বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৬ জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৬ এপ্রিল রাতে খুন হলেন ব্লগার ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পরিষদের সিলেট জেলা শাখার তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক নাজিমুদ্দিন সামাদ। শুধু ব্লগাররাই নয়, খুন ও হামলার শিকার হচ্ছেন প্রকাশকেরাও।
গতকাল (৬ এপ্রিল) রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নাজিমুদ্দিন বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পরিষদের সিলেট জেলা শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলেন।
নিহত নাজিমুদ্দিন সামাদ (২৬) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সান্ধ্যকালীন ছাত্র ছিলেন। নাজিমুদ্দিন সামাদের ওপর আক্রমণের সময় তার সঙ্গে থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাউথ ইস্টের শিক্ষার্থী নাজিবের ওপরও আক্রমণ হয়। সৌভাগ্যক্রমে নাজিব বেঁচে যান।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচার ফাঁসির দাবিতে উত্তাল শাহবাগের আন্দোলন, তখন ১৫ই ফেব্রুয়ারি এই শাহবাগ আন্দোলনেরই এক কর্মী আহমেদ রাজিব হায়দার দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে নিহত হন।
রাজধানীর মিপুর ১১ নম্বর এর পলাশ নগর এলাকায় নিজ বাসার সামনে ওই ব্লগারকে জবাই করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাজীব থাবা বাবা নামে ব্লগে লেখালিখি করতেন। এই হত্যাকাণ্ডটিই ছিল ব্লগে লেখালেখির অপরাধে বাংলাদেশে প্রথম কোনও হত্যাকাণ্ড।
রাজীব হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পর ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে দুর্বৃত্তরা অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে কুপিয়ে জখম করে। আহত অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিজিৎ। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও হামলায় মারাত্মক আহত হন। 
অভিজিৎ ছিলেন মার্কিন প্রবাসী বাংলাদেশী। তিনি মুক্তমনা নামে একটি ব্লগ সাইটের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যেখানে বিজ্ঞান বিষয়ক নানা লেখালেখি করা হতো।
অভিজিৎ রায়কে হত্যার এক মাসেরও কম সময়ের মাথায় ২০১৫ সালের ৩০শে মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে ঢাকার তেজগাঁও এলাকার একটি সড়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকায় বাসার ৪০ গজ দূরে তিন দুর্বৃত্ত তাকে হত্যা করে।
এরপর ২০১৫ সালের ১২ মে ঢাকার বাইরে সিলেটে ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তদের হামলায় খুন হন ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী অনন্ত বিজয় দাশ। হত্যাকাণ্ডের দিন অনন্ত সকাল ৯টার পর সুবিদবাজারের বনকলাপাড়া এলাকায় তার বাসা থেকে বেরিয়ে শহরের দিকে আসার সময় হামলার মুখে পড়েন।
চার অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে আহত করে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অনন্ত বিজয় দাশ মুক্তমনা নামে একটি ব্লগে লিখতেন এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান বিষয়ক একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
লেখক অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাসের মাথায় সিলেটে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ প্রকাশ্যে রাস্তায় খুন হওয়ার পর তিন মাস না পেরোতেই ঢাকায় আরেক ব্লগার নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় নিলয়কে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা, নিলয় গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন।
২০১৫ সালের ৭ই আগস্ট জুমার নামাজের পর পূর্ব গোড়ান টেম্পোস্ট্যান্ডের কাছে ৮ নম্বর রোডের ১৬৭ নম্বরের পাঁচতলা ভবনের পঞ্চম তলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টেবর রাজধানীর লালমাটিয়ায় ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ দুই জনকে কুপিয়ে আহত করে। 
এর চার ঘণ্টার মাথায় শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডেই নিহতদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আর এসব হত্যাকাণ্ডের পর নামে-বেনামে দায় স্বীকার করে মৌলবাদী কয়েকটি সংগঠন। এরমধ্যে কয়েকটি হামলার দায় স্বীকার করে আইএস। তবে সরকার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সেই দাবি নাকচ করে বলে, বাংলাদেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই।







