় থাকার সময়ে আওয়ামী লীগ যেরকম ভাবে কথা বলে তা অপছন্দের হলে সেসময়ে মন্ত্রী থাকতে পারলেন কিভাবে? জাতীয় ঐক্যের নেতাদের মধ্যে চলছে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের অবিশ্বাস, সন্দেহ ও সংশয়। কামাল হোসেনের বাসায় ডাকা বৈঠকে বি চৌধুরী যান না আবার বি. চৌধুরীর বাসার বৈঠকে কামাল হোসেন যান না। বিএনপিকে জামায়াত ত্যাগের কথা বলায় বিএনপি ৪ টি শর্ত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা যায়। শর্তগুলো হলো-
১. বিএনপি এককভাবে জাতীয় ঐক্যে যোগ দেবে। এতে ২০ দলীয় জোটের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। ২০ দল থাকবে। দু’টো ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্ম থেকে বিএনপি আন্দোলন করবে। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
২. ২০ দলে যারা নিবন্ধিত দল তারা চাইলে জাতীয় ঐক্যে যোগ দিতে পারে। অথবা তারা ২০ দলেই শুধু থাকতে পারে। এ ব্যাপারে কোনো দলকে রাখা বা না রাখার শর্ত দেওয়া যাবে না।
৩. জাতীয় ঐক্যের নেতৃত্ব থাকবে ড. কামাল হোসেনের কাছে। তবে ঐক্যে যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে
৪. জাতীয় ঐক্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেবে। এই সিদ্ধান্তের বাইরে হুট করে কেউ নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারবে না। জাতীয় ঐক্যের যাত্রার শুরুতেই যদি এত মতভেদ ও অনৈক্য থাকে তাহলে এর ভবিষ্যত কী হতে পারে? অবিশ্বাস, সন্দেহের কালো ভূত ভর করেছে এর উপর। বিএনপির ৪ শর্তে এটা পরিস্কার যে তারা জামাতকে ত্যাগ করছেনা। যদি তা-ই হয় তখন বিকল্পধারার আহ্বানের কী হবে? তারা কি তখন জামাতকে মেনে নিয়েই জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে থাকবেন নাকি বেরিয়ে যাবেন? হয়তো অল্প সময়ের ব্যবধানেই মানুষের সামনে সেটা স্পষ্ট হবে৷ জাতীয় ঐক্যের সামনে এই অগ্নিপরীক্ষাই অপেক্ষমান৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







