বিরক্তিকর মানুষ অথবা মানুষের প্রতি বিরক্ত– দুনিয়াতে কোন দলটা এখন সংখ্যায় বেশি ভারী? ফেসবুকের নিউজফিড মানুষের বিষেদাগারে ভরে থাকলেও সঠিক পরিসংখ্যান বের করা বেশ কঠিন। কারণ বিরক্তিকর লোক বা তাদের সমালোচক দলের সবাই তো আর ওখানে আসে না। যারাও আসে তাদের মধ্যে ক’জনই আর লেখালেখি করে! অধিকাংশই চুপচাপ বসে কাজ সারে, অন্যরা দাঁত কিড়মিড় করে। অনেকেই আবার চোরাগোপ্তা স্বভাবের, ভুলেও কোথাও একটা লাইক-কমেন্ট দেয় না, ফলে উপস্থিতিও টের পাওয়া যায় না। তবে বিতৃষ্ণায় ফেটে পড়া লোকগুলো কিন্তু লোক হিসাবে মোটেই খারাপ না। ওরা আসলেই শান্তি চায়, তবে সারাক্ষণ বসে বসে ও-খারাপ ও-খারাপ করতে থাকে। ওরা শান্তির খোঁজ করে অশান্তির মধ্যে ডুব দিয়ে। তাও ভালো যে তারা কারো মাথায় আঘাত দিয়ে বসে না।
একটা কথা ওরা জানলেও হয়ত বোঝে না। রাগ, গোস্বা, বিতৃষ্ণা বা বিরক্তি, এগুলো কিন্তু শরীরের বিশেষ ধরণের কেমিকেল স্যুপ! ওসব অনুভূতি জন্মাতে এবং লালন করতে গিয়ে শরীরের ভেতর ভয়ংকর এক কেমিকেল স্যুপ রান্না করে খেয়ে নিচ্ছে তারা। স্যুপটা যে সস্তা তাও না। কেমিকেলের জন্য চরম মূল্য যোগাতে হচ্ছে ওদের।
আপনি রাগ, গোস্বা বা বিরক্ত যাই হচ্ছেন, এমনকি যখন সুখকর কিছুও ভাবছেন, সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ধরণের কেমিক্যাল ছড়িয়ে যাচ্ছে শরীরের ভেতর। প্রিয়জনের কথা মনে করলে যে কেমিকেল ছড়াবে, হিংস্র বাঘের কথা মনে করলে ছড়াবে অন্যটা। সাফল্যের খুশিতে হাসলে একরকম, বিতৃষ্ণায় রেগে গেলে অন্যরকম।
সুন্দর ও সুখকর চিন্তাগুলোর সময় রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া যেটা ঘটছে তা কিন্তু দুনিয়ার যে কোনো টনিকের চেয়েও বেশি কল্যাণকর। সেগুলো মানুষের প্রাণশক্তি বৃদ্ধি করে, গ্ল্যামার বাড়ায়, বয়সকে তো প্রায় থামিয়েই দেয় একটা জায়গায়! তবে ক্ষেপাটেরা হাটছেন ভিন্নপথে। ওরা নিজের শরীরটাকে চুবিয়ে দেয় বিষের ভেতর। ঘৃনা,অসন্তুষ্টি ও ক্ষেপে থাকার সময় শরীরটা নানারকম হরমোন ছড়িয়ে বিষক্রিয়া ঘটায়, সেটার ক্ষতির মাত্রা বিরক্তিকর লোকগুলোর চেয়ে সহস্রগুন বেশি। সেগুলোর কারণে শরীরে রোগশোক ছড়িয়ে দুর্দশার সাগর সৃষ্টি হয়ে যায়। ফলশ্রুতি মৃত্যুকেও টেনে নিয়ে আসে দোরগোড়ায়।

কারো ওপর ক্রাশ খেয়ে বসে থেকে লাভ কী? কিচ্ছু হচ্ছে না ওদের! বরং চরম ক্ষতিটা হচ্ছে নিজেরই! বিশ্বাস করুন, ওই যে গুবরে পোকা, যেটা গোবর খেয়ে আপনার ঘৃনার পাত্র হয়েছে, আসলে ওটাও নিভৃতে পরম বন্ধুর মতোই জীবনটা বাঁচিয়ে দিচ্ছে আপনার! পোকাগুলো পচা, বাসি, গু-গোবর খেয়ে না ফেললে সেগুলোই মারাত্মক গ্যাসীয় বোমার কাজ করতো, দুদিনেই দুনিয়াটা গন্ধে ভরে যেত। দম বন্ধ হয়ে মরে যেত খোদ মানুষকেই।
আপনার কাছে যা চরম অবজ্ঞার, অবশ্যই সেটা কারো কাছে উপকারী, প্রকৃতির শিক্ষাব্যাবস্থার জন্যেও তাকে প্রয়োজন। তা ছাড়াও মানুষ কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক উন্নত হয়েছে! বিগত কোটি বছরের তুলনায় মানুষ এখন অনেক সভ্য। বিবর্তনের হিসাবে বিগত কোটি বছরে বানরের চেয়ে ১.২৩ শতাংশ পার্থক্য ঘটে গেছে মানুষের। সময়ের তুলনায় বিবর্তনের অগ্রগতিটা কি কম? দুনিয়ার বয়স তো কোটি কোটি বছর, সেখানে তুলনা করা হলে অগ্রগতিটা দারুণ।
সভ্যতার পেছনে ধর্মের কথা, র্যাব-পুলিশের যাতা, এগুলোর ভুমিকাও এখন কম কিসে! তারপরও যদি বিশ্বাসই করেন যে, সবই তার সৃষ্টি, সবই তার সৃষ্টি, তা হলেই তো ঘটনা শেষ! রাগ, ঘৃনা, বিতৃষ্ণা বা অসন্তুষ্টির কারণ আর থাকে কোথায়!
দৃশ্যত অনেক খারাপ এমন অনেক কিছুরই প্রয়োজন দুনিয়াতে রয়েছে, বিদ্যমান সিস্টেম তো তাই বলছে। তাই তো দেখুন, ঘৃণা-বিতৃষ্ণা পোষণ করে নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাচ্ছেন মানে কী! কঠিন একটা মেসেজ রয়েছে সেখানেও। অদৃশ্য একটা শক্তি যেন ঘৃনাকারিকে শাসিয়ে বলে দিচ্ছে, ওসব করে শুভপরিবর্তনে কোনো ভুমিকা নেই তোমার। বরং অন্তরে ঘৃনা ধরে রেখে সিস্টেমকেই তুমি অবজ্ঞা করছ, পরিষ্কারই প্রমান করছ যে, দুনিয়া বা দুনিয়ার সিস্টেমের জন্যে তুমি উপযোগী নও। তাই উছিলার রুপ ধরে কতগুলো রোগশোক পৌছে যাচ্ছে তোমার কাছে, ওদের পিঠে চড়ো, শ্রেফ মরে গিয়ে বেঁচে যাও এবং চলে এসো, তাড়াতাড়ি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







