বইয়ের পাঠক কি কমছে? যদি তাই না হয় তা হলে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে শীর্ষস্থানীয় দুএকটি দৈনিকে প্রায় প্রতিদিনই কেন চেনাজানা কয়েকজন লেখকের বইয়ের বিজ্ঞাপনই চোখে পড়ল? তারা কি নিজেদের বইয়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় গাঁটের পয়সা খরচ করে বা প্রকাশককে অনুরোধ করে বিজ্ঞাপন দিয়েছে প্রায় প্রতিদিন কোনো না দৈনিকের ক্রোড়পত্রে। এমনকি মূল পত্রিকায়ও।
এসব বিজ্ঞাপনের মূল্য নেহায়েতই কম না। সব মিলিয়ে হিসেব করলে দেখা যাবে একেকজন লেখক এই মাসে তার বইয়ের বিজ্ঞাপন বাবদ দু’তিন লাখ টাকা খরচ করেছেন বা প্রকাশককে অনুরোধ করে অর্ধেক অর্ধেক হলেও তো এক দেড় লাখ টাকা খরচ করেছেন, লেখক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য।
যারা সত্যিকারের পাঠক, তারা ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম দিকে খোঁজ করেন বইমেলায় গিয়ে তাদের প্রিয় লেখকের কী কী বই বের হবে এবার মেলায়। এরপর মেলায় ঘুরে ঘুরে বই কেনা শুরু করেন।
রুচিশীল পাঠককে বই কেনার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া আসলে কতটা জরুরি? নাকি সস্তা লেখকেরাই নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন? লেখক হতেই হবে- এমন রক্ত কসম খেয়ে যারা মাঠে নেমেছেন। বিনয়ের সাথে সম্মান দিয়ে বলছি- যাদের বই এমনি চলে, তাদের কথা ভিন্ন।
কিন্তু যাদের বই একসময় পাঠক বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হয়ে কিনেছেন, প্রকাশক দেখেছেন অমুক নতুন লেখকের বই তো চার পাঁচ শ’ চলে তার দুচারটা বই করেই দেখি না, কি হয়। প্রকাশকও প্রথমবার লেখকের নিজ উদ্যোগে বিজ্ঞাপন দেয়ার প্রবণতা দেখে পর পর দুতিন বছর ছেপেছেন। কিন্তু পাঠক যখন সেই লেখকের বই থেকে সরে গেছেন তখনই প্রকাশক পিছিয়ে গেছেন বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়া থেকে।
কিন্ত লেখক তো রক্ত কসম খেয়েছেন, তাকে লেখক হতেই হবে। তাই বিজ্ঞাপন দিয়ে বন্যা বইয়ে দিয়েছেন এবারের বইমেলায়।
খুবই অবাক লেগেছে জনপ্রিয় লেখক বলে দাবিদার এসব লেখকের বই পাঠককে কিনতে খুব একটা দেখাও যায়নি। তাই মনে প্রশ্ন জেগেছে বইয়ের পাঠক কি কমতে শুরু করেছে? নাকি পাঠক ঠিকই প্রকৃত মানসম্পন্ন বইটি খুঁজে ফেরেন বইমেলায়। বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হয়ে তথাকথিত জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের বইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্টলে স্টলে ঘোরেন, ভালো বইটি পেতে।
আমাদের হতাশ করে যখন লোকমুখে শুনি টাকা হলেই আজকাল নাকি লেখক হওয়া যায়। নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করে বই বের করে লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে লেখক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকেন। বই বের হবার আগেই সারা জাগানো উপন্যাস বলে বিজ্ঞাপন দেন। নিজেকে জনপ্রিয় ঔপনাসিক বলে দাবি করেন।
কি যুগ এলো? সবাইকে কেন লেখক হতে হবে?
আমাদের ভাবতেও অবাক লাগে- একজন লেখক বই বের করে বইমেলায় নিজেই ফেরিঅলার মতো সামনে যাকে পায় তার বইটি কেনার জন্য নানাভাবে অনুরোধ করেন। একজন লেখকের সবার আগে থাকা উচিত আত্মমর্যাদাবোধ।
আমরা সেই আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন লেখক চাই। যার লেখনী শক্তি আমাদের টানবে তার পরবর্তী বইয়ের পেছনে। তার বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রয়োজন হবে না। তার জাদুময় ভাষা আমাদের মোহগ্রস্ত করে বইমেলায় ঘুরতে বাধ্য করবে। কোন স্টলে তার বইটি আছে সেটি দেখার জন্য। যিনি নিলর্জ্জের মতো নিজেকে জনপ্রিয় লেখক বলে দাবি করে লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে পাঠককে প্রতারিত করবেন না।
যুগে যুগে শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর সৈয়দ শামসুল হক দুএকজন পেলেই যথেষ্ট। বছর বছর জনপ্রিয় লেখক পয়দা হবার দরকার কি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








