চোখ মানুষের অমূল্য সম্পদ। চোখের সাহায্যেই আমরা দেখি, পৃথিবীর যাবতীয় সৌন্দর্য উপভোগ করি। মুগ্ধ হই। চোখের সমার্থক শব্দাবলি হচ্ছে- অক্ষি, আঁখ, আঁখি, চক্ষু, চোখ, দর্শনেন্দ্রিয়, নয়ন, নেত্র, লোচন। আর এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে- eye, oculus, optic ইত্যাদি। চোখ মানেই জগতের আলো। আমাদের কর্মব্যস্ত জীবনে চোখের ভূমিকা অপরিসীম। যারা দেখতে পান না, তারাই কেবল জানেন বেঁচে থাকার জন্য চোখ কতোটা অপরিহার্য!
সুন্দর চোখ অনেক না-বলা কথা বলে দেয়। তুখোড় মৌনতায়ও বুঝে নেওয়া যায় মনের ভাষা। তবে সে ভাষা পড়তেও জানা চাই। সুন্দর চোখ দেখলে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। আর কাজল কালো চোখ দেখলেই তার রেখায় হয়তো মন আঁকতে চায় অদ্ভুত কোনো জোছনা! কথা না বললেও শুধু চোখের দৃষ্টিই বলে দিতে পারে মানুষের রাগ, দুঃখ, ভয়, অনুভূতি, ভালোবাসা, অভিমান, সত্যি, মিথ্যের মতো মনের নানা কথা। চোখের নীরব ভাষা নাকি হাজারো শব্দের তুলনায় জোরালো। ওই চোখ নিয়ে কবির যত কাব্য। ‘পাখির নীড়ের মতো চোখের বনলতা সেন’কে নিয়ে আজও মানুষের কল্পনার অন্ত নেই। মনের কথা বলতে পারা সে চোখের ভাষা সহজ করে তুলতে পারাটাও কম কৃতিত্বের নয়।
চোখ কিংবা চোখের ভাষার গুরুত্ব আমরা কেউ বুঝি, কেউ বুঝিনা। ‘যে আগুনে পুড়ি’ সিনেমায় খন্দকার নুরুল আলমের সেই অবিস্মরণীয় গানে চোখের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে: ‘‘চোখ যে মনের কথা বলে/চোখে চোখ রাখা শুধু নয়/চোখের সে ভাষা বুঝতে হলে/চোখের মত চোখ থাকা চাই।/ছোট্ট এ মন কখনও চোখে/অনুরাগের পত্র লেখে।/চিঠির সে ভাষা বুঝতে হলে/মনের মত মন থাকা চাই।/তাই তো এ চোখ কখনও হাসে/অশ্রু জলে কখনও ভাসে।/ভাবের সে ভাষা বুঝতে হলে/ছবির মত ছবি আঁকা চাই।’’
সত্যি, চোখের ভাষা বোঝার মতো, পড়ার মতো চোখ থাকতে হয়, মন থাকতে হয়। তা আমাদের কয়জনের আছে?
কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিকরা সব সময়ই চোখের জয়গান গেয়েছেন। চোখ নিয়ে অগণিত কবিতা, গান রচিত হয়েছে। যৌবনে আমাদের মুখে মুখে ফিরতো কিছু গান, তার মধ্যে রয়েছে: ‘নীলাঞ্জনা ঐ নীল নীল চোখে চেয়ে দেখনা তোমার ঐ দুটি চোখে আমি হারিয়ে গেছি আমি বোঝাতে তো কিছু পারি না..।’ মনে পড়ে মান্না দের গাওয়া সেই গান-‘বন্ধুরা সব বলে এমন ধারা হলে চোখ নাকি আর সারেনা..!’ কৃষ্ণকলির কণ্ঠে আমরা শুনেছি ‘বন্ধু তোমার চোখের মাঝে চিন্তা খেলা করেৃ/বন্ধু আমার মন ভাল নেই, তোমার কি মন ভাল?’
মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে বেজে চলে রবীন্দ্রনাথের গান: ‘কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না শুকনো ধুলো যত,’ কিংবা ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে/অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহিরে..!’ কানে বাজে নজরুলের সেই গান, ‘চোখ গেল চোখ গেল কেন ডাকিস রে/চোখ গেল পাখি রে/তোর চোখে কাহারো চোখ পড়েছে নাকি রে/চোখ গেল পাখি রে’।
চোখ নিয়ে আসল সত্য আমরা খুঁজে পাই সৈয়দ আবদুল হাদীর গানে-‘চোখের নজর এমনি কইরা একদিন খইয়া যাবে/জোয়ার ভাটায় পইরা দুই চোখ নদী হইয়া যাবে/পোড়া চোখে যা দেখিলাম তাই রইয়া যাবে।’ তাইতো চোখকে বাঁচিয়ে রাখার সাধ মানুষের চিরন্তন। এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া গানে যার প্রতিধ্বনি -‘আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি/এই চোখ দুটি মাটি খেয়ো না/আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ মিটবে না গো মিটবে না!’
‘দেখার সাধ’ মানুষের চিরন্তন। তবে নির্মম সত্য হলো, জগতে সবাই দেখতে পান না। আমাদের সমাজে অনেকে আছেন যারা খালি চোখে স্পষ্ট সব কিছু দেখতে পান। কারও আবার চশমা লাগে। আবার অনেকে আছেন, যারা চোখে একটুও দেখতে পান না। চশমা দিয়েও না। যাদের আমরা অন্ধ বলি। তবে আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন যারা চোখ থাকতেও অন্ধ। তারা ইচ্ছে করে দেখেন না। এই দেখা না-দেখা নির্ভর করে যতোটা না চোখের উপর, তার চেয়ে বেশি মনের উপর। অনুভব-অনুভূতির উপর। সংবেদনশীলতার উপর। এই সংবেদনশীলতা যদি না থাকে, তাহলে চোখ থেকেও খুব একটা লাভ হয় না।
অনেকে চোখ থাকতে অন্ধ হলেও আমাদের ভাষা ও সাহিত্যে চোখ নিয়ে অনেক বাক্য আছে। সেসব বাক্যের আলাদা আলাদা মানে আছে। আমরা চোখ দিয়ে যেমন দেখি। আবার চোখও দেখি। ডাক্তাররা রোগীর চোখ দেখেই (চোখ পরীক্ষা করে) চশমা নিতে বলেন। অনেক অবশ্য শখ করে ‘রঙিন চশমা’ ব্যবহার করে। এই চশমা দিয়ে দেখলে সব কিছু রঙিন মনে হয়। অভিযোগ আছে যে, আমাদের নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিবিদরা অনেক ক্ষেত্রে রঙিন চশমা দিয়ে দেশকে, দেশের মানুষকে, সমাজকে দেখেন বলে প্রকৃত চেহারা দেখতে পাননা। যদিও এমন অভিযোগ শুনলে তারা চোখ পাকান। চোখ রাঙান। এই চোখরাঙানিতে আমরা অনেক সময় ঘাবড়ে যাই। তাইতো ঝামেলা এড়াতে চোখ নামিয়ে থাকি। সমাজের অন্যায়-অবিচার-স্বার্থপরতা-মূঢ়তা দেখেও অনেক সময় আমরা চোখ বুজে থাকি।
এটাকে সুবিধাবাদও বলা যায়। আমাদের মধ্যে সুবিধাবাদিতা আছে। চালাকি আছে। তাইতো আমরা অনেক সময় দেখেও না দেখার ভাণ করি। চোখঠেরে (চোখ দিয়ে ইশারা করে) নিজেদের মধ্যে মাঝেমধ্যে আলাপ-আলোচনা করি বটে। কিন্তু তাতে আমাদের মনের চোখ, বোধের চোখ খোলে না।
আমরা সাদা চোখেই দেখি, আমাদের সমাজের হর্তা-কর্তা-বিধাতা যারা, যে যেখানে শীর্ষে আছেন, তারা চোখের মাথা খেয়ে বসে থাকেন। প্রয়োজনে চোখ উল্টান। আবার প্রয়োজন মতো মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এদিকে বার বার প্রতারিত হয়েও আমাদের চোখ ফোটে না। এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে পথ চলেন। তাদের এই প্রতারণা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও চোখের মাথা খাওয়া এই সমাজের মাথারা চোখ খোলেন না। তাদের চোখে চোখে রেখে যাবতীয় কাজের জবাবাদিহি নেওয়া-সেটাও হয় না। আমাদেরও চোখ খোলে না। শিক্ষা হয় না। চোখে ঠুলি পড়ে আমাদের জীবন চলে।
সমাজে কেউ কেউ আছেন যারা সামান্য একটু কিছু পেলেই খুশি। তাদের খুব একটা চক্ষু লজ্জাও থাকে না। আবার কেউ কেউ আছেন যাদের অন্যের সুখ দেখলে চোখ টাটায়। এই শ্রেণির মানুষ অগত্যা নিজের চোখ কচলিয়ে সুখ খোঁজেন!
অনেকে আছেন যারা ‘জনদরদি’ সাজেন, বড় বড় বুলি আওড়ান কিন্তু সাধারণ মানুষকে চোখের দেখাও দেখেন না। তারা কেবলই ধান্দায় থাকেন কীভাবে সাধারণ মানুষের হক মেরে বড়লোক হওয়া যায়। চোখে আঙুল দিয়ে তাদের ভুলগুলো দেখিয়ে দিলেও তারা দেখতে বা বুঝতে চান না। এসব নিয়ে কথা বললে চক্ষুশূল হতে হয়। তারা চোখ কপালে তোলেন!
তাদের অনেকেই চোখ ধাঁধানো জীবনযাপন করেন। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতিহীন এই শান-শওকত দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হয়। কিন্তু যারা অনিয়ম-দুর্নীতিকে সঙ্গী করে বিলাসী জীবনযাপন করেন, তারা চোখ বুজে থাকেন। অনেক সময় মনে হয়, তাদের বুঝি চোখের পর্দাই নাই। সমালোচনাকারীকে তারা চোখের বালি মনে করেন। তাদের রক্তচক্ষু এড়াতে অনেকে পাখির চোখে সমাজকে দেখেন। অক্ষম আক্রোশে তাদের শুষ্ক চোখ কেবলই জলে ভিজে যায়!
এ সবের বাইরে সম্প্রতি পুলিশের টিয়ারশেলে একজন ছাত্রের চোখে আঘাত পাবার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নিতে গিয়ে পুলিশের ‘কাঁদানে গ্যাসের শেলে’ তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমানের চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর চোখের আলো চিরতরে হারিয়ে যেতে বসেছে। বিষয়টি নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্দিকুরের চোখের আলো ফেরাতে সরকারি উদ্যোগে তাঁকে ভারতের চেন্নাইয়ের শংকর নেত্রালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ডাক্তাররা বলছেন, তাঁর চোখে আলো ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও দেশবাসীর সম্মিলিত প্রত্যাশা: সিদ্দিকুরের চোখে আলো ফিরে আসুক! সে আবার দেখতে পাক।
রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীর বর্বরতায় একটি ছেলে চোখ হারাতে বসেছে, এর চেয়ে নির্মম-নিষ্ঠুর ও অন্যায় আচরণ আর কী হতে পারে? এর প্রতিকারই বা হবে কীভাবে? এ কেমন দেশে বাস করছি আমরা, যেখানে প্রতিবাদ করলে চরম শাস্তি পেতে হয়? প্রতিবাদ করতে গেলে মানুষকে চোখ, মুখ, মাথা এমনকি প্রাণ হারাতে হবে?
পুনশ্চ: কারও চোখের আলো নিভিয়ে দিতে নয়, আমাদের সম্মিলিত ভূমিকা হোক প্রত্যেকের চোখের আলো অটুট রাখার সাধনায় নিবেদিত!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









