বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নির্দেশেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অংশ হয়েছিল বলে আসামী ও সাক্ষীদের জবানবন্দিতে জানা যায়।
গ্রেনেড হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও গ্রেনেড সরবরাহকারী মাওলানা তাজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠিয়েছিল প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) জঙ্গি দমন-সংক্রান্ত ব্যুরো, যা জানতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়, বাবরের নির্দেশে ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্ঞাতসারে মাওলানা তাজউদ্দিনকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহকারী লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, তার (ডিউক) ভায়রা ডিজিএফআইয়ের লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার ও সিটিআইবির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন পরস্পর যোগসাজশে বাদল ছদ্মনামে তাজউদ্দিনের জন্য পাসপোর্ট করান। ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর তাজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেন তারা।
মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্র, ডিজিএফআইয়ের সাবেক চার কর্মকর্তা ও হুজির শীর্ষনেতাদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দেখা যায়, ডিজিএফআইয়ের জঙ্গিবাদ দমন-সংক্রান্ত গোয়েন্দা শাখা (কাউন্টার টেররিজম ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো—সিটিআইবি) চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত। ডিজিএফআই থেকে নিয়মিত টাকাও পেত হুজির শীর্ষনেতারা।
অবশ্য ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজাল নাছের ভূঁইয়া (পরে বহিষ্কৃত), মেজর সৈয়দ মনিরুল ইসলাম (পরে বহিষ্কৃত) ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মিজানুর রহমান আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, হুজির নেতা মাওলানা আবদুস সালাম, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা রাজ্জাক, মাওলানা সাব্বির ও মাওলানা মনির সিটিআইবিতে তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে (সোর্স) কাজ করত। এজন্য তাদের নিয়মিত টাকা দেওয়া হত।
এছাড়া হুজির সাবেক আমির মুফতি শফিকুর রহমান, হাফেজ ইয়াহিয়া, আবু বকর ও কাশ্মীরের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীনের নেতা আবু ইউসুফ ওরফে মাজেদ বাটও বিভিন্ন সময় ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলে বলে তারা স্বীকার করেছেন। এসব জঙ্গিও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযুক্ত আসামী।
আসামী ও সাক্ষীদের জবানবন্দি সূত্রে জানা গেছে, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক, সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান পরস্পর যোগসাজশে মূল আসামিদের প্রশাসনিক সহায়তা দেন। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার আশরাফুল হুদা ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ঘটনার দিন তড়িঘড়ি বিদেশে চলে যান। তিনি বিদেশ থেকে ফিরেও দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন বিভাগীয় তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতর কোনো প্রতিবেদনও দেয়নি।
সাবেক আইজিপি শহুদুল হক ঘটনার সময় আইজিপির দায়িত্ব পান। তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নেননি। এমনকি ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে চাইলে তিনি রাজি হননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি-পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেনেড আক্রমণের সুবিধায় ও রক্ষার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেননি। এ ঘটনায় ব্যবহৃত অবিস্ফোরিত তাজা গ্রেনেড আলামত হিসেবে জব্দ করার পরও তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি।
এমনকি আদালতের অনুমতি না নিয়েই উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেনাবাহিনীকে দিয়ে গ্রেনেড ধ্বংস করিয়েছেন। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সংলগ্ন পশ্চিমপাশের এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত (ডিসি-দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান ঘটনায় জড়িতদের সহজে গ্রেনেড আক্রমণের সুবিধার্থে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেননি। এ কারণে আসামিরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে।
এছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হরকাতুল জিহাদের (হুজি) জঙ্গিদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু জড়িত ছিলেন—এমন তথ্য ২০০৬ সালের আগস্টেই (বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে) বেরিয়ে আসে।








