রোববার ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজু বাইয়ুন বিমানবন্দরে উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করে চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের সি-৩৯২। কিন্তু সময়মতো বিমান অবতরণ না করা এবং বিমানের আরোহীদের নিখোঁজ হওয়ার খবর উৎকন্ঠা ছড়িয়ে দেয় আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যে।
নিখোঁজ আরোহীদের খুঁজে পাওয়ার বর্ণনা দিয়ে ফেসবুক পোস্ট করেছেন বিশিষ্ট সংবাদিক মাহমুদ হাফিজ। তিনি তার ফেসবুক ওয়ালে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন: ‘পনেরো ঘন্টা রুদ্ধশ্বাস চেষ্টার পর দৃশ্যত- নিখোঁজ একটি বিমান ও বিমানযাত্রীর খোঁজ পাওয়া গেল! মিডিয়াকে অন্ধকারে রেখে এই বিমান চুপিসারে অন্য বিমানবন্দরে নেমে গেলে আত্মীয়-পরিজন উৎকন্ঠায় পড়েন। এই অনির্ধারিত অবতরণ আবহাওয়া ও যন্ত্রজনিত।
চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের সি-৩৯২ বিমানটি ২০ সেপ্টেম্বর, রোববার ঢাকা থেকে উড্ডয়ন করলেও গন্তব্য চীনের গুয়াংজু বাইয়ুন বিমানবন্দরে অবতরণ করেনি। অভিভাবক-আত্মীয় হিসাবে আমাদের রুদ্ধশাস উৎকন্ঠা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার আত্মার আত্মীয় পল্লব মাহমুদ ও শায়লা জেরিন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো’র উদ্দেশে যাত্রা করলেও গভীর রাত অবধি তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বেলা এগারোটায় আমাদের কান্নাকলরোলের মধ্যে তারা ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে গেলেও নির্ধারিত সময়ে অবতরণ ও হোটেলে চেক ইন না করায় এই কান্না গভীর রাত পর্যন্ত প্রলম্বিত হতে থাকে।
নিকটজন বা বন্ধুবান্ধব কেউ আকাশযাত্রা করলে প্রযুক্তির সহায়তায় বিমান অনুসরণ করা আমার মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়েছে। আজকাল বহু সাইট আছে যা বিমান লাইভ অনুসরণ করা যায়। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে প্রচন্ড যানজট ঠেলে বাসায় পৌঁছে কম্পিউটারে দেখলাম বিমান মিয়ানমার-কুনমিং পেরিয়ে চীনের ওপর চলে গেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই অবতরণ করবে গুয়াংজু বাইয়ুন বিমানবন্দরে।
কিন্তু না। গুয়াংজুর কাছে গিয়ে বিমানটি আরও দ্রুত গতিতে ওপরে উঠে প্রায় এ্যাবাউট টার্ণ করে ভিন্নযাত্রা করেছে দেখলাম। যেদিকে যাচ্ছে গুগল ম্যাপে দেখছি সেদিকে পাহাড় আর পাহাড়। আঁতকে উঠি। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বহুল আলোচিত বিমানও নিখোঁজ হওয়ার আগে ভিন্নযাত্রা করেছিল, আল্পস পর্বতে লুফথান্সার বিমান আছড়ে ফেলেছিল পাইলট। এসব কথা ভেবে শিউড়ে উঠে রুদ্ধশ্বাসে একবার ঘরের ভেতর পায়চারি করি আবার উৎকন্ঠা চেপে গুগলিং করতে বসি। বাসায় গিন্নির কান্না তখন চলছেই। এসবের কিছু তিনি জানেন না….।
গুগলসহ সব লাইভ সাইটে ঢুঁ মেরে দেখি, তারা বিমানটির ল্যান্ডিং সময় দেখিয়ে যাচ্ছে। উড্ডয়নপথে ৪৭ মিনিট বিলম্ব দেখিয়ে এ্যারাইভাল সময় দেখানো হচ্ছে চায়না সময় সন্ধ্যা ছয়টা ২২ মিনিট। তবে এগুলো সবই কাগুজে ও যন্ত্রের হিসেব-নিকেশ। সবচেয়ে বড় চালক মানুষের মন। মন আমার শান্ত হচ্ছে না। ভেতরেছটফটানি।
আশ্বস্ত হতে না পেরে বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটে ঢুকি। এতে ডিপার্চার ও এ্যারাইভাল বিমানের চলমান লিস্ট থাকে। এ্যারাইভাল তালিকায় সি ৩৯২ বিমান নেই। উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। পল্লব-শায়লার লেওভার করার কথা গুয়াংজু এয়ারপোর্ট সংলগ্ন পাঁচতারকা হোটেল পুলম্যানে। সাইট থেকে পুলম্যানের নম্বর বের করে ফোন করি। সামান্য ইংরেজী জানা হোটেলকর্মীকে দু’সন্তানের নাম দিয়ে চেকইনের খোঁজ নিই। না, কোন খোঁজ নেই।
সিডিউল সময়ের অনেক পরে গুয়াংজু বিমানবন্দরে খোঁজ নিই। জানা যায়, ফ্লা্ইট সি ৩৯২ গুয়াংজুতে ল্যান্ড করেনি। আজকাল রোমিং ফোন না থাকলেও ভাইবার, স্কাইপ বা ফেসবুকের মাধ্যমে কথা বলা বা খবর আদান প্রদান করা যায়। সব ওয়ারপোর্ট বা হোটেলে ওয়াইফাই কানেকসন আছে। পরক্ষণে ভাবি চীনে তো ভাইবার, ফেসবুক বন্ধ। চীনে চলে উইচ্যাট নামের মাধ্যম। কম্পিউটার ও ফোনে উইচ্যাট ডাউনলোড করে কানেক্ট করতে চেষ্টা করি, তাতেও বিফল।
বিমান সংস্থার ওয়েবসাইটসহ নানা সংবাদসাইট ঘুরে এ সংক্রান্ত খবরের খোঁজ করলাম, কোথাও কিছু নেই। ভাবলাম, এক এয়ারক্রাফট প্রতিদিন নানা বিমানবন্দরে যাত্রী বহন করে থাকে। খুজে বের করলাম, সি ৩৯২ বোয়িং- ৭৩৮ এয়ারক্রাফটি সিডিউল অনুসারে ঢাকা থেকে গুয়াংজুতে যাত্রী নামিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বালি যাওয়ার কথা। সিডিউল খুঁজে তত্ত্বতালাশ করতে গিয়ে দেখি গুয়াংজু-বালি ফ্লাইট ডিলে দেখাচ্ছে।
প্রথমে এক দুঘন্টা, তারপর সাত-আট ঘন্টা। তাহলে ফ্লাইটটি গোল কোথায়? এ পরিস্থিতিতে খোঁজাখুঁজির সব অপশন্সই শেষ। রক্ত হিম হয়ে আসছে। মাথায় কোন আইডিয়াই আর কাজ করছে না।
ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো বন্ধু আরিফ জিয়াউদ্দিনের অগ্রজ আশরাফ জিয়াউদ্দিন অন্তত দুইদশক চীনের গুয়াজুতে থাকেন। তিনি চীনা ভাষায়ও দক্ষ। আরিফকে ফোন করতেই সে জানাল, ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করেই সে ফিডব্যাক দিচ্ছে। আমার আর তর সয় না। কিছুক্ষণের মধ্যে আরিফ জানালো, ওই ফ্লাইট গুয়াইলিন নামের একটা পাহাড়ি শহরের বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। যাত্রীদের হোটেল দেয়া হয়েছে। সোমবার সকালে তাদের অন্য ফ্লাইটে গুয়াংজু নিয়ে আসা হবে। যাত্রীদের কানেকশনগুলো ডিলে হলেও করে দেয়া হবে।
হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার অস্থিরতায় ততোক্ষণে স্ত্রী আঁচ করেছেন। তাকে ফ্লাইটটির নিরাপদ অবতরণ ও বাচ্চাদের হোটেল অবস্থানের কথা বললাম। গুয়াইলিন নামটা প্রথম শুনলাম বলে গুগলে সার্চ দিলাম। গুয়াংজু থেকে ছয়শ কিলোমিটার দূরত্বে পাহাড়ি শহর গুয়াইলিন। গুয়াংজু থেকে একঘন্টার বিমানযাত্রা।
এই যাত্রালিংকে যেসব আত্মীয়-পরিজন আছে, সবাইকে খবর জানালাম। রাত গভীর হতে থাকে ঘুম আর আসছে না। অবশেষে চীনা সময় রাত দুইটায় ছেলের ফোন এলো। সে যা জানালো তা খুব সুখকর নয়। ফ্লাইটটি অবতরণের ঘোষণা দেয়ার পর ভিন্নদিকে যাত্রা করে।
বিমানের বামডনা কাজ করছে না, গুয়াংজু’র আবহাওয়াও খারাপ তাই অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করা হচ্ছে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। রাতে তাদের হোটেল দিলেও যে কাণ্ডটি করেছে বিমান কর্তৃপক্ষ তা খুব হয়রানি ও বিড়ম্বনাকর।
ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখো চেকড সব ল্যাগেজ যাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। সেগুলো নিয়ে আরেক বিমানে গুয়াংজু যেতে হবে এবং চীনা কাস্টমস পেরিয়ে নতুন করে চেক ইন করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রমুখো ফ্লাইটে।
এই লেখা যখন লিখছি, তখন পল্লব-শায়লা হয়তো ল্যাগেজ নিয়ে চীনের এক বিমানবন্দর থেকে অন্য বিমানবন্দরে দৌড়াচ্ছে ফ্লাইট ধরার আশায়। পুরো যাত্রাটিতে ৫/৬টি ট্রিপের লিংক। কোনো একটিতে বিপর্যয় মানে পথে পথে হয়রানি আর বিড়ম্বনা। জানি না, তাদের কপালে আল্লাহ কি রেখেছেন!






