বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যার যে ধারাবাহিকতা তারই পথ ধরে গতকাল ভারতের বেঙ্গালুরুতে সাহসী ও নির্ভীক সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গৌরি লঙ্কেশ তার লেখনির মাধ্যমে প্রকাশ্যেই হিন্দু ডানপন্থিদের সমালোচনা করতেন। হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিতে বিজেপি কিংবা শিব সেনার যে জঙ্গিবাদী আচরণ তার মুখোশ খুলে দিতেন। সেজন্যই টার্গেট হয়েছেন তিনি। বেঙ্গালুরুর পুলিশ কমিশনার বলেন, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে গৌরি যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন বাড়ির ঠিক সামনেই তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ৫৫ বছর বয়সী গৌরি গাড়ি করে বাড়ি ফেরার পর ঠিক বাড়ির দরজা খোলার সময় তাকে লক্ষ্য করে বেশ কাছ থেকে ৭ রাউন্ড গুলি করা হয়। তখন তার বুকে সরাসরি দু’টো আর মাথায় একটা গুলি লাগে। বন্দুকধারীরা মোটর সাইকেলে করে এসেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, পেশাদার খুনি দিয়ে গৌরিকে হত্যা করানো হয়েছে। এবং খুনের আগে তারা এলাকা রেকি করেছিল ও গৌরির দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড নজরে রেখেছিল। তার বাবা প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক গৌরি লঙ্কেশ সবসময়ই নির্ভীক এবং স্পষ্টভাষী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র সদস্যসহ অন্যান্য ডানপন্থি ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের সমালোচনার কারণে যথেষ্ট আলোচিত ছিলেন তিনি। গৌরী লঙ্কেশ তার পত্রিকার মাধ্যমে ‘কমিউনাল হারমনি ফোরাম’ নামে একটি গোষ্ঠীকে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে গেছেন, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে এবং ডানপন্থি হিন্দুত্ববাদের বিপক্ষে মতামত প্রকাশ করা হয়। গত কয়েক বছর ধরেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থিদের সমালোচনাকারী ভারতীয় সাংবাদিকদের সামাজিক মাধ্যমসহ নানা ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক নারী সাংবাদিককেই ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। গৌরি লঙ্কেশের হত্যার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে আরও তিন যুক্তিবাদী ও হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী লেখকের সঙ্গে। নরেন্দ্র দাভোলকার নিহত হন ২০১৩ সালে, এম এম কালবুর্গি নিহত হন ২০১৫ এবং ড. গোবিন্দ পানসারির নিহত হন ২০১৫ সালে। এইসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গৌরি হত্যার মিল রয়েছে। গৌরির মতাদর্শের সঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ মিল ছিল। ধর্মীয় উগ্রবাদীরা দেশে দেশে মুক্ত চিন্তার মানুষদের এভাবে একের পর এক খুন করেই চলেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় উগ্র রাজনীতির ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে তা যেন আরো বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে মুক্ত চিন্তা ও উদার ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকদের উপর হামলা বেড়েই চলেছে। এটা ক্রমাগত চলতে থাকলে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য সমাজ আমরা রেখে যেতে পারবো না। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুযোগে ক্ষমতায় আসা উগ্রবাদী দলগুলো এই হত্যাকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে অচিরেই বিশ্বব্যাপী এইসব হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। এজন্য রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানাই। ভারতের এই ঘটনায় আমাদের সম্মিলিত প্রতিবাদ এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।









