‘আমরা নতুন যৌবনেরই দূত’ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ১৫৮ জন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থী, বিভিন্ন পেশাজীবী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ-চীন যুব ক্যাম্প, ২০১৯-এ অংশগ্রহণ করি। সবার চোখে মুখে নতুন কিছু দেখা, জানা ও শেখার এবং নিজের দেশের সংস্কৃতি সুদূর চীন দেশে ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্ন। এ লক্ষ্যে ১২ দিন ব্যাপী কুনমিংয়ে শহরের ইউনান প্রদেশে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল চীনা সরকার, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের সদর দপ্তর। সাথে আয়োজক ছিল ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় এবং সহকারি আয়োজক হিসেবে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শান্তা-মারিয়াম কনফুসিয়াস ক্লাসরুম।
আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ২২ আগস্ট, ১৯-এ বারিধারায় চীনা দূতাবাসের অডিটোরিয়ামে। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীন রাষ্ট্রদূত মি. লিজিং মিং, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আতিকুল ইসলাম, আরটিভির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আশিক রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঝো মিংতং (মিন্ডি লাউশি) সহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ, দূতাবাসের নিযুক্ত কর্মচারীরা, অংশগ্রহণকারী এবং তাদের অভিভাবকবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে মান্যবর চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তৃতায় চীন-বাংলাদেশের সম্পর্ক তুলে ধরেন এবং বলেন: ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের চুক্তির মাধ্যমেই তৃতীয়বারের মতো এবারও শিক্ষার্থীরা যুব ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করবে। কুনমিং (চির বসন্তের নগর) ইউনান প্রদেশ তোমাদের সবার জন্য অপেক্ষা করছে, আশা করি সবার ক্যাম্প সুন্দর হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন: তিনি ইউনানের নাগরিক। প্রত্যেকের বক্তব্যেই অংশগ্রহণকারী সবার প্রতি নানা দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। পরিচিতিমূলক এ অনুষ্ঠানে ক্যাম্পারদের উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়।
চারটি দলে প্রায় ১৫৮ জন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৫ আগস্ট কুনমিংয়ে যায় চীনের ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সে ২টি দলে ৭৪ জন (অ্যাম্বাসি দল ও শান্তা মারিয়াম দল) পৌঁছে। ২৬ আগস্ট একই বিমানে ঢাকা থেকে প্রায় ৮৪ জন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দল ও নর্থ সাউথের দল) কুনমিং চাংশুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাই। বিমান থেকে নেমেই বিমানবন্দরের পরিবেশ দেখে মুগ্ধ। অফিসিয়াল কার্যক্রম শেষে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আমাদেরকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে আসে দলের পরিচিতির প্ল্যাকার্ড হাতে। খুবই সুশৃঙ্খলভাবে ইউনানের পর্যটন বাসে করে মেপল প্যালেস হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে গিয়ে রাতের খাবারের আপ্যায়ন ছিল অসাধারণ। হালাল এবং চীনের খাবারের সমারোহ ছিল প্রতিটি দিন। অন্যান্য বিষয়ের সাথে এক কথায় খাবার এবং থাকার ব্যবস্থা ছিল অসাধারণ। খাবারের সময় চপস্টিক ব্যবহার চাইনিজদের মধ্যে দেখা যেত। উৎসাহী ক্যাম্পাররাও চপস্টিক ব্যবহার করেছেন। তারা গরম খাবার খেতে পছন্দ করেন, খাবারের সময় পানি পান করেন না, এ সময় চা থাকে।
সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে নাস্তা শেষ করে শুরু হতো দিনের কার্যক্রম। হোটেলের সামনে সারিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে গুনে গুনে সবাইকে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হতো। এখনো কানে লাগছে, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যারা স্বেচ্ছাসেবক বন্ধু ছিলেন তাদের মুখে (DU Two Lines, Follow me) ‘দুই সারিতে ঢাবি, তাড়াতাড়ি চলো’ বাক্যগুলো। চারটি বাস দাঁড়িয়ে থাকত আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। চারটি দলের সবার উপস্থিতিতে বাস ছেড়ে যেত।
প্রথম দিন ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে নিয়ে আমাদের সবার সাথে প্রশিক্ষক এবং স্বেচ্ছাসেবকরা পরিচিত পর্ব সেরে গিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে ক্যাম্পাস পরিচিতি ও গুরুত্বপূর্ণ সেশন করানো হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে দুপুরের খাবারের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ক্যাম্পের সূচনা পর্ব। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থী যিনি ইউনানে পড়াশুনা করছেন, মেশকাত শরীফ এবং ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিউ হুয়ুয়ান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. লিচেনইয়াংগ ও বাংলাদেশের দূতাবাস তৌহিদুল ইসলাম। উভয়েই বক্তৃতায় বাংলাদেশ চীনের সুসম্পর্ক, দেশের উন্নয়নে তরুণদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
এরপর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় সেখানে দু দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি বিনিময় মঞ্চায়ন করা হয় এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্য দু’জন নিজেদের অভিব্যক্ত তুলে ধরেন সাথে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ ভাষায় অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।
হাদিসে উল্লেখ আছে, “শিক্ষার জন্য সুদূর চীন দেশে যেতে হলেও তবে সেখানে যাও।” হ্যাঁ, এ ১২ দিনে কী কী শিখে আসলাম এবং দেখে আসলাম তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করলাম। চীনা ভাষা শিক্ষা কোর্স, কুংফু শিক্ষা, কুংফু ফান নাচের শিক্ষা, বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্বরূপ বৃক্ষরোপণ করা হয় ক্যাম্পাসে, স্মার্ট চায়না সিরিজ মুভি, ইউনান প্রভিন্স মিউজিয়াম প্রদর্শন, যেখানে এ প্রদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য ইতিহাস জানা যায়, পুরাতন ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সফর ও সেখানে চীনের ৫৬ টি নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুর পরিচিতিমূলক সেমিনার হয়, কুনমিংয়ের ন্যাশনাল অ্যাডভার্টাইজিং পাইলট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পরিদর্শন, শুক্রবারে নামাজ আদায়ের জন্য শুনচং মসজিদে গমন, ইউনানের সাইলন জেলার স্টোন ফরেস্ট ভ্রমণ। ছোট বড় পাথর ও সবুজে শোভিত এই পর্বতটি ২০০৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বা বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের স্বীকৃতি পাওয়া।
সাংস্কৃতিক শিক্ষা কোর্সে বাংলাদেশের ও চীনের ফোক গানের আসর ও পরিচিতি উঠে আসে, ইউনান জাতির এরোবিকস অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা প্রদান করা হয়, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় বনাম বাংলাদেশের ইয়ুথ ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রীতি ফুটবল খেলাও অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। সেখানে ভলিবল খেলেছেন কিছু ক্যাম্পার।
আমরা পরিদর্শন করেছি ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যায়ামাগারেও। ইউনানের প্রাচীন শহর ডালিতে প্রথমবারের মতো বুলেট ট্রেনে করে যাওয়ার এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা, এখানে আমাদের দক্ষ গাইড মি. রজারের সহায়তায় নির্বিঘ্নে ডালি যাত্রা শুভ হয়। ডালি মিডল টাউন স্কুল পরিদর্শন; তবে শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে ডাস্টবিন নিয়ে যাচ্ছে পরিষ্কারের জন্য, সুশৃঙ্খলভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের লেকচার শুনছে চোখে পড়ার মতো ছিল এবং স্কুলের আয়োজনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের ক্রিকেট ও অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে কথা বলা হয়।
এক পাশে পাহাড়ে মেঘে ছুঁয়ে যাচ্ছে অপর পাশে ইরহাই লেক এক অন্যরকম পরিবেশ। ইরহাই ক্রুজে করে দ্বীপে পরিভ্রমণ, ডালিতে হাতে-কলমে বাটিক শিক্ষা… এর আগে যে ক্যাম্পাররা হাতে কখনো সুঁই ধরেনি তারাও এ প্রশিক্ষণ নিয়েছে, ইউনানের ঐতিহ্যবাহী ‘চা’ প্রস্তুতি ও চা পান পর্ব, শুকনো ফুলের তোড়া বানানোর প্রশিক্ষণ। এছাড়া তাদের কাছ থেকে রুটিনের বাহিরে থেকে যা শিখলাম পরিশ্রম, ধৈর্য, নিয়মানুবর্তিতা, হাসিমুখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া, ছাত্র-শিক্ষক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সময়ের কাজ সময়ে করা, সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়া সকাল বেলা উঠে যাওয়া, নির্দিষ্ট সময়ে দিনের আলোতেই আহার শেষ করা। এছাড়া রাস্তা-ঘাটের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, হর্নমুক্ত, জ্যামমুক্ত ও সবুজ সমারোহের রাস্তাঘাট। আমরা আমাদের চীনা ভাষার শিক্ষক লিলি লাউশি ও ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবক বন্ধুদের (শুয়ে ফান, ক্যামেলিয়া, অপরাজিতা, হানটিংদেরকে) বাংলা ভাষায় আমাদের জাতীয় সংগীত, আমরা করবো জয় গান, কিছু ফলের নাম, কিছু বাংলা শব্দ শেখানো, বাঙালি মেয়েদের মতো উনাদের সবাইকে ঐতিহ্যবাহী টিপ ও চুড়ি এবং শুয়ে ফানকে গামছা উপহার প্রদান করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দল থেকে।
সর্বোপরি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। এ সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে অবস্থিত চাইনিজ দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি মহোদয় ইয়্যুচিয়া পিং, কনফুসিয়াস হেডকোয়াটার্সের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। এতে অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন ইউনানের শিক্ষার্থীরা ও বাংলাদেশি ক্যাম্পাররা চাইনিজ, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় উপস্থাপনা করেন।
২ সপ্তাহব্যাপী আয়োজন কেমন ছিল প্রত্যেক দল থেকে একজন করে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। সাথে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন হয়। সেখানে গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটিকা এবং ফ্যাশন শোতে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিজয় দিবস সহ ষড়ঋতু ও কৃষ্টি তুলে ধরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দল বিশেষভাবে পিঠা-পুলি দিয়ে আমন্ত্রিত অতিথিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। এতে বাঙালিদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও অতিথি পরায়ণতার প্রকাশ পায়।
গত ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ যুব ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীরা সফলভাবে ক্যাম্প করে একরাশ স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরি। কিন্তু বাংলাদেশে ফেরার আগে কুনমিং এয়ারপোর্টে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কয়েকদিনে ভিনদেশি বন্ধুদের এত কাছে নিয়ে আসতে পারব এবং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়, উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ভাইবোনদের আপন করে পাওয়াটা অবিশ্বাস্য ছিল।
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি বাংলাদেশ ও চীন সরকারকে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যারকে, কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঝো মিংতং (মিন্ডি লাউশি), অন্যান্য শিক্ষককে বিশেষ করে চি ইউশুয়ে ও মোহাম্মদ রজিবুল ইসলাম লাউশি, আমার পালি এন্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের, আমার সাথে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের চল্লিশ জন ভাই-বোনদের এবং এ ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য যারা আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আশা করি ক্যাম্প থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজে লাগাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। সবার এবং বাংলাদেশ-চীনের সুসম্পর্ক দীর্ঘ হোক, এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








