মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা, ধর্মনিরপেক্ষতার আন্দোলন করার কারণে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ার কারণে খুন হবার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িকতার পিশাচের কালো থাবা থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাড়ছে দেশত্যাগকারীর সংখ্যা।
কিন্তু এমনটি হবার কথা ছিলো না। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নবযাত্রার মূল ভিত্তি ছিলো ধর্মনিরপেক্ষতা। প্রত্যাশা, আকাঙ্খা, স্বপ্ন ছিলো উন্নত সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রকাঠামো সৃষ্টির। কিন্তু প্রগতিশীলতার এক বুক আশা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে, প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এই জনপদ হেঁটেছে উল্টো পথে আর ৭৫’এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই উল্টো পথে হাঁটা পেয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এর ফলে প্রগতিশীলতা, মুক্তি ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সামনে রেখে ত্রিশ লক্ষ শহীদ, পাঁচ লক্ষ নির্যাতিত নারী, সাড়ে সাত কোটি মানুষের দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই দেশ-জনপদ পরিণত হয়েছে জঙ্গিবাদের উর্বরভূমিতে।
সমাজের সর্বস্তরে মৌলবাদীদের অবাধ প্রবেশের সুযোগ, ধর্মান্ধ জনগণের অন্ধ আবেগ, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে
রাষ্ট্রীয় নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি, জিয়া সরকার কর্তৃক একাত্তরে যুদ্ধাপরাধীদের পুর্নবাসিত করা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবর্তন, এরশাদ সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ধর্মের আশ্রয় নেয়া, আইএসআইয়ের পোষ্য বিএনপি ও মৌলবাদী জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়া এই দেশে জঙ্গিবাদ প্রসারে ও প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে।
জঙ্গিবাদের এই থাবা আজ নতুন নয়। অঙ্কুর থেকে বৃহৎ বৃক্ষ যেমন বেড়ে ওঠে, তেমনি জঙ্গিবাদ এই দেশে বেড়ে উঠেছে। ১৯৭৪ সালে কবিতা লিখে অনুভূতিতে আঘাতের অপরাধে কবি দাউদ হায়দার, নব্বইয়ের দশকে মৌলবাদীদের আন্দোলনের মুখে প্রগতিশীল লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে হয়েছিলো। বিজ্ঞানমনস্কতার আন্দোলন করার কারণে মৌলবাদীরা অধ্যাপক আহমদ শরীফের ফাঁসি চেয়ে আন্দোলন করেছিলো।
১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কবি শামসুর রাহমান ঢাকায় নিজ বাড়িতে জঙ্গিদের আক্রমণের শিকার হন। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদকে জঙ্গিরা কুপিয়ে আহত করে। ২০০৭ সালে প্রথম আলোর আলপিন ম্যাগাজিনে কার্টুন একে অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গ্রেফতার হন কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমান। ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লেখার কারণে আসিফ মহিউদ্দিনকে ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকার উত্তরায় জঙ্গিরা কুপিয়ে আহত করে।
সে সময়গুলোতে এই ঘটনাগুলোকে প্রশাসন বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেছিলো। বিচার হয়নি এসব কোনো ঘটনার, এমনকি হয়নি কোনো সুষ্ঠু তদন্ত। এসব ঘটনার বিচারহীনতা, জঙ্গিবাদ সম্পর্কে অদূরদর্শিতা ও জিয়া-এরশাদ-বিএনপির জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা থেকেই এই দেশে শক্তিশালী শিকড় গেঁড়ে বসে মৌলবাদী শক্তিগুলো, এই দেশ পরিণত হয় জঙ্গিবাদের শক্তিশালী আস্তানায়।
২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে সূচিত শাহবাগ আন্দোলনকে বানচাল করতে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, বেরিয়ে আসে জঙ্গিবাদের নগ্ন চেহারা। জঙ্গিদের হিংস্রতায় ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় খুন হন ব্লগার রাজিব হায়দার, ০২ মার্চ সিলেটে খুন হন ব্লগার জগৎজ্যোতি তালুকদার, ০৯ মার্চ মিরপুরে আহত হন একটিভিস্ট সানিউর রহমান, ০৯ এপ্রিল বুয়েট ক্যাম্পাসে বুয়েটের ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপকে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করে, ১১ অাগস্ট বুয়েটের ছাত্র ব্লগার তন্ময় আহমেদ জঙ্গি হামলায় মারাত্মক আহত হন।
২০১৪ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামে রাহি-উল্লাস জঙ্গি গোষ্ঠী শিবিরের হামলায় আহত হন, ২৪ জুন জঙ্গি হামলায় অ্যাকটিভিস্ট রাকিব মামুন আহত হন, ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারে অ্যাকটিভিস্ট ছাত্র আশরাফুল আলমকে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করে, ১৬ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এ কে এম শফিউল ইসলামকে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করে।
২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের নার্সিং ইনস্টিটিউটের লেকচারার অঞ্জলি দেবী চৌধুরীকে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করে, ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে জঙ্গি হামলায় খুন হন বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়, সাথে গুরুতর আহত হন মুক্তমনা লেখিকা বন্যা আহমদ, ৩০ মার্চ অফিস যাওয়ার পথে খুন হন অবিশ্বাসী লেখক ওয়াশিকুর বাবু, ১২ মে সিলেটে বিজ্ঞান লেখক অনন্ত বিজয় দাসকে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করে, ০৭ অাগস্ট ঢাকায় নিজ বাসায় জঙ্গিদের হাতে খুন হন অ্যাকটিভিস্ট নিলয় নীল, ৩১ অক্টোবর ঢাকায় জাগৃতি প্রকাশনীর ফয়সাল আরেফিন দীপনকে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করে, একই দিনে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর টুটুল, ব্লগার রণদীপম বসু ও কবি তারেক রহিম জঙ্গি হামলায় আহত হন।
জঙ্গিদের হাতে নিহতের এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলেন একটিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদ, ০৬ এপ্রিল ২০১৬ তারিখ রাতে তাকে ঢাকায় কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। একের পর এক মুক্তমনা, অবিশ্বাসী, ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞানমনস্ক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনকারীদের হত্যা করছে জঙ্গিরা। কিন্তু এসব খুনের তদন্তে অগ্রগতি শ্লথ; ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিচারহীনতার আশংকা। স্বাভাবিক কারণেই এই বিচারহীনতা জঙ্গিদের সাহস বাড়িয়ে দেবে।
জঙ্গি উত্থানের ভয়াবহ চেহারা আমরা দেখেছি ২০১৩ সালের ০৫ মে। ব্লগার, মুক্তমনা ও অবিশ্বাসীদের হত্যা শুধু নয়, মৌলবাদের থাবায় অাক্রান্ত হয়ে এসেছে বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া, সুফি ও শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষরাও। মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বাংলাদেশে তাদের বিশাল বিষবৃক্ষ বড় করেছে; এখন অপেক্ষা করছে, শক্তি সঞ্চয় করছে চূড়ান্ত আঘাত হানার।
এখনই যদি এই বিষবৃক্ষ উপরে ফেলা না হয়, তবে একাত্তরে রক্তের দামে কেনা এই বাংলাদেশ আর থাকবে না। মৌলবাদী অপশক্তির আগ্রাসনে পরাজিত হবে বাংলাদেশ। সরকার-প্রশাসন যত তাড়াতাড়ি এটি বুঝবে ও ব্যবস্থা নেবে ততই মঙ্গল। তা না হলে বাংলাদেশ অচিরেই পশ্চাদপদতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







