ভৌগলিক দিক দিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবগুলো দেশ। জল, স্থলপথে বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় দেশ। এদেশের এঁটেল-দোঁআশ মাটি, পরিশুদ্ধ বাতাস আর মিঠা পানির চাহিদা বিশ্বজুড়েই। রূপসী বাংলা এক অর্থে তাই পুরুষতান্ত্রিক শাসক গোষ্ঠীর কুনজরে। অন্য অর্থে অনেকটা নিরীহ, অভাগা, দরিদ্র দেশ হিসেবেও দখলে রাখতে চায় অনেকেই। তা কেবল বাংলাদেশের ওপর আধিপত্যই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই প্রভাব বিস্তারের জন্য।
বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীও বাণিজ্যের জন্য সহায়ক। নতুন যে কোনো প্রডাক্ট দেন- যাচাই বাছাই ছাড়াই তা লুফে নেয় একমাত্র বাঙ্গালীই। এজন্য হয়তো হুজুগে জাতিও বলা হয় আমাদেরকেই। আর কোনো দেশের এই তকমা আছে কি না আমার জানা নেই। তাছাড়া স্বল্প মজুরিও একটা বড় কারণ। আরো একটা কারণ হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক-এর একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশ। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগর কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এ নিয়ে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে প্রতিযোগিতা। বলা হয়ে থাকে, বঙ্গোপসাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র বন্দর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণভাবে ভূমিকা রাখবে। যে কারণে বাংলাদেশের পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত।
বাংলাদেশে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক দুই দিক থেকেই বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন। দেশটির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহু পুরনো। কালের পরিক্রমায় চীন এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম বড় অংশীদারও। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের বড় যোগানদাতাও চীন। তাই দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন নীতি পর্যালোচনা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন অথবা এসডিজি বাস্তবায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে একমত দুই দেশ। চীনের অখন্ডতার প্রশ্নেও দেশটিকে সমর্থন দিচ্ছে বাংলাদেশ। তাইওয়ান কিংবা তিব্বত চীনেরই অংশ- এ নিয়ে বাংলাদেশের কোন দ্বিমত নেই। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ নিয়ে কখনো প্রশ্নও তোলেনি।
১৯৯০’র দশকের শেষ দিক থেকে ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে চীনা বাজারের প্রবেশপথ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর লিংকেজ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। পক্ষান্তরে চীন বাংলাদেশকে দেখে ভারতের সঙ্গে সংযোগের নল হিসেবে। পাকিস্তানে ব্যাপক নির্মাণ প্রকল্পে জড়িত রয়েছে চীন। এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল হিসেবে বাংলাদেশ সারাবিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। জাপান এর ব্যতিক্রম নয়। জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটাও বন্ধুপ্রতীম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর প্রথম যে কয়টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছিলো, জাপান ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম।
জাপানের পার্লামেন্ট ও বুদ্ধিজীবী মহল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করার জন্য ব্যাপক অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল। ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে জাপান ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল জাপান সরকার। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার জাপান। গুলশান ট্রাজেডির সাময়িক উৎকন্ঠা কাটিয়ে দেশটির আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকা বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে সাহায্য অব্যহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগি রাষ্ট্র হিসেবে বছরে অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকে বাংলাদেশ পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির কাছ থেকে। রাষ্ট্রীয় থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের অনেকেই অংশীদার দুই দেশের এই সুসম্পর্কের ভিত রচনায়।
স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য জাপান সহায়তা দিয়ে আসছে। ১৯৮০ সালের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা দানকারী দেশগুলোর মধ্যে জাপান সর্বোচ্চ দাতা দেশ। জাপানের সহায়তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ যমুনা সেতু। জাপান ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের স্থিতিশীল উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতা করারও ইচ্ছে পোষণ করে। বিশেষ করে, জ্বালানি খাতসহ অন্য যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রয়েছে, সেই সব ক্ষেত্রে জাপান সহযোগিতা জোরদার করতে চায়।
পক্ষান্তরে জাপান ও চীনের মধ্যে শত্রুতা দীর্ঘদিনের। অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা-শত্রুতাসহ নানান আঞ্চলিক স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলে আসছে এশিয়ার এ দুই প্রবল ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের মধ্যে। বিশেষ করে গত এক দশকে চীন ও জাপানের মধ্যে সমুদ্র সীমানা নিয়ে বিরোধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিরোধ নিষ্পত্তিতে কূটনৈতিক চেষ্টাও কম হয়নি। একদিকে জাপানের সঙ্গে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থের বিরোধ রয়েছে। চীনের ক্রমাগত পরাশক্তি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টা এই বিরোধকে স্থিতিশীল করার চাইতে বরং আরো উস্কে দিচ্ছে। মূলত দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা ও বিরোধের প্রধান কারণ ৩টি। চীন ও জাপানের মধ্যে স্থায়ী এই বিরোধের মূল মনঃস্তাত্ত্বিক কারণ হলো যুদ্ধের তিক্ত ইতিহাস।
যে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে চীনের বিরুদ্ধে জাপানের যুদ্ধের স্মৃতি দেশটির প্রতি চীনা শত্রু মানসিকতা সবসময়ই কাজ করে। তাই এ বিরোধ কমিয়ে আনা চীন-জাপানের জন্য বেশ কঠিন। দুই দেশই তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অটল। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি না। এছাড়া দুই দেশের বিরোধের এই সময়টাতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কার্যকর করার পথে মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে চীন ও জাপান। এমন পরিস্থিতি জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক, আবার চীনের বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা নিবিঢ় হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে বাংলাদেশকে। লাভ-লোকসানের হিসেবটা টাকার অংকে না করে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।
যদিও বলা হচ্ছে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ব্যবসা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এটাও সত্য। বিশেষ করে স্থলপথে পূর্ব এশিয়ার সাথে দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগের গেটওয়ে বা প্রবেশ পথ বলা হচ্ছে বাংলাদেশকে। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন জোট বিবিআইএন কিংবা বিসিআইএম এর অর্থনৈতিক করিডোরকে বাস্তব রূপ দিতে বাংলাদেশের কোন বিকল্প নেই। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই সময়োপযোগী সমঝোতা বা চুক্তিই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বাংলা কথায়, কার বউ, কার দাসী হবে এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে রূপসী বাংলাকেই। কারণ স্বার্থের কারণেই তার চারপাশে ঘুরঘুর করছে পরাশক্তিরা। কখনও অর্থের লোভ, কখনওবা সম্মানের লোভ দেখাচ্ছে। বিচক্ষণতা তখনই হবে, যখন কৌশলে সকলকেই আঁচলে বেধেঁ রাখতে রাখতে পারবে অপরূপা? সবাই থাকবে, জানবে একে অপরের কথা অথচ কেউ বিদ্রোহ করবে না-কেবল মাত্র এমন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলেই লাভবান হবে বাংলা। না হলে, কুল ও শ্যাম দুটোই হারাতে বেশি সময় লাগবে না। আমরা কৌশলী রূপসী বাংলার পক্ষে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








